ধর্ম, ধর্মতন্ত্র ও মানবধর্ম

ধর্ম সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবী গুলিয়ে ফেলছেন। প্রথমে গুলাচ্ছেন ধর্মের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে। তাঁরা বলেন “যা কিছু মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় বা যা মনুষ্যত্বকে ধারণ করে তাহাই ধর্ম। মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব।” খুব ভালো সংজ্ঞা হয়তো এটা নয়, কারণ সংজ্ঞাটায় এ্যবস্ট্রাকশন বেশি। এই এ্যবস্ট্রাক্ট ডেফিনেশনকে অপারেশনাল ডেফিনেশনে রূপান্তরিত করার কাজটা কেউ করেনি। ধর্মের সংজ্ঞায় একটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কারণ আমরা ঠিক জানি না কী কী বিষয় আমাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়? আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই “মনুষ্যত্ব” ব্যাপারটাই বা ঠিক কী। এই মনুষ্যত্বকে ধারণ করা বলতে কী বুঝি, এবং কোন সে জিনিস যা মনুষ্যত্বকে ধারণ করে।

ধর্মের যে মনুষ্যত্বকেন্দ্রিক সংজ্ঞা বুদ্ধিজীবীরা দিয়েছেন, যার কথা উপরে বললাম, সেটা মানলে প্রচলিত অর্থে আমরা যাকে ধর্ম বলি সেগুলো কী বাতিল হয়ে যায় না? কারণ প্রচলিত ধর্মসমূহে মনুষ্যত্ব বিকাশের কিছু উপাদান থাকলেও তা আদতে মানুষের পূর্ণ বিকাশের পথে বাঁধা। ওসব ধর্ম প্রশ্ন ও অনুসন্ধিৎসাকে নিরুৎসাহিত করে। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রশ্নকারীকে ভয়ের চোখে দেখে, ফলে নানারকম ভীতি তৈরি করে রেখেছে সন্দেহবাদীদের জন্য। ওই ধর্মগুলো মানুষের পূর্ণ ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে দেয়না বরং মানুষকে কোন এক অলৌকিক অস্তিত্বের দাস বানিয়ে রাখে। মানুষের জীবন মরণ, সুখ দুঃখ, সাফল্য ব্যর্থতা সবই নাকি সেই অলৌকিক ভাগ্যবিধাতার হাতে। এই ধর্মের বিরাট অংশটাই আসলে মনুষ্যত্বকে ধারণ করেনা, বিকাশ তো হতেই দেয় না।

কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা সেই ধর্মগুলোকে বাতিল বলার সাহস রাখেন না। তারা অন্য উপায় ধরেন। তারা বলেন “সকল ধর্মের মূল কথা এক। সকল ধর্মই মানুষের মঙ্গলের কথা বলে।” বুদ্ধিজীবীরা ধর্মের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, সেটা বিবেচনায় নিলে মনুষ্যত্বের বিকাশপ্রয়াসী একটা সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন ধর্মবোধ থাকার কথা কারণ বিশ্বজুড়ে মানবিকতার বা মনুষ্যত্বের রূপ একই। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা যখন বলছেন “সকল ধর্মের মূল কথা এক” তখন তারা আসলে প্রচলিত একাধিক ধর্মের কথাই বলছেন। অথচ সংজ্ঞামতে ধর্ম হওয়ার কথা একটাই। কিন্তু তারা বলছেন বহু ধর্মের কথা। এটা পরষ্পরবিরোধী।

তবুও আমরা ধরে নিতে পারি বিভিন্ন কালে বিভিন্ন স্থান বিশেষে সেখানকার সামাজিক বাস্তবতায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবোধ তৈরী হতে পারে। হয়েছেও সেরকম। ফলে পৃথিবী জুড়ে নানান ধর্ম, নানারকমের সৃষ্টিতত্ত্ব, নানান আচার অনুষ্ঠান। অর্থাৎ ধর্মের যেসকল অনুষঙ্গ তথা সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টিতত্ত্ব, পাপ পুণ্য, স্বর্গ নরক, হইলোক পরলোক, আচার অনুষ্ঠান এবং পবিত্র গ্রন্থ ও নবী রাসুল এসব কোন ঐশ্বরিক শক্তি দ্বারা প্রেরিত বা প্রতিষ্ঠিত কিছু নয়, এগুলো মানুষের উর্বর কল্পনা যার ভিত্তিমূলে আছে ভয় ও কার্যকারণ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে অপারগতা।

আরেক রকমের সমস্যা আছে। শাস্ত্র বাদ দিয়ে ধর্মের কথা কল্পনা করা যায়না এ যুগে। গ্রামীন জনপদে লোকসাধারণের মধ্যে প্রচলিত নানাপ্রকার লৌকিক ধর্মের কথা আলাদা। সেগুলো ঠিক ধর্ম যাকে বলে তা নয়। যে কালে লিখিত শাস্ত্র ছিলোনা, সেকালেও ধর্মবোধ ছিল। তখন সমাজে ধর্মবেত্তা ছিলেন। ধর্ম বিষয়ে তারাই ছিলেন সর্বেসর্বা। তারপর যখন ধর্মশাস্ত্রগুলো লিখিত রূপ পেয়েছে, সেই লিখিত শাস্ত্রগুলোকে যখন আসমানী কেতাব বা ঈশ্বর বা আল্লাহর প্রেরিত বাণী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, যখন সেইসব ধর্মশাস্ত্রের উপর ভর করে প্রত্যেকটা ধর্মের একটা স্পষ্ট কাঠামো দাড়িয়ে গেছে, তখন শাস্ত্র ছাড়া ধর্ম হয় কী করে? নজরুল যে লিখলেন :

রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।”

শাস্ত্র না ঘেঁটে ঈশ্বরানুসন্ধানের কোন পথ খোলা আছে কী? ঈশ্বরের স্বরূপ আমরা পাই শাস্ত্র থেকে। ঈশ্বরের সকল অলৌকিক ক্ষমতার কথা, আমাদের জীবনের করণীয় কী কী সেসব কথাও আসমানী শাস্ত্রে আছে। শাস্ত্রকে অতিক্রম করে কোন ধর্মের কথা বলছেন কবি এখানে? মানবধর্ম? যে সংজ্ঞা আমি উপরে উদ্ধৃত করেছি সেই ধর্ম? যদি তাই হয়, তাহলে নজরুল কী এখানে শাস্ত্রবিরোধী কথা বলেননি? অথচ আমি দেখলাম সেই বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী নজরুল আলোচনায় নজরুলকে ধর্মপ্রাণ মুসলমান বলছেন। যদি নজরুলকে মনুষ্যত্ব ধর্মপ্রাণ বলতেন তাহলে আপত্তি থাকতো না। কিন্তুু একদিকে তারা ধর্মের সংজ্ঞা দিচ্ছেন মনুষ্যত্ববোধকে কেন্দ্র করে, আবার বলছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। কিভাবে সম্ভব? পবিত্র আসমানী কেতাবকে অতিক্রম করে কিভাবে মুসলমান হওয়া সম্ভব? শাস্ত্র না মেনে ধার্মিক হওয়ার কোন উপায় রেখেছে ধর্মশাস্ত্রগুলো? আপনি বলতে পারেন “শাস্ত্রই সকল অনিষ্টের মূল”। কিন্তু ভেবে দেখুন শাস্ত্রই ধর্ম। বিমূর্ত ধর্মবোধের মূর্ত প্রতীক হচ্ছে শাস্ত্র। আপনি তাকে পবিত্র গন্থের মর্যাদা দিয়ে রেখেছেন।মুসলমানের কী আদর্শ, কী করণীয়, কী বিশ্বাস করতে হবে সবইতো শাস্ত্রীয় নিয়মের দ্বারা বিধিবদ্ধ। সেটা না মানলে আপনি মনুষ্যত্বকেন্দ্রিক ধর্ম অর্থাৎ মানবধর্মের অনুসারী হতে পারেন মাত্র, ইসলাম নয়।

কেউ আবার ধর্ম ও রিলিজিয়নকে সমার্থক মনে করেন না। রিলিজিয়ন মানে রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন ধর্মতন্ত্র। প্রচলিত ধর্মগুলোকে কেউ কেউ তাই ধর্মতন্ত্রও বলছেন। বুদ্ধিজীবীরা এই ধর্মতন্ত্রেরও সমালোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী না। তারা সকল ধর্মতন্ত্রের মধ্যেও বিরাট সব বিপ্লব ও সম্ভাবনা এবং কল্যান আবিষ্কার করেন। তারা উদাহরণ দেন বৌদ্ধধর্মের “পঞ্চশীল” নীতির। এঙ্গেলসকে উদ্ধৃত করে বলেন যে খ্রিস্ট ধর্মতন্ত্র ছিলো একটা ক্রীতদাসবিরোধী আন্দোলন, নিপীড়ন থেকে মুক্তির আন্দোলন। তারা রাহুল সাংকৃত্যায়ন, মানবেন্দ্রনাথ রায় এদুজন মার্কসবাদী লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে ইসলাম প্রকৃতপক্ষে একটি দাসবিরোধী ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণবিরোধী ধর্মতন্ত্র। ইউরোপের ঐতিহাসিক গিবনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে ইসলাম তৎকালীন সমাজের একটি বিপ্লব। সবই সত্য।

সমাজবিজ্ঞানের দৃ‌ষ্টিকোন থেকে দেখলে সকল ধর্ম আন্দোলনের একটা সামাজিক পটভূমিকা থাকে। ক্রমান্ব‌য়ে সেটা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে একটা তন্ত্রে পরিণত হয়ে শোষণের ও শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ধর্মকে আমি ওভাবেই দেখি। ধর্মের সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটা বুদ্ধিদীপ্ত কল্পনা, যে কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে ভয় ও অসহায়ত্ব থেকে। ধর্মতন্ত্রকে উল্লেখিত লেখকগণ বিচার করেছেন সমাজবৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে, ধর্মীয় ভাবালুতা দিয়ে নয়। তাঁরা শুধু ধর্মের সামাজিক ভূমিকাটুকু নিয়ে যা বলেছেন, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সেটুকুই উদ্ধৃত করেছেন মাত্র। ধর্ম সম্পর্কে উপরেই এই কয়েকটা উদ্ধৃতিই কী শেষ কথা, একমাত্র বক্তব্য? এর বাইরেও ধর্মতন্ত্রের বিরাট জগৎ আছে, সেখানে কুসংস্কার, অজ্ঞানতা, পশ্চাৎপদতা, ও হৃদয়হীনতা রয়েছে। সেসবকে বাদ দিয়ে শুধু কয়েকটা ইতিবাচক সামাজিক ভূমিকার কথা বলে তারা জনগনকে বিভ্রান্ত করছে কেন? ধর্মের এপিঠ ওপিঠ সবটা বলুন। তারা যে বলেন মুক্তবুদ্ধির সাথে ধর্মবুদ্ধির কোন বিরোধ নেই, এটা কিসের ভিত্তিতে বলেন? অলৌকিকতা, অন্ধবিশ্বাস, অজ্ঞতার উপর আস্থা রেখে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয়?

নিশ্চিতভাবেই সবগুলো প্রচলিত ধর্মশাস্ত্রে কিছু ভালো কথা, ইতিবাচক বক্তব্য আছে। মিথ্যা না বলা, চুরি না করার মতো নিষেধাত্মক উপদেশ যেমন আছে তেমনি আছে মানুষের কল্যানসাধনে প্রয়াসী হওয়ার আহবান। কিন্তু এইসকল বিধিনিষেধের বাইরে ধর্মের যে বিশ্বাসের জায়গাগুলো আছে, যেসবকিছুকে বিনা প্রশ্নে, বিনা শর্তে অন্ধের মতো বিশ্বাস করার কথা আছে, যে সেকল আচার অনুষ্ঠান পালনের অাবশ্যকীয়তার কথা আছে, সেগুলো কতটা যৌক্তিক? কতটা ভালো তা আমাদের জন্য বয়ে আনে? যদি বুদ্ধিজীবীর কথা শুনে আমাকে বিশ্বাস করতে হয় যে সৃষ্টিকর্তা মূলত একজন, যদি রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য – ” সকল মানুষই ঈশ্বরের সন্তান, মানুষের প্রতি ঘৃণাহীন প্রেম ও পরমেশ্বরের প্রতি বিশ্বাসপূর্ণ ভক্তি দ্বারাই ধর্মসাধনা হয়” কে বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে পৃথিবীতে এতো এতো ধর্মের এতো এতো সৃষ্টিকর্তা কেন? ধর্ম বিশ্বাস, ধর্মীয় দর্শন ও আচারের এতো ভিন্নতা কেন? ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষজন কেন মুখোমুখী সংঘাতে অবতীর্ণ হয়? কী করেন সেই পরমেশ্বর ঈশ্বর তখন?

সময় কী আসেনি ওসব শাস্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার? সময় কী আসেনি শাস্ত্রের ঈশ্বরকে জলাঞ্জলি দেওয়ার? মানুষের সম্ভাবনাকে যা বিকশিত করে, মনুষ্যত্বকে যা উন্নত করে সেরকম কিছু নীতিবোধকেই ধর্ম বলে চিহ্নিত করা দরকার এখন। ঈশ্বরহীন ধর্ম, যে ধর্ম বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন। যে ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ মানে না, যে ধর্ম শাস্ত্র দ্বারা বিধিবদ্ধ না, যে ধর্ম কোন কঠোর কাঠামো দ্বারা শাসিত না, যে ধর্মবোধের ভিত্তি হবে ঐক্য, এবং সকল মানুষের মধ্যে সুনীতির বিষয়ে ঐক্যমত্য। তার থাকবেনা কোন শাস্ত্র, কোন মন্দির, কোন পুণ্যভূমি, কোন পুরোহিত। প্রচলিত ধর্ম ও ধর্মশাস্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেই কেবল মনুষ্যত্বের বিকাশপ্রয়াসী ওই নতুন ধর্ম গড়ে উঠতে পারে যাকে এই লেখার শুরুতে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের জবানিতে উল্লেখ করা হয়েছে “মানবধর্ম” হিসেবে।

তবে আশার কথা হচ্ছে প্রতিদিনই আমরা সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রকে পরাস্ত করে, ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে পায়ে মাড়িয়ে মানবিক শুভবোধে উজ্জীবিত হয়ে বড় মনের মানুষ হয়ে উঠছি। আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেক মানুষের দেখা পাচ্ছি যারা প্রথাগত শাস্ত্রীয় ধর্মকে অতিক্রম করে মানবধর্ম পালন করে চলেছে। তারা মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, সহমর্মিতা, সকলকে সমান করে দেখা, সকলের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করছেন। সমাজের ভয়ে নামমাত্র শুধু ধর্মের খোলসটা গায়ে জড়িয়ে রেখেছে। ধর্মের খোলসটা যদি আমাদের সমাজ প্রত্যাখ্যান করতে পারে তাহলে আমাদের চারিপাশে ভালো মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of