বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৮]

অনন্ত চলার পথে আমরা এগিয়ে এলাম আমাদের পৃথিবীর অন্তত ৫০,০০০ আলোক বর্ষ দূরত্বে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির গ্যালাবুয়ার ক্লাস্টার, নরমা আর্ম, স্কাটা ক্রাক্স আর্ম, স্যাগিটুরাস আর্ম, অরিয়ন আর্ম, পার্সুয়াস আর্ম, গিসনাস আর্ম, ক্লোবালুর ক্লাস্টার নক্ষত্রপুঞ্জ এবং আমাদের সৌর মন্ডলীর কাছাকাছি। এ অঞ্চলে উজ্জ্বল সক্রিয় তারার সংখ্যা অন্তত ২০০-বিলিয়ন। যার গ্রহরাজি থাকতে পারে অন্তত ২০,০০০ বিলিয়ন। আর সুপার প্লানেট থাকতে পারে অন্তত ৪০০-বিলিয়ন। যাতে বসবাস করছে হয়তো পৃথিবীর মানুষের চেয়ে উন্নত প্রজাতির কোন বিকাশমান প্রাণি। এবার ৫,০০০ আলোক বর্ষ দূরের তারকামন্ডলীতে পৌঁছে যাই আমরা। ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা আমাদের কাঙখিত পৃথিবীর দিকে। অরিয়ন নক্ষত্রমন্ডলীর পর আমরা পৌঁছে যাই ল্যাগুন নেবুলা জগতে। এর গ্যালাক্টিক সেন্টারে অবস্থানকারী তারকার সংখ্যা অন্তত ৬০০-মিলিয়ন। এবার এ নক্ষত্রমন্ডল ত্যাগ করে আমরা এগুতে থাকি আরো পৃথিবীর দিকে। তারকা দেখতে আর গুণতে গুণতে ক্লান্ত হয়ে যায় ফ্রিয়া। ক্লান্ত চোখে বলে – পৃথিবী আর কত দূর! মনে হচ্ছে নক্ষত্র গুণে গুণে পাগল হয়ে যাব। একটু আদর করে ফ্রিয়াকে বলি – আর বেশি নয় ফ্রিয়া মনি! খুব কম পথই বাকি আছে পৃথিবীতে পৌঁছতে।
:
এবার ২৫০ আলোক বর্ষ দূরত্বের মাঝে চলে আসি আমরা। মহাকাশীয় একঘেমেয়ি দূর করার জন্যে এক ঘন বরফে ঢাকা মেঘরাজ্যে প্রবেশ করি খপখপ ঘুরিয়ে। ফ্রিয়াকে ভরহীন মেঘের মাঝে নামিয়ে দিয়ে বলি – একটু সাঁতার কাটো ফ্রিয়া! ভাল লাগবে। এবার মন ভাল হয় ওর। কিশোরী বালিকার মত ঘন কুয়াশার মেঘে হারিয়ে যায় ফ্রিয়া। তাকে তুলে নেই সাবধানে, যাতে সে হারিয়ে না যায় অসীম মহাকাশে। আমি চোখ ঘুরিয়ে যাই বাকি নক্ষত্র এবং এর সুপার প্লানেটগুলোর দিকে। এবার হায়াডুস ক্লাস্টার নক্ষত্রপুঞ্জে প্রবেশ করি আমরা। এরপর ক্যাপিলা ভেগা, এলডেবেরান, আর্কটুরুস আর উর্সা মেজর ক্লাস্টার নক্ষত্রপুঞ্জ ছেড়ে আমরা এগিয়ে যাই আরো পৃথিবীর কাছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির দিকে এগুতে থাকি আমরা ক্রমশ। বিরতিহীনভাবে খপখপ চলতে থাকে তার নিজস্ব গতিতে। ফ্রিয়া একটু ঘুমালেও আমার চোখে ঘুম আসেনা। লুহম্যান-১৬ সৌর পরিবারে এমন এক গ্রহের দেখা মেললো যা বেশ বিস্ময়কর। এ গ্রহের নাম TP16Rs। কোন সাদা বেলুনের মধ্যে জল ভরে ছেড়ে দিলে যেমন দেখায় এমন সব বেলুনাকৃতির থলথলে এক প্রকার প্রাণি ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো গ্রহময়। যার কোনটার রং সাদা আবার কোনটার ধূসর। একটা একটার সাথে আরেকটা গড়িয়ে চলছে। সি লায়নরা যেমন গাদাগাদি করে থাকে আমাদের সমুদ্র সৈকতে। একটিও ধরা গেলনা তাদের পিচ্ছিলতা আর থলথলে দেহের কারণে। মনে হচ্ছে জেলির মধ্যে ভাসছে তারা।
:
লালান্ডা-২১১৮৫ সৌর পরিবারে এমনই আরেক বিস্ময়কর গ্রহ পেলাম আমরা। যা লালান্ডা-YU1 নামে পরিচিত। এ গ্রহের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরে গেল আমাদের। জন্মানো বৃক্ষ কোন কোনটি ৫/৬ কিলোমিটার লম্বা। এ গ্রহের সম্ভবত কোন মহাকর্ষ বল নেই। কোন কিছু মাটিতে পড়েনা। তাই ভরহীন আমরা ওখানে তুলার মত হাঁটলাম কিছুক্ষণ। গ্রহটির বুকে কোন কিছুকে টেনে না রাখার কারণে সম্ভবত সব কিছু ওর আকাশের দিকে বড় হয়। এমনকি লতা গুম্ম জাতীয় উদ্ভিদ একদম দাঁড়িয়ে আছে তালগাছের মত। কোন গাছের ফলই ঝুলছে না। সব ওপরের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। কোন প্রাণের সম্ভবত সৃষ্টি হইনি এখানে। তাহলে নিশ্চয়ই তা নজরে আসতো। তবে এখানের বৃক্ষদের আচরণ অনেকটা প্রাণির মত। নড়াচড়া করতে পারে তারা। এমনকি আমরা যে বৃক্ষকে স্পর্শ করেছি কিংবা তার নিচ দিয়ে গিয়েছি তারা স্পন্দিত হয়েছে আমাদের উপস্থিতিতে। এক রকমের শব্দ করে সম্ভবত অভিবাদন জানিয়েছে আমাদের। কিন্তু ঐ গ্রহের বৃক্ষপ্রাণিদের ভাষা বুঝতে পারিনি আমরা দুজনের কেউ!
:
লাইটেন-৭২৬-৮ সৌর পরিবার ঘুরে আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করার পরিকল্পনা আমাদের। সেখানে অপেক্ষা করছে আমাদের সাধের পৃথিবী। তাই খপখপকে নির্দেশ দিলাম লাইটেনের দিকে যেতে। কিন্তু খপখপ কই চলছে কোন অজানা পথে। ক্লান্তিহীনভাবে দ্রুততর গতিতে উড়ে যাওয়া দেখে বললাল – কি হচ্ছে খপখপ? কই যাচ্ছো তুমি? এটা কি লাইটেনের পথ? সেটাতো ফেলে এসেছো পেছনে! খপখপ কেমন খসখসে গলায় বললো – বুঝতে পারছি না আমি। মারাত্মক কোন মহাকর্ষ চৌম্বকীয় বল কই যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। এখন আমি চলছি না, কেউ আমাকে চালাচ্ছে! আলোর একশগুণ গতিতে অন্তত ৮-ঘন্টা একটানা চলার পর বুঝতে পারলাম আমরা KIC 9832 নামের কনট্রাক বাইনারী স্টারের মহাকর্ষ বলে ঢুকেছি। এ তারামন্ডলীর OOrt Cloud এরিয়ায় গ্লিজ 58IC সুপার আর্থ প্লানেট আমাদের সামনে। যেখানে মূলত সুন্দরী পরীরা বাস করে। যাদের সাথে কথা দিয়েছিলাম ওদের ওখানে আরেকবার যাবো আমরা এবং থেকে যাবো ওখানে। যদিও আমরা জানতাম – সে প্রতিশ্রুতি ছিল মিথ্যে। কিন্তু মহাকাশে কোন মিথ্যে কি চলেনা? ঐ কথা দেয়ার কারণে কি আমাদের চলে আসতে হয়েছে এখানে আবার!
:
খপখপ গিয়ে থামলো একদম সেই আগের স্থানে। যেখানে যাওয়ার পথে প্রথম নেমেছিলাম আমরা। আমাদের দেখে সকল পরীরা আবার তাদের বেহালার মত সুরে সঙ্গীত গাইলো। আমাদের গায়ে ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে মারলো। সমবেত সুরে নাচলো। শেষে আবার অভিবাদন করে নামালো আমাদের। কিন্তু প্রিয়া ও আমি দুজনেই ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ এখানেতো আমরা আসতে চাইনি। আমরা বরং মিথ্যে বলে পালিয়ে গিয়েছিলাম একদম পৃথিবীর কাছে। আর মাত্র ৪ আলোকবর্ষ দূরে ছিল আমাদের পৃথিবী। ইস! অল্পের জন্য পালাতে ব্যর্থ হলাম। ভাগ্যটা খারাপ বলতে হয়! পরীরা সমস্বরে বললো – তোমরা কি ভুলে গিয়েছিলে আমাদের কথা? না হলে আমাদের গ্রহ ফেলে তোমরা অনেক দূর চলে গিয়েছিলে কেন? তোমাদেরতো TON-618 কোয়াসার দেখার পর থেকেই এখানে ফিরে আসার কথা! ঘাবড়ে গিয়ে বললাম – তোমরা কিভাবে জানো আমরা TON-618 কোয়াসার দেখার পর আবার ফিরে আসবো এখানে?
– কেন তোমরা বলে যাওনি? সব দেখা শেষ করে আমাদের এখানে ফিরে আসবে ও থেকে যাবে? যা Space Controller কে জানিয়েছি আমরা। সুতরাং আমাদের এ গ্লিজ 58IC গ্রহের অধিবাসী হিসেবে তোমাদেরও যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি তুমি রক্ত মাংসের মানুষ হলেও এ গ্রহে যাতে নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারো তার ব্যবস্থাও করেছে মহাকাশ নিয়ন্ত্রক। এমনকি তোমার মাধ্যমে আমরা পরীরা এখানে বংশ বিস্তার করতে পারবো, তাও জানিয়েছেন সে আমাদেরকে। তাই এ গ্রহের সকল পরীরা খুব খুশি। কারণ অনেকদিন থেকে একজন পুরুষ খুঁজছিলাম আমরা, যার মাধ্যমে আমাদের বংশ বিস্তার হবে এবং সংখ্যায় বাড়বো আমরা!
[এর পরের অংশ আগামিকাল] শেষ পর্ব কাল

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of