বৃটেন, রেবেকা ও কৃষাণ কিসসা (পর্ব-১)

আজ বাবার সাথে আবার মন কষাকষি হলো আমার। কিছু টাকা চেয়েছিলাম তার কাছে কিন্তু তিনি এক পয়সাও দেবেন না আমাকে! মেজাজ গরম করে বললেন – আমাকে না দিয়ে টাকা জলে ফেলে দেবেন তিনি কিন্তু আমার মত অকম্মা গাধার পেছনে আর পাই পয়সাও খরচ করতে রাজি নন তিনি। অন্যদিনের মত আজও রেগেমেগে তিনি সবাইকে শুনিয়ে বললেন – আমার পেছনে অন্তত সত্তর লাখ টাকা খরচ করছেন তিনি দেশে বিদেশে পড়াতে! কিন্তু আমি এমন গাধামি করবো, তা জানলে সত্তর পয়সাও খরচ করতেন না তিনি! বরং গ্রামে তার জমিতে চাষবাস করার জন্য চাষাভুসা বানাতেন আমায়, যেমন বছরভিত্তিক তার জমিতে কাজ করছে ৩-কামলা! আমি রাগ না করে হেসে বলি – চাষাইতো হতে চাইছি বাবা আমি! কিন্তু তুমিতো হতে দিচ্ছো না! আরো এক ডিগ্রি রেগে বাবা বললো – যদি তাই হবি, তবে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়লি কেন? পিএইচডি করতে লন্ডন গেলি কেন? কেন খরচ করলি আমার নগদ সত্তর লাখ টাকা? যা দিয়ে চরে অন্তত দশ একর জমি কিনতে পারতাম আমি! আবার সহজভাবে হেসে বলি – বাবা! জমিতো কম নেই তোমার! আর কত জমি লাগবে? বাবা এবার একটু স্বর নামিয়ে বললো – তোর জন্য লন্ডন টাকা পাঠাতে শহরের পাঁচ কাঠার প্লটটি মাত্র ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে আমাকে। যা থাকলে এখন দাম হতো দুই কোটি টাকা! আর কথা বলিনা বাবার সাথে। কথায় আরো কথা বাড়বে। তারচেয়ে নদীর তীরে চলে যাই জলের কাছে। যেখানে জেলেরা এ দুপুরে তাদের নৌকো ঘাটে লাগিয়ে ইলিশ জাল মেরামত কাম বিশ্রাম করছে!

:

বাবা মায়ের অনেক আশা ছিল আমাকে নিয়ে। বাবা চাইতেন বিদেশে লেখাপড়া করে অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা সেটেল হই আমি। বাবা যেন বুক উঁচু করে গ্রামের মানুষদের কাছে বলতে পারে – তার ছোট ছেলে ‘সিডনি’ বা ‘ওয়াশিংটন’ থাকে। প্রতিবছর আমাকে যেন রিসিভ করতে যেতে পারে ঢাকা এয়ারপোর্টে। কিন্তু তার কিছুই হয়নি আমাকে দিয়ে। বাবার কথামত ঠিকই বৃটেন গেলাম আমি পিএইচডি ডিগ্রি আনতে। বৃটেনের লিডস ইউনিভার্সিটিতে এমফিল আর ডক্টরাল কোর্স শেষ করতে করতে দুবছরের স্থলে চার বছর লাগলো। ভাল ফলাফলের আশায় কোন পার্টটাইম জব বা উপরি ইনকামের কোন পথেও গেলাম না আমি। খরচের পুরো টাকাটাই নিলাম বাবা থেকে। সাথে জুটে গেলো গুলশানের মেয়ে রেবেকা। সেও পড়ে লিডস ভার্সিটিতে! তবে আমার মত ল্যাংগুয়েস্টিকে নয়, তার সাবজেক্ট মাইক্রোবায়োলজি। রেবেকার বাবা ঢাকার কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব যেন। সরকারের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাই কিভাবে যেন লন্ডনে এক ফ্ল্যাট কিনেছে তারা। নিজেদের ফ্ল্যাটে থেকে লিডস ভার্সিটিতে পড়ে ঢাকার মেয়ে অনিন্দসুন্দরী রেবেকা পাটোয়ারী। আমি ঢাকা থেকে যাওয়ার পরের সেমিস্টারেই রেবেকা ভর্তি হয় ওখানে। লিডসে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট খুব বেশি নয়। তাই রেবেকার সাথে সপ্তাহ খানেকের মাঝেই পরিচয় হয় ক্যান্টিনে। পরিচয়ের পরদিন থেকেই কাকতালীয়ভাবে দুজনে একসাথে লাঞ্চে উপস্থিত হই প্রায় একই সময়ে। এবং এভাবে আমি একদিন লাঞ্চ করাই রেবেকাকে আর রেবেকা অন্যদিন করায় আমাকে অল্টারনেটিভ!

:

ভার্সিটি ক্যান্টিনে নিয়মিত লাঞ্চ করতে করতে কখন দুজনে মনের কাছাকাছি চলে আসি বুঝতে পারিনা আমরা। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ছুটির দিনগুলোতে রেবেকা আর আমি চষে বেড়াতে থাকি বৃটেনের এমাথা ওমাথা। ওর টাকা পয়সার অভাব ছিলনা। ফ্ল্যাটভাড়ার টাকাতে ওর খরচ চলে যায় নির্বিঘ্নে। আর আমিও বাবার থেকে নিয়মিত নিতে থাকি লাখ লাখ টাকা। আর কদিন মাত্র হিসেব করে বাবা তার শহরের একমাত্র জমিটি বিক্রি করে টাকা পাঠাতে থাকেন আমায় নিয়মিত। এবং চার বছর রেবেকার সাথে এক আনন্দঘন সময় পার করে শেষ করি আমার থিসিস। রেবেকার ৫-বছরের মাস্টার্স শেষ করতে তখনো আরো বছর খানেক বাকি। আমি দেশে ফেরার উদ্যোগ নিতে রেবেকা বাঁধা দেয় আমায়। তার সাথে বৃটেনে তার ফ্ল্যাটেই থেকে যেতে বলে আমাকে। যেন দুজনে সেটেল হতে পারি ওখানের বরফ জমা মাটিতে। কিন্তু আমি শুনিনা রেবেকার কথা। মা চাইছিল পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরে বড় কোন জব করি আমি শহরে। যাতে মা আমাকে দেখতে পারেন নিয়মিত। কিন্তু বাবা চাইতেন রেবেকার মত। বৃটেন না হলেও, অন্য কোন ‘এ’ গ্রেডের দেশে যেন চলে যাই আমি “ইমিগ্রান্ট” হয়ে। প্রয়োজনে বাবা আরো টাকা দেবেন এ ব্যাপারে। কিন্তু কারো কথা না শুনে, একদিন বোচকা-বেডিং গুছিয়ে হিথরো থেকে আমিরাত এয়ারে উঠে বসলাম ঢাকা ফিরতে। যথারীতি বাবা ঢাকা এয়ারপোর্টে এলেন আমাকে রিসিভ করতে। দুবাই থেকে আগত ফ্ল্যাইটে লেবার কিছিমের অনেক যাত্রীর চাঁদরে বাঁধা গাট্টি টাইপের লাগেজ দেখে বাবা নাট সিঁটকিয়ে বলেন, বিমানটাকেই নষ্ট করলো এ যাত্রীরা। এদের জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করা উঁচিত!

:

বাবার ভাড়া করা মাইক্রোতে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি চলে গেলাম বরিশাল গ্রামের বাড়ি যেতে। যেখানে অপেক্ষা করছে মা আমার জন্যে। বরিশাল থেকে বিশেষ লঞ্চে গ্রামে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যে হলো আমাদের। মোবাইলে সংবাদ পেয়ে মা ঘাটে এসে জড়িয়ে ধরলো অনেকদিন পর দেখা তার ছোট নাড়িছেঁড়া ধন ছোটছেলেকে। আমি সকাল-বিকেল গ্রামে, নদীর তীরে, গাঁয়ের বাজারে ঘুরছি আর মায়ের হাতের নানাবিধ খাবার খাচ্ছি দেখে বাবা একদিন বললেন

– তো বাবা এখন কি প্লান? কোন দেশে সেটেল হবে? লাইনঘাট কিছু কইরা আইছো?

– না বাবা করি নাই কিচছু! আমি যামুনা কোন দেশে। এখানেই থাকুম!

– এখানেই থাকবা মানে?

– মানে এ গ্রামেই থাইকা যেতে চাই আমি! নিজের গাঁ!

রাগে বাবা দিন চারেক কথা বললোনা আমার সাথে। মা একদিন বললেন –

– বাবা তোকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা! তোর বাবা চায় তুই বিদেশে ভাল কোন দেশের নাগরকি হ! আমরা যেন বেড়াইতে যাইতে পারি! মাঝে মাঝে আইবি তুই বেড়াইতে!

– তোমার ইচ্ছেডা কি মা?

– তুই ঢাকা থাইকা ভাল একটা চাকুরী করলেই আমি খুশি হই রে বাবা!

– কিন্তু মা! আমি বিদেশেও যামুনা! ঢাকাও যামুনা! এ গ্রামেই থাইকা যাইতে চাই তোমার আঁচল তলে। কথা শুনে মুখ টিপে হেসে মা বললো

– তবে তোর বাবার এত্তো ট্যাকা খরচ করলি কেন?

– বাবার এতো ট্যাকা! খরচ করমু নাতো কি করুম? আমি খরচ না করলে ট্যাকা উলিতে খাইবো মা!

– তাইলে রেবেকার কি হইবে? তোর সাথে সে কি এই গ্রামে থাকবো? আমাদের ঘর, পুকুরে গোসল, মাটির চুলায় রান্না কি পছন্দ হইবে তার?

– না মা তার পছন্দ না এই গাউয়া গ্রাম। হ্যারে নেটে ছবি দেখাইছি। তাই আসবো না সে। তার সাথে সম্পর্ক শেষ কইরা আইছি মা!

:

শুনে মা আকাশ থেকে পড়ে। চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তা এনে বলে – তাইলে কি তোরে বিয়ে করবো না সে?

– না মা করবো না! এটা কি সম্ভব? যার বাবা সচিব! যে মেয়ের বাড়ি আছে লন্ডনে! সে এসে থাকবে এই চরাঞ্চলে? যেখানে রাতে ঘুটঘুইটা অন্ধকার। কোন কারেন্টের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই এই চরে ! নেট নাই ডিস নাই পেপার নাই!

– ভাল কথা বাবা! তয় আমার চাচাতো বোনের মাইয়া পারুলকে আনি তোর লাইগা? পারুলকে খুব পছন্দ আমার। পরীর মত চেহারা তার! মনে মনে আমারে শাশুড়ি বানাইতে চায় সে! আমি ওখানে গেলেই আমার চুলে ঠান্ডা তেল দেয় ঢাইলা!

হেসে মাকে বলি – কি যে কও মা! তুমিতো জানো রেবেকার সাথে আমার ৪-বছরের সম্পর্ক! এখন বিয়ে করুম পারুল লারে?

– কিন্তু তুইতো কইলি রেবেকা কোনদিন আইবো না এই চরে!

– না আই্লে থা্উক। বিয়ের দরকার নেই মা। আপাতত আমারে গ্রামের আলোবাতাসে আর তোমার আঁচলতলে থাকবার দেও। বলে আবার হেসে মায়ের আঁচল টেনে মাথায় দেই আমি! তা দেখে খুশীতে মা জড়িয়ে ধরেন আমায়! মা আসলে চায় – আমি তার আঁচলেই থাকি!

(শেষ পর্ব আগামিকাল)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of