কলকাতার মিতালী এবং সেন্টিনেল দ্বীপ পর্ব : ৪ (শেষ পর্ব)

খাবার মাঝে রেখে চারদিকে বসলো আর দাঁড়ালো ওরা। বয়স্করা হাঁস আর শিকারী পশুগুলোকে কেটে সবাইকে দিতে থাকলো। নিজেরাও খেলো বন্টনের মাঝে। মাছও পরিবেশন করলো সবার মাঝে। কাঁচা মাছ আর মাংস কাঁচাই খেলো সবাই। প্রসূতি মা আর বৃদ্ধাকেও খাবার এগিয়ে দিলো এক নারী। সেও গিয়েছিল শিকারে পুরুষদের সাথে। সম্ভবত সেন্টিনেলরা নারী পুরুষে বিভাজন শিখেনি সভ্য সমাজের মত। এখানে কাজ ও খাবার বন্টনে সাম্যবাদী নীতি দেখলাম এ সমাজে। কিন্তু কেন তারা কৃষিকাজ, আগুনের ব্যবহার শিখলো না তা বিষ্ময়ের সাথে চিন্তা করতে থাকলাম আমরা!
:
আমরা বেঁকে যাওয়া যে বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম, সে গাছটিতে আকস্মিক একটা বকজাতীয় বড় পাখি এসে বসলো। তার দেখাদেখি আরো দুটো পাখি, এভাবে তিনটি পাখি বসে ডাক দিলো তাদের বুনো স্বরে একসাথে। সেন্টিনেলরা খাওয়ার মাঝেই তাকালো সেই বৃক্ষের দিকে। আঙুল দিয়ে পাখিগুলোকে দেখালো আর কি সব বললো নিজেদের ভাষায়। আকস্মিক দুজন আদিবাসি দুটো তীরধনুক নিয়ে একদম বৃক্ষের কাছাকাছি চলে এলো। ওরা মাত্র আমাদের থেকে ১০/১২ ফুট দূরে। মিতালী ফিসফিসিয়ে বললো – পাখিকে তীর ছুঁড়লে এখানে পড়বে, তখন ওরা পাখি খুঁজতে চলে আসবে আমাদের এখানে। তার চেয়ে চলো এখনই ভাগি পুব দিকে। আমরা দুজনে সর্ম্পণে বৃক্ষডাল সরিয়ে পুব দিকে গাছের আড়ালে একটু সরে যেতেই ওদের গ্রুপ থেকে ৪/৫ জনে “হাড্ডিউড্ডি” বলে চিৎকার দিলো। চিৎকার শুনে খাওয়া রেখে দাঁড়িয়ে গেল প্রায় সবাই। প্রায় একসাথে তারা ছুটে আসতে থাকলো আমাদের দিকে। সম্ভবত আমাদের দুজনকে দেখে ফেলেছে তারা।
:
আমরা প্রাণপণে ছুটছি সমতলের কাঁচা মেঠো পথ ধরে। কারণ পথহীন জঙ্গলে চলা সহজ নয়। মিতালী ও আমি দুজনেই দৌঁড়ে পারদর্শী। তাই দুজনে দৌঁড়ে ওদের পেছনে ফেলে বেশ দূরে এগিয়ে গিয়েছি আমরা। কিন্তু ওরা বলতে গেলে সবাই তীর ধনুক আর অস্ত্র নিয়ে তাড়া করছে আমাদের। এর মাঝে দুটো তীর নিক্ষেপ করেছে আমাদের লক্ষ্য করে ওরা। কিন্তু আমাদের দুজনের জ্যাকেটের ভেতরে “বুলেটপ্রুফ ব্যানিয়ন” থাকাতে তা ঢুকবে না আমাদের শরীরে এমনই মনে করছি আমরা। আমরা দৌঁড়াচ্ছি কোন শব্দ না করে আর পেছনে শখানেক সেন্টিনেল “হাড্ডিউড্ডি” শব্দ করে তাড়া করছে আমাদের। দৌঁড়াতে দ্বীপের একদম উত্তর মাথাতে চলে এসেছি আমরা। এ তট বেশ সমতল বালুকাময়। ঘন বৃক্ষ ছেড়ে সৈকতে চলে এসেছি আমরা। কিন্তু আমাদের বোট হচ্ছে দ্বীপের পূবদিকে। এখান থেকে ওখানে পৌঁছা বেশ জটিল তা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখেছি আমরা। বরং আমাদের বোটের কাছে পৌঁছতে হলে আবার ওদের কুঁড়েগুলোর কাছে যেতে হবে, তারপর সোজা পূব দিকে একটু হাঁটলেই পেয়ে যাবো আমাদের বোট!
:
সমুদ্র ডানে রেখে বাদিকের বন ঘেষে খোলা সৈকতে দৌঁড়াতে থাকলাম আমরা। স্যাটেলাইট চিত্র অনুসারে এবার বা দিকে ওদের কুঁড়েগুলো। সম্ভবত ওরা সবাই আমাদের পেছনে তাই কুঁড়েগুলো এখন খালি। পথ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই পথেই কুঁড়েতে যায় ওরা। মিনিট দশেক দৌঁড়ানোর পর কুঁড়ের কাছে পৌঁছে গেলাম আমরা। হ্যা মানবহীন পুরো এলাকা কেবল ঐ বুড়ি ছাড়া, যার স্বামী মারা গিয়েছিল গত রাতে। সম্ভবত অসুস্থ্য বা বয়সের ভারে ন্যূজতার কারণে সে বের হয়নি আমাদের খোঁজে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একদম তার সামনে চলে এলাম আমরা। আমাদের দেখেই ভয় পেল সে, আর চিৎকার করে বললো “হাড্ডিউড্ডি”! মিতালী তার কাছে গিয়ে বললো – নো “হাড্ডিউড্ডি”! বুড়ির পাশেই ঘাসের বিছানায় এক সদ্য জন্ম নেয়া কালো সেন্টিনেল শিশুকে দেখলাম মাটিতে। মিতালী বললো – ‘চল শিশুটিকে নিয়ে যাই। এটাকে কলকাতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করবো’। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম – ‘বাচ্চা নিয়ে আমরা দৌঁড়াতে পারবো না মিতালী! শেষে ধরা পড়ে যাবো। তার চেয়ে নিজের জান নিয়ে পালাও’!
:
আধা ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের ঘাটে, যেখানে বৃক্ষপাতার মাঝে সংরক্ষিত আমাদের বোট। কিন্তু একি বোট কোথায়? কোথাও আমাদের বোট বা তার ভেতরে রক্ষিত জিনিসপত্র খুঁজে পেলাম না। তাহলে আমাদের বোট কি সেন্টিনেলরা খুঁজে পেয়েছে? কিংবা তা কি জোয়ারের জলে ভেসে গেছে? এবার ভীষণ চিন্তায় পড়লাম আমরা। মিতালীর মুখে চেহারায় ভয়ের ছাপ পড়লো। দূরে সমবেত সেন্টিনেল ডাক শুনতে পাচ্ছি – “হাড্ডিউড্ডি”! সম্ভবত মানুষ বা শত্রুকে ওরা “হাড্ডিউড্ডি” নামে ডাকে। যাকে হত্যা করা ওদের প্রধানতম ফরজ কাজ। অনেক দূরে একটা চলন্ত জাহাজ দেখতে পেলাম। হতে পারে ওরা ভারতীয় নৌবাহিনি বা কোস্টগার্ড। এতো দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। মিতালী তার ব্যাগে রক্ষিত sos smoke signal lamp বের করে তাতে আগুন লাগাতে চাইলে বললাম – ‘এটা জ্বালালেতো সেন্টিনেলরা জেনে যাবে আমাদের অবস্থান’! মিতালী ঠোঁট উল্টে বললো – ‘উপায় নেই’! তুমি কি মনে করছো এ ছোট্ট দ্বীপে ওরা খুঁজে পাবেনা আমাদের’!
:
সমবেত “হাড্ডিউড্ডি” শব্দ ক্রমে এগিয়ে আসতে থাকলো আমাদের দিকে। এর মাঝেই মিতালী জ্বালিয়ে দিলো বাঁচার জন্য এসওএস স্মোক-ল্যাম্প! রকেটের মত প্রচন্ড আগুন আর ধোঁয়ার ফুলকি ছুটিয়ে অন্তত এক কিলোমিটার ওপরে উঠে গেল sos smoke signal। আগুন আর ধোয়ার রকেট দেখে সম্ভবত ভয়ে একটু দাঁড়িয়ে রইল সেন্টিনেলর! ক্ষণকাল বিরতি দিয়ে এবার ওরা তীর আর বল্লম ছুঁড়তে থাকলো আমাদের দুজনের দিকে। আমাদের গায়ে ‘বুলেটপ্রুফ ব্যানিয়ন’ থাকলেও শরীরের অন্যান্য অংশ অরক্ষিত। তাই বাঁচতে হলে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে হবে আমাদের। ওপরে লাইফ জ্যাকেট পরা আছে আমাদের। অন্তত কয়েক ঘন্টা সমুদ্রে বেঁচে থাকতে পারবো। তা ছাড়া ভাল সাঁতার জানি দুজনেই। আবার তীব্র “হাড্ডিউড্ডি” ডাক কানে আসতেই দুজনে লাফিয়ে পড়লাম শীতের সমুদ্রে। সমুদ্রে ভাটার টানের অল্প স্রোত। তাই ভাটার টান আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে গভীরে। মিতালী বললো – সাঁতার কেটোনা, তবে ক্লান্ত হয়ে যাবে! ডুবে কেবল নাক উঁচু করে রেখে বাঁচতে হবে, যতক্ষণ না কোন উদ্ধারকারী জাহাজ আসে আমাদের কাছে!
:
সেন্টিনেলরা এবার সবাই একসাথে দৌঁড়ে এলো সমুদ্র তীরে। ওদের দুজওয়ান জলে নেমে সাঁতরে আসতে চাইলো আমাদের কাছে। কিন্তু “হাড্ডিউড্ডি” ধ্বনি তুলে দুনারী তাদের টেনে নিয়ে গেল তীরে। সম্ভবত ওদের স্ত্রী হবে। শিশুরা তীরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে পাথর ছুঁড়ে আর ভ্যাঙ্গাতে লাগলো। বয়স্করা বেশ কবার তীর ছুঁড়ে শেষে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো সবাই। তীর কাছাকাছি হলেও গায়ে লাগলো না আমাদের। আমরা বেশ দূরে ভেসে এসেছি। সূর্য ডোবার আর বেশি বাকি নেই। অনেক দূরে চলন্ত জাহাজ দেখতে পাচ্ছি। ওরা কি আমাদের উদ্ধার করবে? আমাদের sos signal কি নজরে এসেছে ওদের? আমার গলা থেকে ভেজা বাইনোকুলারে চোখ রেখে মিতালী বললো – দূরে ইন্ডিয়ান নেভীর জাহাজ দেখতে পাচ্ছি। ভারতীয় পতাকা উড়ছে জাহাজের সামনে। এদিকেই আসছে মনে হচ্ছে’! মিতালীর হাত থেকে বাইনোকুলার নিয়ে তাতে চোখ রাখি আমি। ক্রমে অন্ধকার হচ্ছে চারদিক। আকাশে ভরা চাঁদ আর রআত্রমালারা ক্ষীণতরভাবে দেখা দিয়েছে। নীচে সমুদ্র! অদূরে সেন্টিনেলের অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘন জঙ্গল।
[শেষ]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of