বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ৬

আগের পর্ব যেখানে শেষ করেছিলাম, বলেছিলাম যে, তিতুমীরের উদ্ভব এবং তার জনগােষ্ঠীকে ইসলামায়িত করতে গিয়ে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব প্রচার করাতে স্থানীয় জমিদাররা আর এক ঔরঙ্গজেবের উদ্ভবের আশংকায় ভীত হয়ে উঠেছিল। লর্ড কর্ণওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণে জমিদার, তালুকদারেরা তখন গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট শক্তিশালী। এখনকার রাজনৈতিক মদতপুষ্ট মাস্তানদের তুলনায় কিছু কম না ! সেই গ্রাম্য মাস্তানেরা দেখলো তাদের মিষ্টি জলের পুকুরে কোত্থেকে যেন বেনাে জল ঢুকছে। এখনকার এক রঙের রাজনীতি অধ্যুষিত অঞ্চলে অন্যরঙের রাজনীতি অনুপ্রবেশ করলে যা হয়। তারা তখন এই নব্য বিভেদপন্থী তিতু ও তার চ্যালা-চামুন্ডাদের শায়েস্তা করার সুযােগ খুঁজতে লাগলাে। এদিকে সাবেকী মুসলমানরা, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লােককান্ত সংস্কারগুলিকে ছাড়তে পারেনি, তারাও স্বভাবতই বিরক্ত ছিল তিতুর ওপর। অপরদিকে, হাজী তিতুমীরের সুন্দর চেহারা ও বক্তৃতায় মােহিত হয়ে আশপাশের এলাকার বেশ কিছু মানুষ তিতুর দলে নাম লেখাতে লাগলো। এছাড়া ওই অঞ্চলে বেরিলবীর কাছে বায়াত নেওয়া বহু মুসলমান ছিল। ফলে দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে লাগলাে তিতুর শক্তি। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দের শেষের দিকে সাঈদ আহমদ বেরিলবীর পেশােয়ার বিজয়ের সংবাদ বাংলায় এসে পৌঁছয়। ১৮৩১ খৃষ্টাব্দে মাঝামাঝি নাগাদ মৌলভীরা নিজেদের তরিকা’ প্রচারের জন্য অত্যুৎসাহী হয়ে উঠলো। মৌলভীরা উৎসাহের চোটে সাবেকী মানসিকতার মুসলমানদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক ও ছােটখাটো মারামারির মধ্যে জড়িয়ে পরতে লাগলো। এই ধরনের প্রথম সংঘর্ষ ঘটে তারাগনিয়াতে। ওই গ্রামের ষোলোটি সাবেকী মুসলমান পরিবারের লােকজন মহরমের দিন স্থানীয় দরগাতে ‘নজর’ দিচ্ছিলো। মৌলভীদের একজন, তাদের অনুষ্ঠানে বাধা দেয়, দরগায় লাথি মারে। কুড়গাছি আর নাগরপুরের মৌলভীরাও একই কান্ড করে। ফলে সাবেকী সম্প্রীতিবাদী মুসলমানরা এ ব্যাপারে নালিশ করে জমিদারদের কাছে। জমিদারেরা স্বভাবতই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন মৌলভীদের বিরুদ্ধে। তাদের নজর পরে মৌলভীদের বিচিত্র ছাঁটের দাড়ির দিকে। ওই ধরনের দাড়ি ‘বিদেশী’—সেই গ্রামীন পরিবেশে নিতান্তই বেমানান।

জমিদারেরা আদেশ দিলো যে, পিতৃদত্ত নাম কেউ পাল্টাতে পারবে না, দাড়ি রাখতে পারবে না ইত্যাদি। সবচেয়ে অদ্ভুত কাজ করলো পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়। সে মৌলভীদের বিরােধিতা করতে গিয়ে প্রতিজনের দাড়িতে আড়াই টাকা করে কর বসালো। ওই সময়ে দাড়ি রাখার রেওয়াজ ছিল না সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে। মৌলভীরাই শুধুমাত্র দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেছিল। ব্যাপারটা প্রচন্ড আঘাত হানলাে তিতুর মত মুসলমানদের শরিয়ৎ বিশ্বাসে। দাড়ি রাখা ও গোঁফ ছাঁটা স্বয়ং হজরত মহম্মদের আদেশ। নবী বলেছিলেন, “বহু দেবতাবাদীদের বিরুদ্ধে কাজ করাে, গোঁফ ছােট করে ছাঁটো এবং দাড়ি রাখো”। সহী মুসলিমের ওই হাদিশের ইংরেজী অনুবাদক ডঃ ইসমাইল হামিদ সিদ্দিকী যুক্তি দেখিয়েছেন ইসলাম যেহেতু নতুন ভ্রাতৃসংঘের সৃষ্টি করেছে, সেই ভ্রাতৃসংঘের সদস্যদের সনাক্তকরণের জন্য গোঁফ ছাঁটতে ও দাড়ি রাখতে বলা হয়েছে। যাতে তাদের সহজেই অমুসলমানদের থেকে আলাদা করা যায়। তিতু এক কদম আগে এগিয়ে কাছা দিয়ে ধুতি পরারও বিরােধিতা করলো যাতে, একদৃষ্টিতে মােমিনদের আলাদা করে চেনা যায় মুশরিক অমুসলিমদের থেকে। সুতরাং জমিদারদের দাড়ির ওপর ন্যস্ত কর তিতুকে ব্যাপক খেঁপিয়ে তুললাে। সাজন গাজির গানে আছে: ‘ফি দাড়ি জরিপানা আড়াই টাকা হয়। সেইজন্য সরাঅওলা বড় খাপা হয়’। তিতু কর আদায়েই, বাধা দিতে বললেন অনুগামীদের। বললেন, দাড়ি রাখা তাদের শরিয়তের ব্যাপার। হিন্দু জমিদারদের তাদের দ্বীনের ওপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। | সুতরাং শুরু হলাে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। সরকারী নথিপত্র ও অন্যান্য সমসাময়িক প্রামাণ্য সূত্র থেকে ঘটনার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা অনেকটা এরকম :
সংঘর্ষের সূত্রপাত ১৮৩১ খৃষ্টাব্দে জুন মাসের শেষে। পুঁড়া গ্রামের দায়েম ও কায়েম কারিগর নামে দুই জোলাকে ডেকে দাড়ি-কর চাইলো জমিদার কৃষ্ণদেব রায়। জমিদারের ভয়ে তারা সঙ্গে সঙ্গে এক টাকা করে দিয়ে দিল এবং বাকী দেড় টাকা পরে জমা দিল জমিদার কাছারীতে। সাফল্যে উৎফুল্ল হয়ে কৃষ্ণদেব রায় সরফরাজপুরে তার দাড়িকর সংগ্রহের অভিযান চালালো । সংঘর্ষের সূত্রপাত সেখান থেকেই। সরফরাজপুরে বলাই জোলার বাড়ীতে জনা তিরিশ মৌলভী সমবেত হয়েছে। একসঙ্গে এতজন মৌলভীকে পেয়ে জরিমানা আদায়ের জন্য বলাই জোলার বাড়ীতে পেয়াদা পাঠালো কৃষ্ণদেব রায়। মৌলভীরা পেয়াদাদের যথেচ্ছা পিটিয়ে ফেরত পাঠালাে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে শ তিনেক লাঠিয়াল নিয়ে সরফরাজপুরে তেড়ে এলো জমিদার কৃষ্ণদেব রায় ও তার কর্মচারী হরিনারায়ণ বসু। লুটপাট মারামারি কিছু হলাে। জমিদারদের আদেশে হীর-উল্লা আগুণ নিয়ে এলো; বেহার গাজী আর জান মহম্মদ মসজিদের খড়ের চালে ধরিয়ে দিল। তারিখটা ২রা আষাঢ় ১২৩৭ বঙ্গাব্দ। এই ঘটনার পর গা ঢাকা দিলো কৃষ্ণদেব রায় ও হরিনারায়ণ বসু। দায়েম কারিগর ও অন্যান্যদের অভিযােগের ভিত্তিতে সমস্ত ঘটনার তদন্ত করতে এলেন বসিরহাট থানার দারােগা রামরাম চক্রবর্তী। বারাসতের ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে পাঠানাে প্রতিবেদনে লিখলেন, তিতুর অনুগামীরাই জমিদারদের অসুবিধায় ফেলার জন্য নিজেদের মসজিদে আগুন দিয়েছে।

মৌলভীরা স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হলেন এ হেন প্রতিবেদনে। ১২ই আগষ্ট, দায়েম কারিগর ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ সাক্ষীর জন্য আবেদন করা হলাে বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে। বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেট আলেকজান্ডারও সন্দিহান হলেন রামরামের প্রতিবেদনের সত্যতা সম্বন্ধে। তার ফলে, কয়েকজন নিরপেক্ষ সাক্ষীকে তলব করা হলাে। সাক্ষীরা ছিল দানিশ গায়েন, সুন্দর বণিক, প্রাণ গাজী, লােচন ঘােষ ও সুনেস সর্দার। ১৯শে আগষ্ট থেকে শুরু হলাে সাক্ষ্য নেওয়া। সাক্ষ্য থেকে যদিও বােঝা গেল মসজিদে আগুণ লাগানাে স্বয়ং জমিদারেরই কাজ, তবুও জমিদাররা হাল ছাড়ার পাত্র নয় ! সুতরাং, ঝামেলা বিবাদ এড়ানাের সহজপথ হিসাবে দুই পক্ষকে শান্তি বজায় রাখার জন্য পঞ্চাশ টাকার একটি বন্ড জমা করতে বললেন বিচারক আলেকজান্ডার। স্বভাবতই এ বিচারে খুশী হলো না মৌলভীরা। ওদিকে মামলার রায় বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশােধ পরায়ণ জমিদারেরা সপ্তম আইন প্রয়ােগ করে খাজনা অনাদায়ের অজুহাতে বন্দি করলাে দুজন মৌলভীকে। মৌলভীরা গােটা ব্যাপারটার বিহিত করার জন্য কলকাতার বড় আদালতে আপীল করার সিদ্ধান্ত নিলো। কাদির বক্স রায়ের অনুলিপির জন্য আবেদন জানালো এবং তা পাওয়ার পর গােলাম মাসুম ও অন্যান্যরা কলকাতায় গেলো গ্রামের মােক্তার মহম্মদ মাসুদের সঙ্গে। ওই সময় দুর্গাপূজার জন্য আদালত বন্ধ ছিল এবং ডিভিশনাল কমিশনার জেলা পরিদর্শনে বাখরগঞ্জ গিয়েছিলেন। ফলে মৌলভীরা ব্যর্থ মনােরথ হয়ে গ্রামে ফিরলো সেপ্টেম্বরের শেষে।

(ক্রমশঃ প্রকাশ্য)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of