বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৬]

আবার উড়তে থাকলাম অনন্ত মহাকাশে আমরা। দূরের কত যে নক্ষত্র পরিবার চোখে পড়লো আমাদের! যেদিকে তাকাই কেবল আলোর মালা। উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম, ওপর নিচ কিছুই নেই এ মহাকাশে। যেদিকে চোখ যায় কেবল চোখে পড়লো লক্ষ কোটি তারার মেলা। এবার এলিফ্যান্ট ট্রাঙ্ক নেবুলা জগতে প্রবেশ করলাম আমরা। ওরে বাবা! এতো দেখছি তারা তৈরির কারখানা যেন। অসংখ্য গ্যাসীয় বিক্রিয়ায় নানা প্রজাতির তারকা তৈরি হচ্ছে এখানে। আমি পৃথিবী থেকে আসা মানুষ প্রজাতির। তারার ভেতরে কেবল আগুন। সুতরাং ঝলসে যাবো ওখানে গেলে। তাই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনে। এবার ৪০০০ আলোকবর্ষ দূরের NGC3532 star cluster এ প্রবেশ করলাম আমরা। ১৫০টি সূর্য তথা তারকার বাস এ পরিবারে। যে তারার কাছেই যাই সেটাতেই ফিসন প্রক্রিয়া চলছে হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের। এ দহন প্রক্রিয়া ভাল লাগলো না আমাদের। সুতরাং এগিয়ে যেতে চাইলাম সামনে নতুন কোন গ্রহের সন্ধানে। মহাকাশীয় সময়ে ঘন্টাখানেক চলার পর 55 ক্যানক্রি E গ্রহের নিকটে পৌছঁলাম আমরা। ওরে বাবা! ৪০০ কিমি দূরের এ গ্রহটি একাকি ঘুরছে তার নিজ অক্ষে। কিন্তু হীরকে পূর্ণ গ্রহটি। সম্ভবত এতো মূল্যবান হওয়ার কারণেই একা চলছে সে তার পথে। দুখ লাগলো গ্রহটির জন্যে। ২৭টির পর ৩০টি শূন্য দিলে যে সংখ্যা হয় সে অর্থমানের আমেরিকান ডলার মূল্যমানের হীরা নিয়ে ঘুরছে একটা গ্রহ, অথচ কোন নারী অদ্যাবধি এলোনা তার কাছে, বললো না এক টুকরো হীরে দেয়ার কথা! হায়!
:
এবার HD189733B গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ছি আমরা। এর একদিকে চির অন্ধকার, অন্য দিকে চির আলোকময়তা। উজ্জ্বল এ পিঠের তাপমাত্রা ৯৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ছাড়াও সারাক্ষণ মারাত্মক ঝড় আর বজ্রপাত হচ্ছে এ গ্রহে। কোন মানুষ সেখানে এক মিনিট দাঁড়ালে হাজারো বুলেটের মত পাথর বিঁধবে তার বুকে পিঠে। ফ্রিয়া বললো – ভীষণ জটিল, চলো পালাই এ গ্রহের আকাশ থেকে। এবার যে পথে যাচ্ছি আমরা সেখানে মহাকাশীয় মারাত্মক CMB ‘কসমিক রে’ আটকে দিয়েছে আমাদের পথ। এটা অতিক্রম করতে চাইলে খপখপ কিংবা আমাদের শরীর কেটে যেতে পারে দুভাগ হয়ে। সুতরাং খপখপকে ঘুরিয়ে দিলাম তার পথ। এবার গ্লেসি 667CC গ্রহে পৌঁছলাম আমরা ৩৭৪ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরের। কিন্তু গ্রহটির কাছাকাছি যেতেই ওর ঋণাত্মক মহাকর্ষ বল ঠেলতে থাকলো আমাদের বাইরের দিকে। যতই খপখপ নামতে চায় এ গ্রহের মাটিতে, ততই সে ভেসে ওঠে ওপরে। একবার প্রচন্ড গতিতে খপখপ নামতে চাইলো গ্রহটিতে। কিন্তু আরে! ওতো বায়বীয় গ্রহ। এরতো কোন মাটি নেই। আমরা এর গ্যাসীয় মন্ডলে প্রবেশ করলাম সহজেই। এবার কে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভেতরের দিকে। প্রবল শক্তিতে খপখপ উঠে আসতে চাইলো ওপরে। কিন্তু ব্যাপারটা সহজসাধ্য নয়। তারপরো খপখপের মারাত্মক শক্তি। সব বাঁধা ত্যাগ করতে পারে সে। প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে এলো খপখপ। একটু ওপর উঠতেই আবার বাইরের দিকে ধাক্কা দিলো গ্রহটির মহাকর্ষ বল। বুঝলাম কিছুক্ষণ পর পর এটা বিপরীত দিকে ধাক্কা দেয় তার বলয়ের মধ্যে যা কিছুই পায়না কেন!
:
এবার ট্রাপিস্ট সোলার সিস্টেমে ঢুকলাম আমরা। ট্রাপিস্ট্ গুচ্ছের তারকামন্ডলীর লাল তারাগুচ্ছের ৮টি গ্রহ পরিবারে ঢুকতে চাইলাম আমরা। ট্রাপিস্ট-১ তারকাপুঞ্জের EFG পাশাপাশি ৩টি গ্রহে যেতে বেগ পেতে হলোনা আমাদের। এগুলো tightly locked গ্রহ। মানে নিজ অক্ষে ঘুরছে না। কিন্তু EGF গ্রহ তিনটি যেহেতু নক্ষত্রের হেবিটেবল জোনে অবস্থিত, তাই পৃথিবীর মতই আবহাওয়া এ তিনটি গ্রহের। মানে না অতি উষ্ণ না অতি শীতল। বরং পৃথিবীর চেয়েও চমৎকার আবহাওয়া দেখলাম ট্রাপিস্ট্-১G গ্রহে। এ গ্রহের জল প্রবাহ, বায়ুমন্ডল, বৃক্ষরাজি, প্রাণির অবাধ বিচরণ দেখে মনে হলো, অপর কোন পৃথিবীতে যেন এসেছি। ইস! এ গ্রহটি যদি পৃথিবীর কাছাকাছি হতো, তবে ভারত বাংলাদেশের প্রায় ৩০-কোটি বাঙালিকে নিয়ে পাড়ি দিতাম এ গ্রহে। ঢাকা কলকাতার গুতোগুতি আর ভাল লাগছে না আমার। ফ্রিয়া বললো – তবে ঈশ্বরকে বলোনা, এ গ্রহটিকে নিয়ে যাক পৃথিবীর কাছে। যেন সাধারণ বিমানের ফ্লাইটে চড়ে কিংবা মই লাগিয়ে মানুষরা চলে যেতে পারে এ গ্রহে। চমৎকার কথা বলেছো ফ্রিয়া তুমি! ফিরে যাওয়ার পর গডকে বলবো – এ গ্রহটিকে যেন নিয়ে যান পৃথিবীর কাছে। এবং স্থাপন করেন পৃথিবীর কাছাকাছি!
:
এ গ্রহ ছেড়ে যেতে মন চাইলো না আমার। কিন্তু যেতে হবে পুরো মহাবিশ্ব দেখতে। উড়ে যেতে ব্লাকহোল ম্যাগিটোরিয়াস দেখতে পেলাম দূরে। ফ্রিয়াকে বললাম – ফ্রিয়া ঘুরে যেতে হবে। না হলে ঐ ব্লাকহোল গিলে খাবে আমাদের। ওর সামনে ঈশ্বর পড়লে সম্ভবত তাকেও গিলে ফেলবে এ ব্লাকহোল। এবার সবচেয়ে বড় সূর্য UY Scuti এর কাছে গেলাম আমরা। এটা পৃথিবী থেকে ৫১০০ আলোক বর্ষ দূরে। মানে ২.৩৭ বিলিয়ন কিলোমিটার। এ তারাটা এতো বড় যে, এটা ৬৫০ ট্রিলিয়ন পৃথিবীর সমান। মানে ৬৫০ ট্রিলিয়ন পৃথিবী অনায়াসে ধরে যাবে UY Scuti নক্ষত্রে। এতো বড় নক্ষত্রের মাঝেও জ্বলতে কেবল হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের ফিসন। এর কোন গ্রহের খোঁজ পেলাম না। আর থাকলেই বা কি হবে? এর তাপে কি ফুটতে থাকবে না ঐ গ্রহ? এর গ্রাভিশনাল পয়েন্টের মহাকর্ষ বল এতো প্রবল যে, সকল গ্রহকেও হয়তো সে টেনে নিয়ে গেছে তার জ্বলন্ত চুল্লীর ভেতরে। এবার UY Scuti ছেড়ে বাইরে যেতে চাইলাম আমরা। কিন্তু চারদিকে মারাত্মক হাইড্রোজেন ডাস্ট। যা আঘাত করছে আমাদের নভখেয়াতে। এখানে মহাকাশ থেকে নির্গত ফোটন কনায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে পুরো মহাকাশীয় বলয়। এ পথ পার হতে পারলে আমরা পৌঁছে যাবো ক্যারিনা নিবুলা গোত্রের “হার্কুলেস ক্যারিনা বরোলেস গ্রেড ওয়াল” গ্যালাক্সিতে। এটা আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি থেকে অন্তত ৪-লাখ গুণ বড়ো। এ গ্যালাক্সিতে আমরা দেখতে পাবো রেড জায়েন্ট স্টার, সাদা জায়েন্ট স্টার আর মৃত নক্ষত্রের ভাসমান শবদেহ।
[পরের অংশ কাল]
 
 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of