মুখস্থবিদ্যা

আমাদের স্কুল জীবন ছিল মুখস্থবিদ্যার জীবন। আমরা সারাদিন গরুর মত জাবর কেটে যেতাম। আমাদের চিন্তার বিকাশ হতো না। চিন্তা করার স্বাধীনতা ছিল না। যখন আমরা কাউকে বলতাম ‘আমার মনে হয়’ অর্থাৎ ইংরেজিতে আই থিংক, তখন শিক্ষক থেকে শুরু করে বুড়োরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলত ‘তুই আবার ভাবতেও পারিস!’

ছোটকাল থেকেই আমাদের প্রায় সব কিছুতেই অবজ্ঞা করা হয়; আমরা বয়সের সাথে বেড়ে উঠি ঠিকই, কিন্তু আমাদের চিন্তাধারা মনমানসিকতা খুবই সংকীর্ণরূপ ধারণ করে থাকে। আমরা সারাদিন ভাত চাবানোর মত করে সমাজ, বিজ্ঞান, বাঙলা, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়াদি মুখস্থ করে যেতাম। আমাদের শিক্ষকেরা ছিল অভূতপূর্ব চিন্তার অধিকারী, বিশেষ করে ‘গনিত’ যে করাতেন, তিনি বলতেন- এই অংক যদি না বুঝিস তাহলে মুখস্থ করে ফেল। আমরা পৃথিবীর এক আশ্চর্যকর জাতি; যারা পাটিগণিত, বীজগণিত, সম্পাদ্য, উপপাদ্য মুখস্থ করে ফেলার ক্ষমতা রাখি।

সম্ভবত, আমাদের সপ্তাহে তিনদিন ধর্মক্লাস ছিল। ধর্ম শিক্ষকের সাথে আমাদের এমন একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যা মনিব ও তাহার কুকুরের কাহিনীর মত। আমাদের মাথা ছিল, মগজ ছিল কিন্তু তা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। আমরা কুকুরের মত চুপচাপ হুকুম পালন করে যেতাম। সারাদিন বিড়বিড় করে পড়তে থাকতাম। যে যতো মুখস্থ করতে পারবে, সে ততো মেধাবী। এটাই আমাদের দেশের মেধাবীর সংজ্ঞা। আমাদের শিক্ষকেরা হিংসুটে ছিল, তারা প্রশংসা করতে পারতো না, কিন্তু অপমান করতে তারা ছাড়ত না। ক্লাসের সকল ছেলেমেয়ের সামনে নিম্নমানের চিন্তাধারা প্রকাশ করতে পিছুপা হতো না।

Image result for মুখস্থবিদ্যা

 

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে আমি অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় ‘গণিতে’ ফেল করি। আমার শিক্ষকেরা আমাকে বলতে থাকে- পড়াশোনা না করলে তো এমন হবেই। সারাদিন শুধু মাঠে দৌড়াদৌড়ি আর বন্ধুদের সাথে ইতরামি ইত্যাদি। আবার, বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলে তারাই বলে- ‘সবই আল্লাহ্‌ ইচ্ছা, আল্লাহ্‌ চাইছে তাই এত ভালো করতে পারছ।’ তখন আমি বলি, পড়লাম আমি, খাটলাম আমি, পরীক্ষা দিতাম আমি, ভালো রেজাল্ট পেলাম আমি; আর প্রশংসা পাবে আল্লাহ্‌? এ কেমন কথা? শিক্ষকেরা বকা দিতো আর বলত, বেশি অহংকার ভালো না। ধর্মে বলেছে, সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র নামে। ধর্মে বলেছে বলেই কি নিজের মেহনত আল্লাহ্‌কে দিয়ে দিতে হবে নাকি? আল্লাহ্‌ নিশ্চয়ই প্রশংসার ক্ষুধায় জর্জরিত ভিক্ষুক নন

স্কুলের ধর্ম বইতে আমরা ‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’, ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে যেতে হলেও যাও’, ‘জ্ঞানীর কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে বেশি পবিত্র’, ‘যারা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করায় তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত’, ‘যে নিজেকে জেনেছে সে আল্লাহ্‌কেও জেনেছে’, ‘ইহুদী বুড়ির সাথে নবী মোহাম্মদের রাস্তায় কাঁটা বিছানোর’ কাহিনীসহ এমন শত শত আল্লাহ্‌ ও মোহাম্মদকে কেন্দ্র করে নানা ধরণের বানী ও হাদিস পড়তাম, যা সত্য নয়। সবই জাল হাদিস।

কোরআন, হাদিস, বুখারি শরীফ, মুসলিমে, তিরমিযীসহ আরও যতো ইসলামিক গ্রস্থ ও ইসলামিক স্কলারের গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে যে এগুলো সবই বানোয়াট। কিন্তু এই কথা বা উক্তি বা বানী বা হাদিসগুলি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত ও জনপ্রিয়। মোল্লারা হিন্দু ও বৌদ্ধদের নাম ব্যবহার করে ধর্মানুভূতির অজুহাতে সহিংস হামলা চালায় এবং লেখক ব্লগারদের লেখাকে ইসলাম অবমাননা হিশেবে চিহ্নিত করে হত্যা করে অথচ স্কুলের বইগুলিতে যে দশকের পর দশক মিথ্যে প্রচার করা হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের কোন পদক্ষেপ নেই।

ধর্মের নামে এই মিথ্যে বা অসত্য কথাগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মডারেট মুসলিমদের পক্ষে যায়। মডারেট মুসলিমেরা সব সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকে, কারণ তারা জীবনে যা চায় ও যা করে- তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মের রীতিনীতি লঙ্ঘিত হয়ে থাকে। এবং এই অনিশ্চয়তা থেকে তারা মিথ্যে, অসত্য, কাল্পনিক, নিজের চিন্তা মিশ্রিত এবং সুবিধে অনুযায়ী নিত্যনতুন আয়াত নাজিল করে থাকে। যা তাদের দুশ্চিন্তাকে কিছুটা হলেও মুক্ত করে। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি শিকার। মোল্লারাও খুশ, মডারেটরাও খুশ।

ছোট্টকালে যেই শিক্ষক ও পিতামাতারা আমাদের সব সময় সত্য বলতে হবে বলে নীতিবাক্য শেখায়; সেই শিক্ষক, পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, প্রেমিক-প্রেমিকা বড় হয়ে আমাদের নতুন করে শেখায় ‘সত্য বলে ঝামেলায় জড়ানোর কোন দরকার নেই।’

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of