ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক

ভারতের চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ভারত উদার চিত্তে সহায়তা করে, স্বল্প সময়ে মাত্র ৯ মাসেই আমরা শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করতে সক্ষম হই শুধু মাত্র ভারতের সহায়তার কারণে, এক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে ভারত বাংলাদেশের প্রতি মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও বর্তমান সময়ে ভারতের আসে পাশের দেশগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফ্রন্টে চীনর প্রতি কিছুটা ঝুঁকে পরেছে। বাংলাদেশের সাথে চীনের সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে, ভারতের চির শত্রু পাকিস্তানের পক্ষে ১৯৬৫ সালে চীন অবস্থান গ্রহণ করে যা আজ পর্যন্ত পাকিস্তান চীন সম্পর্ক একই রকম আছে। শক্তিশালী বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশকারী চীন তাৎপর্যপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, ভারতের এখন একমাত্র উপায় হচ্ছে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, কাজেই বাংলাদেশর স্থানীয় রাজনীতিতে ভারত একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে না পারলে ও বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারলে আঞ্চলিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা হয়না, ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরগুলো ভারতকে ব্যবহার করতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে নয়া দিল্লিতে এক চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যথাক্রমে আব্দুস সামাদ ও গোপাল কৃষ্ণান আর সেই চুক্তি মোতাবেক ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের জন্য স্টান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) চূড়ান্ত করতে ঢাকাকে চাপ দিচ্ছে নয়া দিল্লি কারণ অরুনাচল প্রদেশ, আসাম, মেগালয়, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা রাজ্যগুলোতে ভারত পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে বছরে হাজার কোটি রুপি সাশ্রয় করতে চায় চুক্তি মোতাবেক, বাংলাদেশের জন্যে এখন একটি কথাই প্রযোজ্য “উপায় নাই গোলাম হোসেন”।

সামরিক শক্তিতে ভারত এখন আগের অবস্থানে নেই, ভারত সামরিক শক্তিতে আন্তর্জাতিক মানে অনেক উপরে। ভারতকে টেক্কা দিয়ে তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এখন বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পরেছে বিষয়টি ভারতের পক্ষে মেনে নেয়া খুবই কষ্টের। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই আর আঞ্চলিক রাজনীতির খেলায় কৌশলী খেলোয়াড় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের কিঞ্চিত আক্ষেপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক, তাই হয়তো ভারতের সাথে নাড়ির সম্পর্কটি কেটে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সম্প্রতি চীন থেকে কেনা দুটো সাবমেরিন ও চীনের সাথে সামরিক চুক্তি বিষয়টি ভারত কি দৃষ্টিতে দেখছে সেটা বোঝার জন্যে আইনস্টাইন হবার প্রয়োজন হয়না , বাংলাদেশকে চাপের মুখে রাখতে ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের জাতীয় পরিচয় না থাকলেও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বাংলাদেশে পুশইন করার হুমকি ধামকি দেয়া থেকে থেমে নেই। চীন বাংলাদেশের বিশাল পদ্মা সেতুসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করায় ব্যবসা বাণিজ্যে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিএনপির উপর ভারতের আস্থা কোন কালেই ছিলনা আর থাকার কথাও না কারণ বিএনপি বহু আগেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে বিএনপি ভারত সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটিয়েছে। সব কিছুর পর দেখা যাচ্ছে ভারত অনেকটা দিশে হারা হয়েই বাংলাদেশকে বাগে রাখার বিকল্প পথ খুঁজছে।

ভারতের রাষ্ট্র প্রধানকে আমরা বার বার বলতে শুনি বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, বিভিন্ন ভাষণে মোদী সরকার প্রায়শই এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অন্তত ভারত সফর কালে অভ্যর্থনা জানাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বা কোনও সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন এটাই তো বাংলাদেশের প্রত্যাশা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে কোন সময়ই ভারতকে কথা দিয়ে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন, বাংলাদেশের মাটিতে ভারত বিরোধী কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশ কখনই আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়নি, সম্প্রতি ভারতের অনুরোধে ঢাকা তাদের দেশের ভিতর দিয়ে অসম-ত্রিপুরায় পণ্য পরিবহণের জন্য ‘ফি’ এক ধাক্কায় টন প্রতি ১০৫৪ টাকা থেকে কমিয়ে ১৯২ টাকায় নামিয়ে এনেছে। এক্ষেত্রে বলা যায় যে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের এই বন্ধু সুলভ উদার পররাষ্ট্র নীতির প্রতি ভারত কতটুকু সম্মান জানিয়েছে তা বাংলাদেশের আরও একবার ভেবে দেখা উচিত নয় কি? ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা আগমনে তাঁকে স্বাগত জানাতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও মন্ত্রী, এমনকি শীর্ষ আমলাকেও পাঠানো হয়নি। যা কিনা বাঁধাধরা কূটনৈতিক প্রথা এবং সৌজন্যের বিরোধী। গত অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিমান যখন নয়াদিল্লিতে নামেন ঠিক তখনও একজন প্রথমবার নির্বাচিত সংসদ নারী ও শিশু কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী উপস্থিত থাকলেও ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের কোন নেতা বা সরকারী আমলা উপস্থিত না থাকাটাও কূটনৈতিক প্রথা ও সৌজন্যের বিরোধী বলা যায় কি? এখানে আরও একটি বিষয় আমরা না চাইলেও আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হচ্ছে এনআরসি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হুমকির ফলে বাংলাদেশে ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে অথচ ভারত সরকার এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না।

আমার প্রধানমন্ত্রী ভারতের সব অনুরোধ ও আবদার অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রতিদানে কতটুকু পাচ্ছেন তা আরও একবার ভেবে দেখা উচিত। পরিশেষে একথা অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আগত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দিল্লি থেকে সিনিয়র কোন নেতা বা কোনও আমলাকেও কেন কলকাতায় পাঠানো হয়নি তা প্রশ্ন বিদ্ধ রয়ে গেল।


– মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 43 = 52