বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৯] শেষ পর্ব

বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৯] শেষ পর্ব
:
সব শুনে খুব মন খারাপ করলো পরী ফ্রিয়া। যদিও এটা পরীদেরই আবাসস্থল। কিন্তু মাকে কথা দিয়েছে এসেছে সে, ফিরে আসবে আবার। আমিও পৃথিবীকে খুব ভালবাসি। বিশেষ করে বাঙালির মাঝে বসবাস করতে চাই আমি। পৃথিবী থেকে কোটি কোটি ট্রিলিয়ন কিমি দূরের গ্লিজ 58IC গ্রহের পরীদের সাথে প্রজনন ক্রিয়া আর তাদের বংশ বিস্তারের মেশিন হতে চাইনা আমি। সুতরাং দুজনেই খুব ঘাবড়ে গেলাম। মন খারাপ হলো খুব। অপর দিকে আমাদের ফিরে আসার ‘সুসংবাদে’ পরীরা পুরো গ্রহে আয়োজন করে চমকপ্রদ সব আনন্দানুষ্ঠানের। নাচ গান ছাড়াও পুরো গ্রহ আলোকিত করলো তারা বিশেষ আলোকমালায়। নিজেদের শরীর থেকে জোনাকির মত নানাবর্ণের আলোর বিচ্ছুরণ ঘটলো পুরো গ্রহে। বৃক্ষ এবং সকল ফুল ফল থেকে এক যোগে সুগন্ধ ও আলোর বর্ণচ্ছটা ছড়িয়ে পড়তে থাকলো পুরো গ্রহময়। এমনকি ভূমিগুলো স্বয়ংক্রিয় আলোতে ভাসালো তাদের পুরো গ্রহকে। ফল আর ফুলেরা একটু পর পর তাদের রং আর আলোকচ্ছটা পরিবর্তন করতে থাকলো সেকেন্ডে সেকেন্ডে। ফ্রিয়া আর আমাকে হাওয়ায় তুলে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করতে থাকলো তারা সবাই। আমরা দুজনে দূরুদূরে বুকে অসহায়ভাবে তাদের এ কাজ পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম।
:
রূপসী পরীদের সবার ভেতরে কে এখানে বয়োজেষ্ঠ বা কার আদেশ মানে সবাই একবাক্যে, তার সাথে একান্তে কথা বলতে চাইলাম আমরা। নির্পা-২৭ পরীকে দেখালো সবাই। কিন্তু আমরা পার্থক্য বুঝতে পারলাম না নির্পা ও অন্য পরীদের সাথে। একটা ঘন আঙুর লতার মত বনে তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে প্রথমে কথা বললো ফ্রিয়া পরীদের ভাষাতে। ফ্রিয়ার তার মায়ের সাথে ফিরে যাওয়ার কথা দেয়া এবং আমার মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া কত জরুরী তা নানাভাবে ফ্রিয়া আর আমি বোঝালাম নির্পাকে। সে অত্যন্ত সহজভাবে বললো – যদি তোমরা নাইবা থাকবে, তবে আমাদের সাথে থাকার কথা বললে কেন?
আমি দুহাত তুলে মিনতি করে বললাম – সেটা মিথ্যে বলেছি নির্পা! সো সরি আমি!
নির্পা বিস্মিত হয়ে হেসে বললো – মিথ্যা আবার কি?
আমি বোঝাতে ব্যর্থ হলাম নির্পাকে যে – পৃথিবীর মানুষ সারাদিন তার কথা আর আচরণে সত্যের চেয়ে মিথ্যে বেশি বলে। তাই মিথ্যেতে অভ্যস্থ আমরা পৃথিবীর মানুষ।
এবার ফ্রিয়া আরেকটা মিথ্যে পরী নির্পাকে। সে বললো – পৃথিবীর মানুষরা অহরহ মিথ্যে বলে কিন্তু আমরা পরীরা বলিনা। তাই এ মানুষকে যদি তোমরা আটকে রাখো, তবে সারাদিন মিথ্যে কথা বলে তোমাদের সবাইকে মিথ্যেতে অভ্যস্থ করবে সে, তাতে তোমাদের পরী জগত তথা গ্লিজ 58IC গ্রহের খুব ক্ষতি হবে। এমনকি তার বংশধারা থেকে তোমাদের কোন সন্তান হলে, ঐ সন্তানরাও সারাদিন মিথ্যে বলবে।
বিস্ময়ে চোখ বড় করে নির্পা বললো – তাই নাকি? বলো কি? এতো মারাত্মক ব্যাপার!
এবার ফ্রিয়া আরো যোগ করলো – কেবল তাই নয়। মানুষ পৃথিবীতে মিথ্যে ছাড়াও সারাদিনরাত চুরি-ডাকাতি, মারামারি-খুনোখুনি, ধর্ষণ-হাইজ্যাক করে বেড়ায়। মানুষকে ঠিক করার জন্য পৃথিবীতে আছে অনেক পুলিশ স্টেশন ও জেলখানা। নানাবিধ শাস্তির ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু তারপরো ঠিক হচ্ছেনা মানুষ প্রজাতি। এমনকি পৃথিবীর মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০/৭০ বছরেই মারা যায়। পরীদের মত মানুষরা অমর নন!
:
ফ্রিয়ার এসব কথা শুনে মুখ কালো করে উঠে গেলো নির্পা-২৭ নামের বয়োজেষ্ঠ্য পরী। হাঁটতে হাঁটতে সে বলো গেলো – Space Controller কে সে জানাবে বিস্তারিত। যেহেতু এ গ্রহ ও এখানের পরীদের সাথে আমাদের দুজনকে সেট করা হয়েছে, তাই ইচ্ছে করলেও তারা ফিরে যেতে দিতে পারেনা আমাদের। এমনকি তার নিয়ন্ত্রণেই আমাদের মহাকাশযান খুব দ্রুত ফিরে এসেছে এখানে, পৃথিবীর খুব কাছাকাছি যাওয়ার পরও। সুতরাং ব্যাপারটা এখন পুরোপুরি তার এখতিয়ারভুক্ত! খুব দ্রুত বিষয়টি Space Controller-কে জানালো নির্পা-২৭সহ অন্য পরীরা। কিন্তু নির্পাকে হেসে হেসে Space Controller বললো – পৃথিবীর মানুষ, তাদের আচরণ, মরণশীলতা ইত্যাদি সবই জানা আছে তার। তবে যে মানুষটি এখানে এসেছে, যার নাম বল্টু, সে তুলনামূলকভাবে ভাল মানুষ, মিথ্যে বলেনা। চুরি ডাকাতি করেনা। জিনগতভাবে একজন “ভাল” শ্রেণিভুক্ত মানুষ। সুতরাং এ গ্রহে তার মত একজন মানুষ থেকে গেলে মন্দ নয়, বরং ভালই হবে সার্বিক বিচারে। তা ছাড়া পৃথিবীর মানুষ পারমাণবিক বোমাসহ যেসব অস্র তৈরি করেছে, তাতে তারা খুব শীঘ্রই নিজেরা যুদ্ধ করে শেষ হয়ে যেতে পারে, তাই মানুষের জিনকে রক্ষা করতে এ পরীদের মাঝে বল্টুর থাকাই উত্তম হবে!
:
এবার পরী নির্পা আবার কথা বললো আমাদের সাথে। এবং ওদের সিদ্ধান্ত মতো আমাদের থাকা চূড়ান্ত হলো গ্লিজ 58IC গ্রহে। ওদের সিদ্ধান্ত শুনে খুব কাঁদলো ফ্রিয়া। ফ্রিয়ার কান্না দেখে পরীরা বললো – তোমার যদি ভাল না লাগে, তবে তুমি একাকি চলে যাও। ওকে রেখে দেবো আমরা। একজন পুরুষ মানুষ দরকার আমাদের খুব! পরীদের এসব কথা ভাল লাগলো না আমার কিংবা ফ্রিয়ার। আমরা গভীর চিন্তায় পড়লাম এবার কি করবো আমরা। একটা চালাকি বুদ্ধি এলো মাথায়! বললাম – প্রিয় পরীরা। আমি আমার মত পাল্টেছি। এখানেই থেকে যাবো আমি। কিন্তু একটা সর্ত। প্রত্যেকদিন অন্তত একবার আমাকে ও ফ্রিয়াকে ঘুরতে যেতে দিতে হবে পাশের গ্রহ গ্লিজ 58IB, A বা D-তে। তারা সবাই সানন্দে তাদের পাখা আর মাথা নাড়িয়ে বললো – আমাদের কোনই আপত্তি নেই তাতে!
:
গ্লিজ 58IC গ্রহে সন্ধ্যা হতেই পরীরা ফুল বাগানের নিচে বিশ্রামে গেলো। খপখপ পেটপুরে খেলো ওখানের লালবর্ণের আঙুরের রস। রাত কিছুটা গভীর হলে আমি আর ফ্রিয়া উঠে বসলাম তাতে। আঙুরের অমৃত রস খাওয়া খপখপ এবার উড়াল দিলো গ্লিজ 58IB গ্রহের দিকে। যেখানে অশরীরি এক প্রজাতির প্রাণি বসবাস করে, যারা মূলত তাদের গ্রহে অন্য কোন প্রাণির যাতায়াতে ঘোর বিরোধী। খপখপ নামতেই নানাবিধ ভয়ঙ্কর শব্দ করে তারা ঘরে ধরলো আমাদের। আমরা এখনই চলে না গেলে আমাদের জড় পদার্থে পরিণত করে মহাকাশে ছেড়ে দেবে তারা এমন ভয়ও দেখালো। সাহস করে আমি বললাম – পৃথিবী থেকে ভুল করে এ গ্রহে চলে এসেছি আমরা। এখন আমরা পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু অভিকর্ষীয় মারাত্মক বলের কারণে পৃথিবীর দিকে যেতে পারছি না আমরা। তোমরা যদি পৃথিবীতে ফিরে যেতে আমাদের হেল্প করো তবো আমরা ফিরে যাবে পৃথিবীতে। না হলে চিরদিনের জন্য থেকে যাবো এখানে।
:
আমাদের কথা শুনে নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করলো গ্লিজ 58IB গ্রহের অশরীরিরি প্রাণিরা, যাদের নাম হেইলাত-২৯। তাদের সব কথা শুনলাম আমরা স্পষ্ট কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। বেশ কিছুক্ষণ সময়ের পর তারা বললো – আমাদের ওপর কোন মহাকর্ষীয় বল প্রয়োগ করা যায়না। আমরা সর্বত্র চলতে পারি বিনা বাঁধায়। তোমাদের চারদিকে ঘিরে পুরো পৃথিবীর পথ তোমাদের এগিয়ে দিতে পারি আমরা। তাতে কি চলবে?
সানন্দে রাজি হলাম আমি আর ফ্রিয়া। ওদের প্রায় এক ট্রিলিয়ন ঘিরে ধরলো আমাদের উট খপখপকে। হেইলাত-২৯ অদৃশ্য প্রাণিরা দশদিকে এক বর্ম তৈরি করলো আমাদের রক্ষার্থে। এবার খপখপ তার সর্বোচ্চ গতিতে উড়াল দিলো পৃথিবীর দিকে। হেইলাত-২৯ বেষ্টিত আমরা এবার খুব কাছাকাছি হলাম গ্লিজ 58IC এর। সকল পরীরা সম্ভবত এখন ঘুমুচ্ছে। ওদের কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা কিংবা শুনতে পাচ্ছিনা ওদের ভায়োলিন সঙ্গীত। হেইলাত-২৯ দের নানাবিধ কথোপকথন কানে আসছে আমাদের। কিন্তু সকল উল্কাপিন্ড, মহাকাশ ঝড়, রেডিয়েশন সব আটকে দিচ্ছে আমাদের রক্ষক হেইলাত-২৯ বাহিনি। খপখপ উড়ে চলছে ক্লান্তিহীনভাবে। মিল্কিওয়ের ভেতরে প্রবেশ করেছি আমরা। ক্ষীণতর দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে সূর্যকে। সূর্যকে পাশ কাটিয়ে আমরা বুধের কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছি। বুধ থেকে ছুটে আসা আগুনের বুলেট বৃষ্টি আটকে দিলো হেইলাত-২৯ রা। এবার পৃথিবীতে নামবো আমরা। মাথা নতো করে হেইলাত-২৯ বাহিনিকে বললাম – চিরজীবি হও তোমরা। ধন্যবাদ তোমাদেরকে। আমন্ত্রণ জানালাম ওদের পৃথিবীতে নামতে। বিনয়ের সাথে বললাম – মহাকাশের অন্যতম গ্রহ পৃথিবী দেখে যাও। দেখে যাও, এর মানুষ, বৃক্ষলতা আর তাদের আচরণ। কিন্তু হেইলাতরা নামলো না। এক্সোমণ্ডল তথা পৃথিবীর আকাশে ঢুকতেই একসাথে সমবেত ধ্বনি দিয়ে বাঁক ঘুরলো ওরা। ওদের ভাষায় একটা বিদায়ী সম্ভাষণ করে কই হারিয়ে গেল দেখলাম না আমরা আর। এবার খুব দ্রুত মেসোমণ্ডল, স্ট্রাটোমণ্ডল আর ট্রপোমণ্ডল পার হয়ে পৃথিবীর আকাশে ভাসছি আমরা। আহ! আমাদের পৃথিবী। আমাদের বঙ্গোপসাগর দেখা যাচ্ছে। এ সাগর তীরেই আমার ছোট্ট দেশ বাংলাদেশ! সেখানে একটু পরই নামবো আমরা!
[৯ পর্বে মহাকাশ যাত্রা শেষ হলো]
 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of