১৯১: মক্কা বিজয়-৫: উম্মে হানীর আর্তনাদ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

আদি উৎসে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ‘পূর্ণাঙ্গ’ জীবনী-গ্রন্থের (সিরাত) বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই, বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকরা মুহাম্মদের নবী জীবনের একই ঘটনার বর্ণনা বিভিন্নভাবে তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। কারও বর্ণনায় তা বিস্তারিত, কারও বর্ণনায় তা যৎসামান্য। কারও বর্ণনায় তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট, কারও বর্ণনায় তা অস্পষ্ট। কোন বিশেষ ঘটনার বর্ণনা কেউবা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, অন্যজনের বর্ণনায় তা হয়তো গুরুত্বহীন কিংবা একেবারেই অনুপস্থিত। কোন নির্দিষ্ট উপাখ্যানের বর্ণনায় কেউবা আনুষঙ্গিক প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ঘটনার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, যা মূল ঘটনাটির ধারণায় অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছে; কেউবা তা এড়িয়ে গিয়েছেন। সে কারণেই, আদি উৎসে শুধু এক জন লেখকের ‘সিরাত’ গ্রন্থ পড়ে নবী মুহাম্মদের ঘটনা-বহুল নবী জীবন ও তাঁর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ! সামগ্রিকভাবে মুহাম্মদের মদিনার নবী জীবনের সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ওমর ইবনে ওয়াকিদ আল-আসলামি (৭৪৭ সাল-৮২৩ সাল), সংক্ষেপে আল ওয়াকিদি, তাঁর ‘কিতাব আল-মাঘাযি’ গ্রন্থে।

মুহাম্মদের চাচা আল আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের (৫৬৮ সাল- ৬৫২ সাল) অসীম সাহসিকতা ও প্রত্যুৎপন্ন-মিতায় মুহাম্মদ কী শর্তে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে কুরাইশদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; অতঃপর আবু সুফিয়ান মুহাম্মদের মক্কা প্রবেশের পূর্বেই দ্রুতবেগে মক্কায় পৌঁছে কীভাবে কুরাইশদের সেই শর্তগুলো অবহিত করিয়েছিলেন; অতঃপর কুরাইশরা তাঁদের বিপর্যয় ও জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে কীভাবে তাঁদের বাড়িঘর ও কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন; তার বিশদ আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে।

অতঃপর মুহাম্মদ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বে ‘ধু-তুয়া’ নামক স্থানটিতে এসে তার সেনা বাহিনীকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। তিনি আল যুবায়ের বিন আওয়ামের নেতৃত্বে তাঁর সঙ্গের সৈন্যদের মক্কার দক্ষিণ দিক দিয়ে, সাদ বিন উবাদার নেতৃত্বে তাঁর সঙ্গের সৈন্যদের মক্কার উত্তর দিক দিয়ে ও খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের নেতৃত্বে তাঁর সঙ্গের সৈন্যদের মক্কার নিম্নভাগ দিয়ে শহরে প্রবেশের আদেশ জারী করেন। একমাত্র খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের সৈন্যদের সঙ্গে অল্প কিছু কুরাইশদের খণ্ডযুদ্ধ ছাড়া “মক্কায়” আর কোন বড় ধরণের সংঘর্ষ হয় নাই। নিহতের সংখ্যা: মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় কুরাইশদের ১২-১৩জন ও মুসলমানদের তিন জন; আর আল ওয়াকিদির বর্ণনায় কুরাইশ দলের নিহতের সংখ্যা মোট ২৮ জন ও মুসলমানদের মোট দুই জন।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (ও আল-তাবারীর) বর্ণনার পুনরারম্ভ – কবিতা পঙক্তি পরিহার:
(আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনারই অনুরূপ) [1] [2] [3]

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৯০) পর:

‘আবদুল্লাহ বিন আবু বকর আমাকে বলেছেন:
যখন আল্লাহর নবী ‘ধু-তুওয়া (Dhu Tuwa)’ নামক স্থানে এসে দেখতে পান যে আল্লাহ তাঁকে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে সম্মানিত করেছে, তিনি তাঁর সওয়ারী পশুটি-কে থামান ও ইয়েমেনে তৈরি এক টুকরা লাল কাপড়ের পাগড়ি পরিধান করে আল্লাহর কাছে তাঁর মাথা এমনভাবে নত করে শুকরিয়া আদায় করেন যে, তা তাঁর ঘোড়ার জিনের মধ্যখানে প্রায় স্পর্শ করে। [4]

ইয়াহিয়া বিন আববাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আল-যুবায়ের <তার পিতা হইতে <তার নানী আসমা বিনতে আবু বকর হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন:

যখন আল্লাহর নবী ধু-তুওয়া এসে থামেন, আবু কুহাফা [আবু বকরের পিতা] তার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ কন্যাটিকে (আল ওয়াকিদি: যার নাম ছিল ‘কুরায়েবা বিনতে আবু কুহাফা’) বলে, “আমাকে আবু কুবায়েসের [মক্কার নিকটবর্তী একটি পাহাড়] ওপরে নিয়ে চল্”, কারণ তার দৃষ্টিশক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা সেখানে যায়, সে তার কন্যাটিকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় যে সে কী দেখতে পাচ্ছে। সে তাকে বলে, “কালো রংয়ের সমাবেশ।” সে [আবু কুহাফা] বলে, “সেগুলো হলো ঘোড়ার দল।” অতঃপর সে তাকে বলে যে সে দেখতে পাচ্ছে: একটি লোক সেগুলোর সামনে এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। সে বলে: লোকটি হলো সেনাদলের কর্মকর্তাদের সহকারী, যার মানে হলো, লোকটি অশ্বারোহী সেনাদের আদেশ পালনকারী এক ব্যক্তি। অতঃপর সে [কন্যাটি] বলে, “হায় আল্লাহ! কালো রংয়ের সমাবেশ-টি ছড়িয়ে পড়ছে।” সে বলে, “সে ক্ষেত্রে, অশ্বারোহী সেনাদের ঘোড়াগুলো উন্মুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং তুই আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল্।”

সে তাকে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু সে তার বাড়িতে পৌঁছার আগেই অশ্বারোহী সৈন্যরা তার সম্মুখীন হয়। তার গলায় ছিল রূপার নেকলেস। যে লোকটি তার সম্মুখীন হয়েছিল, সে তার গলা থেকে তা ছিঁড়ে নিয়ে যায়। যখন আল্লাহর নবী সেখানে পৌঁছেন ও মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করেন, আবু বকর তার পিতাকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে আসে। তাকে দেখার পর আল্লাহর নবী বলেন, “এই বৃদ্ধ লোকটিকে কেন তুমি তার বাড়িতে রেখে আসলে না, যাতে আমিই সেখানে তার কাছে যেতে পারতাম?” আবু বকর জবাব দেন যে, তার চেয়ে তাঁর কাছে তার আসাটাই বেশী উপযুক্ত। সে তাকে তাঁর সম্মুখে বসিয়ে দেয় ও তার বুক চাপড়ে তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে বলে; অতএব সে তাই করে। আবু বকর যখন তার পিতাকে নিয়ে আসে, তার পিতার চুলগুলো ছিল ধবধবে সাদা ‘ইডেলউয়িসের’ [‘Edelweiss’-এক ধরণের ফুল] মত; আল্লাহর নবী তাদেরকে তাতে কলপ লাগাতে বলেন।

অতঃপর আবু বকর উঠে দাঁড়ায় ও তার বোনের হাতটি ধরে বলে, “আমি আমার বোনের গলার হারটির জন্য আল্লাহ ও ইসলামের নামে লোকদের জিজ্ঞাসা করেছি, কিন্তু কেউ তার কোন জবাব দেয় নাই।” অতঃপর সে বলে, “বোন, ধরে নাও যে তোমার হারটি আল্লাহই নিয়ে গেছে (আর তুমি তার কাছে এর প্রতিদান প্রত্যাশা করো), কারণ এখনকার মানুষদের মধ্যে খুব বেশি সততা নেই।”

আবদুল্লাহ বিন আবু নাজিহ আমাকে বলেছেন:
আল্লাহর নবী ধু-তুয়া স্থানটিতে তার সেনা বাহিনীকে বিভক্ত করেন। তিনি আল যুবায়ের বিন আওয়াম-কে কিছু লোকজনদের-কে সঙ্গে দিয়ে ‘কুদার (Kuda)’ পাশ দিয়ে [মক্কার] ভিতরে ঢোকার আদেশ করেন; আল-যুবায়ের ছিল সেনাবাহিনীর বাম প্রান্তের নেতৃত্বে। তিনি সাদ বিন উবাদা-কে কিছু কিছু লোকজনদের-কে সঙ্গে দিয়ে ‘কাদার (Kada)’ পাশ দিয়ে ভিতরে ঢোকার আদেশ দেন। (‘কুদা’ হলো মক্কার দক্ষিণে অবস্থিত একটি পাহাড়; আর ‘কাদা’ পাহাড়টির অবস্থান হলো মক্কার উত্তর দিকে।) [5]

কিছু মুহাদ্দিস যুক্তি দেখিয়েছেন এই বলে যে, সা’দ অগ্রসর হওয়ার প্রাক্কালে বলে,”আজকের দিনটি হলো যুদ্ধের, আর নয় নিরাপত্তা প্রদান।”
মুহাজিরদের এক ব্যক্তি তা শুনতে পায় (ইবনে হিশাম: ‘বলা হয় সে ছিল ওমর’) ও সে আল্লাহর নবীকে এসে বলে যে, ‘আশঙ্কা এই যে, সে হয়তো সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারে।’ আল্লাহর নবী আলী-কে হুকুম করেন যে সে যেন তার কাছে যায় ও যুদ্ধের পতাকাটি তার কাছ থেকে নিয়ে নেয় ও তা নিয়ে নিজেই ভিতরে প্রবেশ করে। [6]

আবদুল্লাহ বিন আবু নাজিহ তার উপাখ্যানের বর্ণনায় আমাকে বলেছেন: আল্লাহর নবী লোকজনদের সঙ্গে দিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ-কে মক্কার নিম্নভাগের ‘আল-লিত (দক্ষিণ দিকের প্রধান সড়ক) দিয়ে ভিতরে ঢোকার আদেশ দেন। খালিদ ছিল সেনাবাহিনীর ডান প্রান্তের (right wing) নেতৃত্বে; আর তার সঙ্গে ছিল আসলাম, সুলায়েম, ঘিফার, মুযায়েনা, জুহায়েনা ও অন্যান্য আরব গোত্রের লোকেরা। আবু উবায়েদা বিন আল-জাররাহর সৈন্যরা দলে আল্লাহর নবীর সম্মুখ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে। আল্লাহর নবী ‘আধাকিরের’ (মক্কার নিকটবর্তী এক গিরিপথ’)’ পথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন ও মক্কার উপরি ভাগে এসে তিনি তাঁর যাত্রা বিরতি দেন। অত:পর সেখানে তাঁর তাঁবুটি নির্মাণ করা হয়। [7]

আবদুল্লাহ বিন আবু নাজিহ ও আবদুল্লাহ বিন আবু বকর আমাকে বলেছেন:
সাফওয়ান বিন উমাইয়া, ইকরিমা বিন আবু জেহেল ও সুহায়েল বিন আমর যুদ্ধের নিমিত্তে ‘আল খানদামা’ নামক স্থানে কিছু লোক জোগাড় করে। আল্লাহর নবীর মক্কায় প্রবেশের পূর্বে, বানু বকর গোত্রের হিমাস বিন কায়েস বিন খালিদ নামের এক ভাই তার তরবারিতে ধার দেওয়ার প্রাক্কালে তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় যে কেন সে তা করছে। জবাবে সে যখন তার স্ত্রীকে বলে যে তার এই কাজটি মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, তখন তার স্ত্রী তাকে বলে যে তার মনে হয় না এটা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে। প্রত্যুত্তরে সে বলে, তার আশা এই যে সে তাদের কোন একজনকে দাস হিসাবে হস্তগত করে তাকে [স্ত্রীকে] প্রদান করবে। [8]

অতঃপর সে সাফওয়ান, সুহায়েল ও ইকরিমার সঙ্গে ‘আল খানদামায় (al-Khandama)’ গমন করে। অতঃপর যখন খালিদের নেতৃত্বে মুসলমানরা সেখানে আসে, তখন তারা তাদের বিরুদ্ধে খণ্ডযুদ্ধ শুরু করে; তাতে খালিদের অশ্বারোহী সেনাদের অন্তর্ভুক্ত বানু মুহরাব বিন ফিহির গোত্রের কুরয বিন জাবির নামের একজন ও বানু মুনকিধ গোত্রের মিত্র খুনায়েস বিন খালিদ বিন রাবিয়া বিন আসরাম নামের আর একজন লোক নিহত হয়। তারা খালিদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে না গিয়ে নিজেরা অন্য এক রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় দু’জনই খুন হয়। খুনায়েস খুন হয় আগে। অতঃপর, কুরয তাকে তার দুই পায়ের মাঝখানে রেখে তাকে রক্ষার জন্য তার নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করে। খুনায়েসের অন্য নাম ছিল আবু সাকার (Abu Sakhr)।

সালামা বিন আল-মেইলা নামের খালিদের এক অশ্বারোহী সেনা খুন হয়। আর মুশরিকদের খুন হয় বারো-তেরো জন লোক; অতঃপর তারা পলায়ন করে। হিমাস দৌড়ে পালিয়ে যায় ও বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীকে বলে, দরজার খিল লাগিয়ে দিতে।’

আল তাবারীর অতিরিক্ত বর্ণনা:
(আল ওয়াকিদির অন্য এক বর্ণনা, আল তাবারী এই বর্ণনারই অনুরূপ)

‘আবু সুফিয়ান ও হাকিম [বিন হিযাম] আল্লাহর নবীর কাছ থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করার পর, আল্লাহর নবী আল যুবায়ের-কে তাদের পিছনে প্রেরণ করেন। তিনি তাকে মুহাজির ও আনসারদের অশ্বারোহী সেনাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন ও তাকে যুদ্ধের পতাকাটি দেন। তিনি তাকে এই নির্দেশ প্রদান করেন যে, সে যেন মক্কার উপরি ভাগে ‘আল-হাজুন’ নামক স্থানে পতাকাটি স্থাপন করে। তিনি আল-যুবায়ের-কে বলেন, “তোমাকে আমি যেখানে পতাকাটি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছি, আমি সেখানে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তুমি সেখান থেকে প্রস্থান করবে না।” (আল্লাহর নবী সেই স্থানটি দিয়ে [মক্কা] প্রবেশ করেন। [9]

তিনি খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ও তার সাথে যুক্ত বানু কুদাহ ও বানু সুলায়েম গোত্রের লোকজন, যারা মুসলমান হয়েছিল; আর ঐ সমস্ত লোকজন যারা অল্প কিছুদিন আগে মসলমান হয়েছিল এই সমস্ত লোকদের এই আদেশ করেন যে তারা যেন মক্কার নিম্নভাগ দিয়ে প্রবেশ করে। এই স্থানটি হলো সেখানে, যেখানে বানু বকর গোত্রের লোকেরা বসবাস করতো। কুরাইশরা তাদের-কে, বানু আল-হারিথ বিন আবদে মানাত গোত্র ও আহাবিশ [ছোট ছোট উপগোত্র] লোকদের মক্কার নিম্নভাগে হাজির হওয়ার জন্য বলে, যেন তারা কুরাইশদের সাহায্য করতে পারে। তাই খালিদ তাদের প্রতিরোধের মুখে মক্কার নিম্নভাগ দিয়ে প্রবেশ করে। আমাকে যা বলা হয়েছে, তা হলো, যখন আল্লাহর নবী খালিদ ও আল-যুবায়ের-কে প্রেরণ করেন, তিনি তাদের বলেন, “তোমার শুধু তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসবে।”

যখন খালিদ মক্কার নিম্নাঞ্চলে বানু বকর গোত্র ও আহাবিশ লোকদের ওখানে আসে, সে তাদের সাথে যুদ্ধ করে (আল ওয়াকিদি: ‘সে কুরাইশদের চব্বিশ জন ও হুদায়েল [Hudhayl] গোত্রের চার জন লোককে হত্যা করে’); আর আল্লাহ তাদের-কে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

এটাই ছিল একমাত্র যুদ্ধ, যা সংঘটিত হয়েছিল মক্কায়। যদিও, বানু মুহারিব বিন ফিহির গোত্রের কুরয বিন জাবির নামের এক লোক ও বানু কাব গোত্রের ইবনে আল-আশার; আল-যুবায়ের অশ্বারোহী সেনাদলের এই দুইজন লোক ‘কাদার’ দিকের পথটি ধরে অগ্রসর হয়। তারা আল-যুবায়ের যে পথে অগ্রসর হয়েছিল ও তাকে যেই পথটি ধরে অগ্রসর হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা সেই পথটি গ্রহণ করে নাই। তারা কা’দার পথটির ঢালু অংশটিতে একদল কুরাইশদের হামলায় নিহত হয়। মক্কার উপরি ভাগে আল-যুবায়েরের সাথে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। আল্লাহর নবী সেই স্থানটি দিয়ে আগমন করেন। লোকেরা তাঁর সম্মুখে এসে দাঁড়ায় ও তাঁর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আর এই ভাবেই মক্কার লোকেরা মুসলমানে পরিণত হয়। আল্লাহর নবী অর্ধ মাস কাল তাদের সঙ্গে থাকেন, এর বেশী নয়; ঐ সময় নাগাদ, যতক্ষণে না হাওয়াযিন ও থাকিফ গোত্রের লোকেরা হুনায়েন নামক স্থানে এসে তাদের শিবির স্থাপন করে।’

আল ওয়াকিদির অতিরিক্ত বর্ণনা: [10]

‘তিনি বলেছেন: ইবনে আবি সাবরা হইতে <মুহাম্মদ বিন জুবায়ের বিন মুতিম হইতে < তার পিতা হইতে <তার পিতামহ হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন যে, তিনি বলেছেন: আমি দেখেছি, আল্লাহর নবী বিজয় কালে অনাবাদী ‘আল-হাজুন’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। তিনি প্রতিটি নামাজে শরীক শরীক হতেন। তারা বলেছেন:

উম্মে হানী বিনতে আবি তালিবের বিবাহ হয়েছিল হুবায়েরা বিন আবি ওয়াহাব আল-মাখযুমির সাথে। বিজয়ের দিনটি-তে আবদুল্লাহ বিন আবি রাবিয়া আল-মাখযুমি ও আল হারিথ বিন হিশাম নামের দুই দেবর তার [উম্মে হানী] কাছে এসে তাদের-কে রক্ষার আবেদন করে। তারা বলে, “আমরা কি তোমার সুরক্ষায় রয়েছি?” সে বলে, “হ্যাঁ, তোমরা এখন আমার সুরক্ষায়।”

উম্মে হানি বলেছেন: “তারা যখন আমার সুরক্ষায় ছিল, তখন আলী তার বর্ম পরিধান করা অবস্থায় ধীর গতিতে গৃহে প্রবেশ করে। আমি তাকে চিনতে পারি নাই। তাই আমি তাকে বলি যে, আমি আল্লাহর নবীর চাচার কন্যা।” তিনি বলেছেন: সে আমার কাছ থেকে মুখ ঘুড়িয়ে নেয় ও তার মুখের আবরণটি খুলে ফেলে; আর কি আশ্চর্য, সে ছিল আলী!

আমি বলি: “হে আমার ভাই!” আমি তাকে জড়িয়ে ধরি ও শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু সে তাদের দিকে তাকায় ও তাদের হামলার উদ্দেশ্যে তার তরবারিটি বের করে। আমি বলি:

“লোকদের মধ্যে এই কী আমার ভাই, যে আমার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারে!”

তিনি বলেছেন: আমি তাদের উপরে একটি পোশাক নিক্ষেপ করি, আর সে বলে,

“তুমি কী অবিশ্বাসীদের রক্ষা করছো?”

আমি তাদের সম্মুখে দাঁড়াই ও বলি,
“আল্লাহর কসম, তাদের-কে হামলা করার আগে তোমাকে অবশ্যই আমাকে দিয়ে শুরু করতে হবে।”

তিনি বলেছেন: সে বাহিরে চলে যায়, আর আমি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দরজা বন্ধ করে ফেলি ও তাদের-কে বলি, “ভয় পেয়ো না!”

তিনি বলেছেন: ইবনে আবি ধিব হইতে <আল-মাকবুরি হইতে <আবু মুররা হইতে, যে ছিল আকিল (ইবনে আবি তালিবের) তত্বাবধানে <উম্মে হানী হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন যে, তিনি বলেছেন:

‘আমি আল-বাথায় আল্লাহর নবীর তাঁবুতে যাই, কিন্তু আমি তার সাক্ষাত পাই না। আমি সেখানে ফাতিমার সাক্ষাত পাই ও তাকে বলি, “আমার নিজের মায়ের পেটের পুত্র-সন্তান আলীর এ কী আচরণ দেখছি? আমি আমার অবিশ্বাসী দেবরদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আর সে তাদের উভয়কেই হত্যার জন্য পাকড়াও করতে উদ্যত!”

তিনি বলেছেন: আর ফাতিমা আমার সাথে যে আচরণ করেছিল, তা ছিল তার স্বামীর চেয়েও বেশি হিংস্র! সে বলে, “তুমি অবিশ্বাসীদের সুরক্ষা দিয়েছ?”

তিনি বলেছেন: অতঃপর আল্লাহর নবী সেখানে আসেন, তার শরীরে ছিল সামান্য ধুলা; অতঃপর তিনি বলেন, “সম্মানিত উম্মে হানীকে শুভেচ্ছা!” তাঁর পরনে ছিল একটি মাত্র পোশাক। আমি তাঁকে বলি,

“আমি আমার ভাই আলীর এ কি আচরণ দেখছি? আমি কোন রকমে তার কাছ থেকে রক্ষা পেয়েছি। আমি আমার অবিশ্বাসী দেবরদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আর সে তাদের উভয়কেই পাকড়াও করে হত্যা করতে চায়।”

আল্লাহর নবী বলেন, “এমনটি হওয়া উচিত নয়। তুমি যাদের আশ্রয় দিয়েছ, আমরা তাদের নিরাপত্তা প্রদান করবো; আর তুমি যাদের সুরক্ষা দিয়েছ, আমরা তাদের সুরক্ষা প্রদানে সম্মত।”

অতঃপর তিনি ফাতিমা-কে আদেশ করেন, সে তাঁকে পরিষ্কারের জন্য পানি ঢেলে দেয়; তিনি ওযু করেন। অতঃপর তিনি একবস্ত্র-পরিবৃত অবস্থায় আট রাকাত নামাজ পড়েন। সময়টি ছিল মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে, দুপুরের আগে।

তারা জানিয়েছেন, তিনি বলেছেন: আমি তাদের কাছে ফিরে আসি ও খবরটি তাদের জানাই, আর বলি, “যদি তোমাদের ইচ্ছা হয়, এখানেই থেকে যাও; আর যদি তোমরা তোমাদের বাড়িতে ফিরে যেতে ইচ্ছা করো, ফিরে যাও।” তিনি বলেছেন: তারা আমার বাড়িতে আমার সাথে দুই দিন যাবত অবস্থান করে, অতঃপর তারা তাদের নিজেদের বাড়িতে ফিরে যায়।

তিনি বলেছেন: আমি আল্লাহর নবীর সাথে তাঁর ‘আল-আবতাহর’ তাঁবুতে হুনায়েন অভিযানে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অবস্থান করি। তিনি বলেছেন: কেউ একজন আল্লাহর নবীর কাছে এসে বলে, “হে আল্লাহর নবী, আল হারিথ বিন হিশাম ও ইবনে আবি রাবিয়া তাদের সমাবেশের জায়গাটিতে ইয়েমেনের পোশাক পরিধান করে বসে আছে।” আল্লাহর নবী বলেন, “কোন উপায় নেই; আমরা তাদের সুরক্ষা দিয়েছি!”—

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

>>> স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আদর্শে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর অন্যতম বিশেষ অনুসারীরা “অবিশ্বাসীদের প্রতি” কী পরিমাণ ঘৃণা ও নৃশংসতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন; মুহাম্মদের মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে নিজেরই সহোদরা বোন অবিশ্বাসী উম্মে হানী ও তাঁর দেবরদের সাথে আলী ইবনে আবু তালিবের এই আচরণ, তারই এক উদাহরণ মাত্র। আলীর এই নৃশংসতা শুধু অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি তাঁর প্রতিপক্ষ বিশ্বাসী মুসলমানদের ও কী অমানুষিক নৃশংসতায় হত্যা করতেন, তার আলোচনা “আলী ইবনে আবু তালিবের নৃশংসতা” পর্বে (পর্ব: ৮২) করা হয়েছে! [11]

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির বর্ণনার অতিরিক্ত বিশেষ অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনা: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিঙ্ক তথ্যসূত্র এক ও দুই।

The added narratives of Al-Waqidi:

He said: Ibn Abī Sabra related to me from Muḥammad b. Jubayr b. Mut‛im from his father from his grandfather, who said: I saw the Messenger of God unsettled in al-Hajūn during the conquest. He came for every prayer.

They said: Umm Hānī bt. Abī Ṭālib was married to Hubayra b. Abī Wahb al-Makhzūmī, and when it was the day of the conquest, her brothers-in-law, ‛Abdullah b. Abī Rabīa al-Makhzūmī and al-Ḥārith b. Hishām came to her seeking protection. They said, “We are in your protection?” She said, “Yes, you are in my protection.” Umm Hānī said, “They were with me when ‛Alī, wearing armor, entered slowly on a horse. I did not recognize him, so I said to him, I am the daughter of the Prophet’s uncle.’” [Page 830] She said: He held back from me and revealed his face, and lo and behold, it was ‛Alī! I said, “My brother!” I embraced him and greeted him, but he looked at them, and drew his sword against them. I said, “My brother from among the people does this to me!” She said: I threw a garment over them and he said, “Are you protecting disbelievers?” I stood before them and said, “By God, you will surely begin with me before you attack them!” She said: He went out, and I immediately locked the house upon them and said, “Do not fear!”

He said: Ibn Abī Dhi’b related to me from al-Maqburī from Abū Murra, the mawlā of ‛Aqīl (b. Abī Ṭālib), from Umm Hānī, who said: I went to the tent of the Messenger of God in al-Bathā’ and I did not find him, but I found Fāṭima there and I said, “What did I meet from him who is the son of my mother, ‛Alī? I gave protection to my brothers-in-law who are disbelievers and he seized upon them both to kill them!” She said: And Fāṭima was more violent against me than her husband! She said, “You gave protection to disbelievers?” She said: Until the Messenger of God appeared, with traces of dust upon him, and he said, “Greetings to the esteemed Umm Hānī!” and he was wearing a single garment. I said, “What did I meet from my brother ‛Alī? I barely escaped him! I gave protection to my brothers-in-law, who are disbelievers, and he would sieze them both to kill them!” The Messenger of God said, “This should not be. We granted security to those you sheltered, and protection to those you protected.” Then he commanded Fāṭima, and she poured water for him to wash and he took Ablutions. Then he prayed eight bowings with a single garment around him. And that was before noon during the Conquest of Mecca.

They said: She said: I returned to them and I informed them and said, “If you wish, stay, and if you wish, return to your homes.” She said: They stayed with me for two days in my home, and then they returned to their homes. She said: I was with the Messenger of God in his tent in al-Abṭaḥ until he set out to Ḥunayn. She said: Someone came to the Messenger of God [Page 831] and said, “O Messenger of God, al-Ḥārith b. Hishām and Ibn Abī Rābīa are seated in their meeting place wearing garments from Yemen.” The Messenger of God said, “There is no way to them; we have granted them protection!” —

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:
[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ সাল): পৃষ্ঠা ৫৪৮-৫৫০
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ সাল): ভলুউম ৮; পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৮
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21292&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] আল-ওয়াকিদি (৭৪৭ সাল-৮২৩ সাল): পৃষ্ঠা ৮২৩-৮২৯; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪০৫-৪০৮।
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-

[4] ‘ধু-তুওয়া’ স্থানটি হলো মক্কার নিকটবর্তী একটি উপত্যকা (দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত সমতল বা অসমতল, ঢালু, প্রশস্ত ভূমিক্ষেত্র)।

[5] Ibid আল তাবারী; নোট নম্বর ৭৩০: “কুদা (Kuda) ও কাদা (Kada) – দুইটি পৃথক স্থান (যা মাঝে মাঝে বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে)। ‘কুদা’ মক্কার নিম্নভাগে (দক্ষিণ অংশে) অবস্থিত একটি পাহাড়; আর ‘কাদা’ পাহাড়টির অবস্থান হলো মক্কার উপরের অংশে (উত্তর দিকে)।”

[6] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক – ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮০০, পৃষ্ঠা ৭৭৩: “বলা হয় সে ছিল ওমর।”

]7] Ibid আল তাবারী; নোট নম্বর ৭৩২: ‘আল-লিত’ হলো দক্ষিণ দিকের প্রধান সড়ক।’

[8] Ibid আল তাবারী; নোট নম্বর ৭৩৪: “’আল খানদামা’ হলো মক্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত এক পাহাড়।”

[9] Ibid আল তাবারী; নোট নম্বর ৭২৭: ‘আল-হাজুন হলো একটি পাহাড়, যার ওপর থেকে মক্কা পরিদর্শন করা যায়।’

[10] Ibid আল-ওয়াকিদি: পৃষ্ঠা ৮২৯-৮৩১; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৪০৮-৪০৯

[11] আলী ইবনে আবু তালিবের নৃশংসতা (পর্ব: ৮২):
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOT3l5NmpOR3VwWEE/view

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of