কোপা সামসু কোপা

ওয়াজের নামে অনেকে সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, নারী বিদ্বেষ ও কটূক্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন তাদের চিহ্নিত করে একটা তালিকা করা ও অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ সহ ব্যবস্থা নিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপর দায়িত্ব দেবার পরও কার্যত দেখা যাচ্ছে গ্রামে গঞ্জে ধর্ম ব্যবসার জমজমাট আসর থেমে নেই। বিগত দিনে বক্তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য, জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেওয়া, ধর্মের নামে বিভিন্ন উপদল ও শোবিজ তারকাকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে ১৫ জন ওয়াজ বক্তাকে চিহ্নিত করে এ ধরণের বক্তব্য প্রতিরোধে ছয়টি সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এখানে জানার বিষয় হচ্ছে ধর্মকে পুঁজি করে এইসব বক্তারা যখন মানুষকে বিভ্রান্ত করছে তখন দেশের সাধারণ আইনেই তো তাদের প্রতিহত করা যায় এ ক্ষেত্রে যদি অন্য কোন ধর্ম বা সম্প্রদায় ঠিক একই কাজটি করে বসে তবে তা পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব কি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপর বর্তায় কিনা তা ভেবে দেখা উচিত।

ওয়াজের বক্তারা যখন হেলিকপ্টারে চড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠানে যোগদান করেন তখন কি তাদের আয়ের উৎস ও পরিমাণের হিসাব নিকাস যথাযথ ভাবে আয়কর বিভাগে দাখিল করা হয়? ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও ধ্যান আর এই বিশ্বাস কে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের কাছে অধর্মের বাণী দেয়া অত্যন্ত গুরুতর শাস্তি যোগ্য অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত নয় কি?

বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধি-শাখা-২ থেকে তৈরি এক প্রতিবেদনে মাহফিলের ১৫ জন বক্তার নাম উল্লেখ করে জানানো হয়েছিল — “এই বক্তারা সাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম-বিদ্বেষ, নারী-বিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতি-বিরোধী বয়ান দেন বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা রেডিক্যালাইজড হয়ে উগ্রবাদীর দিকে ধাবিত হচ্ছে।” তাই যদি হবে তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের প্রচলিত আইনেই তো এই বক্তাদের আইনের আওতায় আনতে পারে, উক্ত প্রতিবেদনে যে ১৫ জন বক্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল তারা হচ্ছেন – আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসূফ (সালাফি), মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান (মুহতামিম, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, মোহাম্মদপুর), আল্লামা মামুনুল হক (যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), মুফতি ইলিয়াছুর রহমান জিহাদী (প্রিন্সিপাল, বাইতুল রসূল ক্যাডেট মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ক্যান্টনমেন্ট), মুফতি ফয়জুল করিম (জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির, ইসলামী আন্দোলন), মুজাফফর বিন বিন মুহসিন, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন (যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট), মতিউর রহমান মাদানী, মাওলানা আমীর হামজা, মাওলানা সিফাত হাসান, দেওয়ানবাগী পীর, মাওলানা আরিফ বিল্লাহ, হাফেজ মাওলানা ফয়সাল আহমদ হেলাল, মোহাম্মদ রাক্বিব ইবনে সিরাজ। এবার প্রশ্ন হচ্ছে এই সব বক্তাদের কয়জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বা আদৌ আনা সম্ভব কিনা?

এই প্রতিবেদনে ওয়াজে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং নারী সম্পর্কিত বয়ানে কী কী বলা হয় তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে ওয়াজের বক্তাদের করা নানা মন্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। যেসব মন্তব্যকে দেশ-বিরোধী হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ‘মূর্তি ভাঙা ধর্মীয় কাজ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাফের’, ‘অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়’, ‘গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ধর্মনিরেপক্ষতাবাদ মুশরিকদের কাজ’, ‘শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, প্রতিমূর্তিতে ফুল দিয়ে নীরবতা পালন করা শিরক’, ‘গণতন্ত্র ইসলামে নাই, ইহা হারাম’ এবং ‘জাতীয় সংগীত কওমি মাদ্রাসায় চাপিয়ে দেওয়া যাবে না’, ‘আল্লাহর রাস্তার প্রতিষ্ঠায় উত্তম জিহাদ হচ্ছে সশস্ত্র জিহাদ’, ‘আল্লাহ রাসূলকে গালি দিলে কোপাতে হবে’, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে আইন করলে কোপাতে হবে ইত্যাদি। এই সব বক্তারা এখন পর্যন্ত তাদের বয়ান ঠিকই দিয়ে বেড়াচ্ছেন আর এইসব অপরাধীদের ধরতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারিশ মালার প্রয়োজন কোথায় তা আমাদের বোধগম্য নহে।

— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of