বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৭]

“হার্কুলেস ক্যারিনা বরোলেস গ্রেড ওয়াল” গ্যালাক্সিতে মৃত নক্ষত্রের শবদেহ পেলাম আমরা মহাকাশে ভাসমান। সুপারনোভা বিস্ফোরণের কোটি কোটি বছর পর এ নক্ষত্র পরিণত হয়েছে একটা বামন জড়পিণ্ডে। কোন ব্লাকহোলের অভিকর্ষ বলের ভেতরেও যায়নি এ বামন মৃত নক্ষত্র। কালক্রমে সে তার সব জ্বালানি হারিয়ে কঠিন লৌহ আর কার্বনে পরিণত হয়ে একাকি ভেসে বেড়াচ্ছে মহাকাশে। এ মৃত নক্ষত্রের কোন অভিকর্ষ বল নেই এখন। এর গ্রহ আর উপগ্রহগুলো সম্ভবত ছুটে চলেছে অন্য কোন নক্ষত্র বা মহাকর্ষীয় চৌম্বকীয় বলয়ের দিকে। এবার বিশেষ ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’ ব্যবহার করে পৃথিবী থেকে ১০.৭ বিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরের সিঙ্গেল অবজেক্ট TON-618 এর কাছে পৌঁছে গেলাম আমরা। এটা কোন নক্ষত্র পুঞ্জ কিংবা গ্যালাক্সি নয়। আলট্রা মেসিভ কোয়াসার হচ্ছে এই TON-618। এর উজ্জ্লতা ১ হাজার গ্যালাক্সির মধ্যে যত সূর্য আছে তার সম্মিলিত উজ্জ্বলতার সমান। মানে একসাথে ৬০-লাখ কোটি সূর্যের আলোর সমান হচ্ছে এর উজ্জ্বলতা। এটা হট প্লাজমা দ্বারা নির্মিত। কোয়াসারের তীব্র আলোকচ্ছটার পেছনের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় এর অভ্যন্তরে অবস্থিত সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলকে। এর ভেতরের তাপমাত্রা পৌঁছুতে পারে প্রায় কোটি ডিগ্রি পর্যন্ত। এর ধারে কাছে যাকেই পাচ্ছে তাকেই ভেতরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঐ কোয়াসার। সুতরাং দূরে রইলাম আমরা এর থেকে বেশ। কারণ কাছে গেলে ভেতরে টেনে নিয়ে যেতে পারে আমাদের। তখন আবার বের হবো কিভাবে? আর এ জনমানবহীন বিদেশ বিভূঁইয়ে ঈশ্বরকে পাবো কই? শেষে অনন্তকাল আমি আর ফ্রিয়াকে কাল কাটাতে হবে TON-618 কোয়াসারের পেটে। জানিনা খপখপের কি হবে তখন!
:
দৈত্যাকার TON-618 কোয়াসারের পর আর কিছু নজরে এলোনা আমাদের। চারদিকের বাকি সব গ্যালাক্সিপুঞ্জ ও তার নক্ষত্রমালা। এবার পৃথিবীর দিকে ফিরে যেতে পারি আমরা। পথে বাকি গ্যালাক্সি, গ্রহ আর সব অবজেক্টগুলো দেখতে দেখতে যাবো। যাতে মিশন পুরো হয় আমাদের। আমরা আলোর চেয়ে ১০০-গুণ গতিতে চলছি। কারণ আমাদের নভোযান খপখপে ট্যাকিওন লাগানো আছে। যা দ্রুত গতিতে চলে আলোর চেয়ে। সম্ভবত কেবল ইউনিভার্স নয় মাল্টিভার্স পর্যবেক্ষণ করেছি আমরা। কারণ TON-618 এর পর ওদিকে আরতো কিছু চোখে পড়লো না আমাদের দুজনের কারো চোখে। ফিরে যাওয়ার পথে ১৪ বিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরের ভার্গো সুপারক্লাস্টারে ঢু মারলাম আমরা। এ সুপারক্লাস্টারে তারকার সংখ্যা ন্যুনতম ২৫০,০০০ ট্রিলিয়ন। এখানে ক্যাপরিকোনাস সুপারক্লাস্টার, হরোলোজিয়াম সুপারক্লাস্টার, কলম্বা সুপারক্লাস্টার, পার্সিয়াস সুপারক্লাস্টার, সেক্সট্যান্স সুপারক্লাস্টার, উরসা মেজর সুপারক্লাস্টার, কোমা সুপারক্লাস্টার, প্যাভো ইন্ডুস সুপারক্লাস্টার, হার্কিউলেস সুপারক্লাস্টার, বুটেস সুপারক্লাস্টারের তারকামন্ডলী দেখে দেখে পৃথিবীর পথে উড়তে থাকলাম আমরা। আর হাত নাড়তে থাকলাম এসব সুপারক্লাস্টারের সেসব অদেখা প্রাণিদের উদ্দেশ্য , যারা বসবাস করছে এদের হেরিটাবল জোনের সুপার প্লানেটে।
:
এবার পৃথিবী থেকে ১-বিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরের সুপারক্লাস্টারের পাশ দিয়ে যাচ্ছি আমরা। লিও সুপারক্লাস্টারের পর দেখা মিললো সেন্টোউরাস, বুটাস, করোনা বুয়ালিয়াসিস, পিসকাস সেন্টাস, হরোলোজিয়াম আর সাপলে সুপারক্লাস্টারের। নানান রং আর উজ্জ্বলতা মেপে আবার দুজনে বিদায়ী হাত নাড়তে থাকলাম অদেখা সেই বিকশিত প্রাণিদের উদ্দেশ্যে, যারা বসবাস করছে এসব সুপারক্লাস্টারের নক্ষত্রমন্ডলীর সেফ জোনের সুপার প্লানেটে। এবার ১০০ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরের নক্ষত্রমালার কাছে পৌঁছলাম আমরা। এ সুপারক্লাস্টারে পর্যায়ক্রমে দেখা মিললো যথাক্রমে এরিডানুস সুপারক্লাস্টার, ফরনাক্স সুপারক্লাস্টার, ডোরাডো সুপারক্লাস্টার, এনজিসি সুপারক্লাস্টার, ভির্গো-৩ সুপারক্লাস্টার এবং লিও-২ সুপারক্লাস্টার। এ সুপার ক্লাস্টারে অবস্থান করছে অন্তত ২০০ ট্রিলিয়ন সক্রিয় তারকা। এখানেও বিদায় জানালাম আমাদের সেই মহাকাশ বন্ধুদের, আর মনে মনে আমন্ত্রণ জানলাম ১০০ মিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরের আমাদের পৃথিবীতে যেতে।
:
এবার পৃথিবী থেকে ৫ মিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরের গ্যালাক্সির দিকে এগিয়ে চললাম আমি আর ফ্রিয়া। প্রথমেই চোখে নজরে এলো এন্টিয়া ডর্ফ নামের গ্যালাক্সি। পর্যায়ক্রমে আমরা প্রবেশ করতে থাকলাম সেক্সটান এ ও বি, টুকানা ডর্ফ, ফোনিক্স ডর্ফ, একুয়ারিস ডর্ফ, পেগাসাস ডর্ফ, ক্যানেস ডর্ফ আর ট্রিএনগুলাম, এন্ডোমিডা এবং আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে। আমাদের গ্যালাক্সি জগতে প্রবেশ করে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগলো আমার। যেমন কলকাতা থেকে ট্রেনে ঢাকা আসতে টঙ্গী পৌঁছে যেমন খুশি লাগে আমাদের অনেকটা সেরকম। এ গ্যালাক্সিগুলোতে অন্তত ৭০০ বিলিয়ন নক্ষত্রের বসবাস। যার চারদিকে ঘুরছে অন্তত ৭০০,০০ বিলিয়ন গ্রহ আর উপগ্রহ। এবার ৫,০০,০০০ আলোক বর্ষ দূরের গ্যালাক্সিপুঞ্জের মাঝে চলে এলাম আমরা। এর কেন্দ্রে যদিও আমাদের আকাশ গঙ্গা। কিন্তু এর চারদিকে ছড়িয়ে আছে সেগুলটারিগ ডার্ফ গ্যালাক্সি, বুটেস ডার্ফ গ্যালাক্সি, ড্রাকো ডার্ফ গ্যালাক্সি, লার্জ ও স্মল ম্যাগেলানিক ক্লাউড গ্যালাক্সি এবং সেক্সটান ডার্ফ গ্যালাক্সি। এ গ্যালাক্সিতে মোট নক্ষত্র সংখ্যা ন্যুনতম ২২৫ বিলিয়ন। আমরা হাত নেড়ে টা-টা বাই-বাই বলে বিদায় জানালাম এ নক্ষতমন্ডলীর বাসিন্দাদের থেকে!
[এর পরের অংশ আগামিকাল]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of