একটি সুস্বপ্ন কিংবা দু:স্বপ্নের গল্প

কলকাতা একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি আমি। আয়োজক সংগঠনের নাম হচ্ছে ‘উভয় বাংলা একত্রীকরণ জোট’। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সোস্যাল মিডিয়ায় নানাবিধ জনমত গঠনের পর আজ এ সংগঠনের প্রথম কংগ্রেস কলকাতার ধর্মতলায়। এতোদিন ফেসবুক টুইটার ব্লগে যারা দুই বাংলাকে একত্রিকরণের পক্ষে নানাবিধ যুক্তি তুলে ধরেছেন, তারা অনেকেই ধর্মতলার এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। আমি এসেছি বাংলাদেশের ঢাকা থেকে। আমার মত আরো অনেকেই এসেছেন খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী থেকে, যারা এতোদিন কাজ করেছেন ফেসবুক টুইটারে জনমত গঠনে। বক্তারা প্রায় সবাই ধর্মগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে দুই বাংলাকে বিভক্ত করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। বিভক্তির কারণে ভারতবর্ষ ও বিশ্বে বাঙালির যে আত্মপরিচয়ের ‘সঙ্কট’ সৃষ্টি হয়েছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। পূর্ব-পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, লন্ডনে অবস্থানরত বাঙালির পরিসংখ্যান তুলে ধরে হুগলির বিকাশ ধর বলেন – দুই দেশে নানাভাবে বিভক্ত থাকার কারণে বিশ্বদরবারে বাঙালির এ দুরবস্থা। অশ্রুভেজা কণ্ঠে মালদহের আ: কাদের বলেন – আজ সীমান্তে “মিলনমেলার” নামে যখন দেখা যাচ্ছে মা-বাবা ভারতে, কন্যা বাংলাদেশে। কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে যখন ছোঁয়ার চেষ্টা করেন একে অপরের হাত, তখন মানবিকতা কতটা ভূলুন্ডিত, তা হয়তো আর কাউকে বলে দিতে হবেনা।
:
পুরো অনুষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়াতে সীমান্তের করুণ অমানবিকতা আর বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন বিশ্বভারতীর তরুণ অধ্যাপক সাধন মজুমদার। যাতে তিনি সীমানের কোন কোন পরিবারের অর্ধেক ঘর রাজনৈতিক বাংলাদেশে এবং অপর অংশ ভারতের মধ্যে, তালগাছটি বাংলাদেশ অংশে হলেও, গোবর লেপা উঠুনটি আবার ভারতের অংশে দেখিয়ে বোঝাতে চান, কিভাবে এ পরিবারগুলো সীমান্তে অরক্ষিতভাবে বসবাস করছে। সমবেত সবাই ই সমস্যা সমাধানকল্প দুই বাংলাকে একত্রিকরণে সবার সর্বসম্মত মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বল্টু মিয়া দাঁড়িয়ে বলেন – ‘আমরা সাধারণ মানুষতো বিষয়টা পুরোই বুঝতে পেরেছি। এবং আমরা চাই দুই বাংলা অবিলম্বে একত্রিকরণ হোক। যাতে বিশ্বে বাঙালি জাতির পরিচয় আর বিকাশ আরো দ্রুত তড়ান্বিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – পশ্চিম বাংলার শাসক পুরভী মন্ডল আর বাংলাদেশের শাসক সখিনা বিবি কি তাতে রাজি হবেন? তা ছাড়া রয়েছে দুই বাংলার ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো। যারা চাইবে উভয় বাংলার বাঙালির মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি ও সমস্যাকে জিইয়ে রেখে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে যাওয়া’!
:
নানাবিধ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, যতই বিরোধিতা আসুক, এ আন্দোলন আয়োজকরা সামনে এগিয়ে নেবেই। এ জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের সকল থানা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হবে। যাদের অন্যতম কাজ হবে “অনলাইন এক্টিভিস্ট গ্রুপ” তৈরি করা। যারা দুই বাংলা একত্রিকরণে রাতদিন কাজ করে যাবে। এবং পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকাতে। সংগঠনের প্রধান কাজ হবে একত্রিকরণের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে জনমত গঠন করা। এবং তাই হলো – দুমাস পর ঢাকাতে দুই বাংলা, অসম, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, ত্রিপুরা, বৃটেনের অসাম্প্রদায়িক লাখো জনতার উপস্থিতিতে সকলে হাতে হাত রেখে শপথ করলো “বাঙালির মাথা তারা বিশ্বে উঁচু করে তুলবেই”! কিন্তু বরাবরের মতই দুই দেশের প্রশাসন থেকেই নেতিবাচক আচরণ লক্ষ্য করলো আয়োজনগণ। এবং তারা জানে এটা হবেই। ভারত বাংলাদেশের পুরো অংশে হাজার হাজার অনলাইন এক্টিভিস্ট গ্রুপ গড়ে উঠলো অল্প দিনেই। যার শাখা প্রশাখায় ছেয়ে গেলো দুদেশের কলেজ ভার্সিটিগুলো। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় থাকলো ঢাকা আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ।
:
যখন পুরো দেশের ৫১% মানুষ এ আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হলো, তখন এ মতামতের পক্ষে ভোট চাইলো বিক্ষুব্দ মানুষজন। দুদেশের শাসকরাই প্রথমে এর বিরোধিতা করলো। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম থেকেই এ আন্দোলনের বিরোধিতা করলো এ কারণে যে, এটা সফল হলে পশ্চিম বাংলা বা বাংলাভাষিক অন্য রাজগুলো ভারত থেকে আলাদা হয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনে তৎপর হতে পারে, তাই তারাও চেষ্টা করলো মানবিক এ আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে। কিন্তু ৫১% মুক্তচিন্তক মানুষের প্রচন্ড চাপে বাধ্য হলো দুদেশই অবশেষে ভোটাভুটির আয়োজন করতে। ভোটের আগে দুই বাংলার ধর্মান্ধ গ্রুপগুলো ধর্মীয় কারণে ১৯৪৭ এর বিভাজনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে কোটি কোটি টাকা খরচ করলো। কিন্তু মানুষ তা খুব একটা খেলো না। ভোটে নানাবিধ ট্যাম্পারিং আর কারসাজি কঠোরভাবে মোকাবেলা করলো সাধারণ মানুষ। এবং রাজনৈতিক বাংলাদেশের ৭০% আর পশ্চিম বাংলার ৭৬% মানুষ ভোট দিলো “দুই বাংলা একত্রিকরণের পক্ষে”। চুনকালি পড়লো ২ বাংলার ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের মুখে।
:
ভোটের পর সাধারণ মানুষ এক নতুন বাংলার স্বপ্নে বিভোর হলো। সিদ্ধান্ত হলো দুই বাংলা থেকে নির্বাচিত নেতাদের নিয়ে গঠিত হবে নতুন দেশের নতুন সরকার। ত্রিপুরা আসাম উড়িষ্যা আর ঝাড়খন্ডের বাংলা ভাষিকগণও সংযুক্ত হতে চাইলো এ নতুন দেশের সাথে। কিন্তু এতে দারুণ গোস্বা হলো পশ্চিম বাংলা আর বাংলাদেশের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি। কারণ নতুন বাংলা হলে তাদের স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে। সুতরাং ৭৬% জনতার চাওয়াতে কিছু যায় আসেনা, বরং নিজেদের অদৃশ্য ক্ষমতা পাকাপোক্ত রাখতে তারা জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ালো। এ ক্ষেত্রে তারা হাত মিলালো একে অপরের সাথে। দুই দেশের মৌলবাদি সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সাথে গোপনে আঁতাত হলো একে অপরের। ৭৬% জনগণের ম্যান্ডেট নেয়া “সাধারণ মানুষ” আবার মহাসমাবেশের ডাক দিলো ধর্মতলায়। আবার দুই বাংলা আর অপরাপর রাজ্যগুলো থেকে একত্রিকরণের পক্ষের লাখো মানুষ সমবেত হলো ‘কলকাতা ময়দানে’। লাখো মানুষ ধ্বনি তুললো – দুই বাংলা একত্রিকরণের পক্ষে।
:
কিন্তু আক্রান্ত হলো জনতা। ২ বাংলার ধর্মান্ধ মৌলবাদি গ্রুপ দেশি বিদেশি মদদে আক্রমণ করলো লাখো মানুষের ওপর। কালো মুখোশ পরে এলোপাথাড়ি গ্রেনেড ছুঁড়লো তারা সমাবেশস্থলে। হাজারা মানুষ আক্রান্ত হলো এ প্রকাশ্য গ্রেনেড হামলায়। মানুষের আর্তচিৎকার কেঁপে উঠলো কলকাতা ময়দানের আকাশ-বাতাস। লাখো মানুষের কোলাহল আর ভয়ার্ত চিৎকারে আকস্মিক ঘুম ভেঙে গেলো আমার। কি স্বপ্ন দেখলাম এসব! পুরো শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। এসব কি স্বপ্ন দেখে ঘাম ছুটালাম এ শীত রাতে। আসলে কোনদিন কি দুই বাংলার বাঙালিরা একত্রিত হবে? কখনো কি এ বোধ জাগবে দুই বাংলার মানুষের মাঝে? নাকি কেবল তা শীত রাতের দু:স্বপ্ন হয়েই থাকবে চিরন্তন!
 
 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of