বৃটেন, রেবেকা ও কৃষাণ কিসসা (পর্ব-২) শেষ পর্ব

বাবা আমার সাথে কথা বলেননা অনেকদিন হলো। কোন বিশেষ দরকার হলে মায়ের মাধ্যমে বলেন। ঘরে তেমন কোন কাজও করিনা। প্রথমত বাড়ির পাশের প্রাইমারি স্কুলটিতে সকাল দশটার দিকে একটা ভাষাভিত্তিক ক্লাস নেই। যে স্কুলের হেডটিচার আবার আমার মায়ের পেটের আপন বোন। আর মাঝে মাঝে আমার পুরনো হাইস্কুলে দুয়েকটি সাহিত্য বা ভাষার ক্লাস নেই সখ করে, যে স্কুলে পড়তাম আমি কৈশোরে। হাতে যে কটা টাকা পয়সা ছিল, তা খরচ করে দুস্কুলেই সকল স্টুডেন্টকে দৃষ্টিনন্দন ব্যাচ বানিয়ে দিয়েছি। আর নানাবিধ ছবি কিনে, আর্ট করিয়ে বৃটেনের স্কুলগুলোর মত ক্লাসরুমগুলোকে সাজিয়ে দিয়েছি। এখন মনেই হয়না এ স্কুল দুটো চরাঞ্চলের কোন গ্রামের স্কুল। এরপর একবেলা বিলে বিলে হাঁটি। জমিতে চাষরত কৃষাণদের নানাভাবে পরামর্শ দেই, যাতে ভাল ফসল চাষ করে তারা তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে পারে। যেমন আমাদের গাঁয়ের লোকেরা যে জমিতে কুমড়ো বা খেসারী ডালের চাষ করে খুব কম আয় করতো, ঐ জমিতে ‘স্ট্রবেরী’ চাষ করে অনেক বেশি টাকা আয় করতে পারে তারা। প্রথম বছর স্ট্রবেরী চেনেনা বলে দু হাজার টাকার ফল কিনে ফ্রি খাওয়ালাম তাদের। পরর বছর অন্তত কুড়ি হাজার টাকার চারা বা লতা কিনে ফ্রি বিতরণ করলাম তাদের মাঝে। নেট্ থেকে ইউটিউবে চাষ করার পদ্ধতি দেখে উঁচু বেলে মাটিতে চাষ করলো তারা। দুশ টাকা কেজিতে ফল বিক্রি করতে পেরে পরের বছর গাঁয়ের অনেক কৃষক শুরু করলো বিদেশী ফল স্ট্রবেরীর চাষ!
:
মাঝে মাঝে ওদের পক্ষে ওকালতি করতে থানা সদরের কৃষি অফিস বা সরকারি ব্যাংকে যাই লোন পাশ করাতে। এসব কাজে আসা-যাওয়াসহ নানাবিধ খরচ হয় আমার পকেট থেকে। কৃষকদের থেকে একপয়সাও নেইনা আমি, বরং আমার টাকাতে হোটেলে ভাত খায় তারা কখনোবা। আমার এসব কাজকে বাবা ও গ্রামের অনেক মানুষ ‘পাগলামি’ বলে। আমার অপুস্থিতিতে তারা বলে – ‘বেশী পড়ালেখা করে মাথায় গন্ডগোল হয়েছে আমার’! পাগলা গারদে পাঠানো দরকার এখন! আর আমাকে ভালবাসে যারা মনপ্রাণ উজাড় করে, তারাও বলে – স্যার! গ্রামে আমাগো লগেই যদি থাকপেন, প্রাইমারি স্কুলেই যদি মাস্টরি করবেন, তয় লন্ডন গেলেন কির লাইগা? কথা শুনে হেসে বলি – পড়ালেখা করতে। তারা অবাক হয়ে বলে – গ্রামে এইসব কাম করতে কি অত পড়ালেখা করা লাগে? তাদের বোঝাতে পারিনা আমি যে, আসলে পড়ালেখা কি জিনিস ও তার দৌঁড় কতদূর! ওদের সরলতায় বরং হেসে মরি আমি! একদিন বাজারে জেলে-কৃষকদের এক আড্ডায় বলি – তোমাদের মত এ গাঁয়ের আলো বাতাস আর মাটিতে বড় হইছি আমি। পুরো কৈশোর কাটাইলাম এ নদীর জলে সাঁতার কাইট্টা! তাইলে এ গ্রামের ঋণ শোধ করতে অইবো না আমারে! ঋণ শোধ করতে থাইকা গেলাম এ গ্রামে রে ভাই! কথা শুনে অশ্রুসজল চোখে অনেক কৃষক আর জেলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।
:
আমাদের গাঁয়ের মূল বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নতুন জেগে ওঠা বালির চরে এখনো চাষবাস শুরু করেনি মানুষ। ওখানে কেবল ঘাস আর হোলগাপাতার চারা গজিয়েছে, যা চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করে গাঁয়ের মানুষজন। এ জমি আমাদের গ্রামেরই লোকজনের। সাত-আট বছর আগে নদীতে ভেঙে এখন আবার জেগেছে নতুন চর হিসেবে। তাই মালিকানাও আমাদের গ্রামের মানুষেরই,যাদের সবাইকে কমবেশি চিনি আমি। একদিন সকল জমি মালিকদের নিয়ে গেলাম জেগে ওঠা ঐ নতুন চরে। সব দেখে শুনে তাদের প্রস্তাব দিলাম – পুরো জমিতে আধুনিক হাইব্রিড তরমুজ লাগাবো আমরা। উন্নত বিদেশী বীজ শহর থেকে আনবো আমি। সার কিংবা আর যা যা লাগে তারও সব খরচ দেব আমি। এখন জমি মালিকরা প্রতি শতক জমি ৪০০ টাকা হিসেবে এক সিজনের জন্য ‘লিজ’ দিতে পারে আমাকে কিংবা তরমুজ চাষে অংশ নিলে লাভের অর্ধেক পাবে তারা। সকল কিষাণ ‘লিজ’ দেয়ার পরিবর্তে আমার সাথে ৫০% ভাগাভাগিতে তরমুজের চাষ করতে রাজি হয়। ওদের সাথে এভাবে একটা মৌখিক চুক্তি করি আমি!
:
পুরো জমিতে বেলে পলিযুক্ত ঝুড়ঝুড়ে দোআশ মাটি। সকল জমি চাষের বদলে কেবল ছোট ছোট গর্ত করতে বললাম কৃষকদেরকে যার যার জমিতে। প্রণোদনা হিসেবে একটু পর পর চা-মুড়ি কিংবা চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করলাম ওদের জন্য কর্মস্থলে। নির্দেশনামত জমি গর্ত করার পরের দিন প্রতিটা গর্তে এক ঝুড়ি গোবর সার দিলো সবাই। যা গ্রামে গোয়ালঘরে এমনতিই পাওয়া যায়। আমি বই ঘেটে তাতে কিছু রাসায়নিক সার দিয়ে দিলাম। সপ্তাহখানেক পর হলুদ, কালো আর সবুজ এ তিন রংয়ের তরমুজ বীজ দিলাম কৃষকদের হাতে। তারা প্রতিটি সার দেয়া গর্তে তিনটে করে বীজ পুতে দিলো। কদিনেই মাথা তুললো চারা। আমার কিনে দেয়া সার কীটনাশক নিয়মিত জমিতে ছিটিয়ে একদিন প্রচুর ফুল আসলো নতুন তরমুজ খেতে। দেখতে দেখতে ছোট নরম তরমুজ ‘গোটা’ বড় তরমুজে রূপান্তরিত হলো। হলুদ, কালো আর সবুজ রঙের তরমুজে ভরে উঠলো মাঠ। নদীর তীর ঘেষে ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে থাকতে লাগলো চলমান লঞ্চের যাত্রীরা। কেউ কেউ লঞ্চ বা বোট থামিয়ে কিনে নিতে চাইলো দুচারটে তরমুজ শখ বসত। বিশাল চরের চার কোনায় চারটি অস্থায়ী টংঘর তুলে দিলাম কৃষকদের জন্যে। তারা পালা করে তাতে দিনে ও রাতে পাহারা দিতে থাকলো নিয়মিত।
:
এর মধ্যে একদিন পরিপক্ক হলো তরমুজ। মাকে একদিন নিয়ে এলাম ক্ষেত দেখাতে। মা শর্ত জুড়ে দিলো সাথে তার পছন্দের পারুল থাকবে। তাই হলো। আমি মায়ের আঁচলতলে ঢুকে ছাগলছানার মত লাফিয়ে লাফিয়ে পুরো ক্ষেত হেঁটে হেঁটে দেখালাম তাকে আর পারুলকে। পারুলের জন্য আমার খুব মায়া লাগে কিন্তু খুনঁসুটিতে না আবার রেবেকার স্থান দখল করে নেয় সে, তাই টানকে অবদমিত করে দূরে থাকি মোহময়ী পারুল থেকে! কৃষাণরা লাল টকটকে তরমুজ কেটে খাওয়ায় অতিথি দুজনকে। মা আশীর্বাদ করলেন আমাদের সবাইকে, যেন বিশ্বসেরা তরমুজ ফলাতে পারি আমরা! কিন্তু বাবাকে বারবার অনুরোধ করেও আনতে পারলাম না এখানে একবার। যদিও বাবা আজন্ম কৃষক। কিন্তু তার বিলাত পড়ুয়া ছেলের কৃষিকাজ একদম পছন্দ নয় তার। ছোটছেলের এমন ‘পাগলামি’তে হাঁটে-বাজারে মুখ দেখাতে পারেন না নাকি বাবা! বেপারীরা এলো তরমুজ কিনতে একদিন। ভাল দাম পেতে বেশ কজন বেপারীর সাথে যোগাযোগ করলাম আমি। যারা ট্রলার ভরে সরাসরি তরমুজ চালান করে ঢাকায়।
:
মুমিনুদ্দি বেপারীর সাথে পাকা হলো কথা! ছোট আর মাঝারি যা এখনো পরিপক্ক হয়নি সেগুলো বাদ দিয়ে, কেবল বড় সাইজগুলো কেটে নেবে সে, যাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে ‘প্রথম পাতনা’। পুরো চরের জমিতে দেবে ৪-লাখ টাকা। কিন্তু আমরা ৫-লাখের কমে রাজি হলাম না। শেষে সাড়ে চার লাখে ফাইনাল হলো পুরো চর। আগামী শুক্রবার থেকে তরমুজ কাটা শুরু করবে সে। প্রতি শতকে দুটো করে তরমুজ রেখে যাবে কৃষাণদের “খোরাকি” হিসেবে। আর মাঝারি ও ছোটগুলো এক দেড় মাস পর আবার বিক্রি করতে পারবো আমরা ‘২য় পাতনা’ হিসেবে। নির্দিষ্ট শুক্রবারে তরমুজ কেটে জড়ো করতে লাগলো মুমিনদ্দির লোকজন। আমরা ঘাসের বিছানায় বসে বসে তাদের তরমুজ কাটা দেখছি। আকস্মিক ম্যাসেঞ্জারে কল এলো রেবেকার। ঢাকাতে এসেছে সে। আমার অবস্থান জানতে চায়। চরের তরমুজ ক্ষেতে কৃষাণদের সাথে বসা আমার ছবি তুলে পাঠালাম রেবেকাকে তাৎক্ষণিক। বললাম – পুরোদস্তুর কৃষক আমি। তরমুজ বিক্রি করছি বেপারীদের কাছে। আমার অবস্থান জানতে চাইলো রেবেকা। গুগল ম্যাপের ‘স্কিনসট’ পাঠিয়ে তাকে বললাম এ চরে আছি আমি এখন। তাতে অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংসও বলে দিলাম তাকে। যেন ‘হাবল’ টেলিস্কোপে চোখ রাখলে স্পষ্ট দেখতে পাবে আমায়!
:
মুমিনুদ্দি বেপারীর লোকজন তরমুজ বোঝাই করেছে তার ট্রলারে। ক্ষেত তদারিকতে দুপুর নাগাদ বলতে গেলে ভুখা আমরা সবাই। তাই সব কৃষক জড় হলো ক্ষেতের এক পাশে। এবার তরমুজ দিয়ে হবে আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজ। কৃষাণরা দশ বারোটি তরমুজ ভাগ করে কেটে রাখলো আমাদের সামনে। সবাই এলে শুরু করবো আমরা। তরমুজ কাটা দেখতে মাকে আনিয়েছি লোক পাঠিয়ে। সে আর পারুলও যোগ দিয়েছেন আমাদের এ ফসল কাটা উৎসবে। পারুলকে মা মোবাইল করে এনেছে। আকস্মিক আকাশে চকচকে নীল হেলিপ্টার চোখে পড়ে আমাদের। মনে করেছিলাম কোথাও হয়তো চলে যাবে হাতিয়া সন্দ্বীপ কিংবা মনপুরা। কিন্তু হেলিকপ্টার উড়ে এলো একদম আমাদের ক্ষেতের ওপরে। একটু নিচ দিয়ে কটা চক্কর দিয়ে যেখানে মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন হয়েছে আমাদের, ঠিক সেখানেই নামলো কপ্টারটি। বাতাসে উল্টে যেতে থাকলো তরমুজ ক্ষেতের লতা আর ছোট তরমুজ নাতি পুতিরা। আমার কিনে দেয়া প্রিয় সানগ্লাসটি পরে রেবেকা নামলো হেলিকপ্টার থেকে। আমি বিস্ময়াভূত হয়ে তাকিয়ে রইলাম রেবেকার দিকে। সে কাছাকাছি এসে বললো – আমাকে ছাড়াই চরের লাঞ্চ সারবে একাকি? ইউকের ক্যান্টিনের কথা ভুলে গেলে? আমাকে সাথে নেবেনা? মা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো নীল গেঞ্জি আর নীল ট্রাউজার পরা আধুনিক মেয়ে রেবেকার দিকে। কাছাকাছি এলে বললো – তুমি কি রেবেকা? রেবেকা হেসে বললো – হ্যা মা, আমিই সেই হতভাগি! যাকে ছেড়ে এসেছে আপনার ছেলে। সে তো আর লন্ডন যাবেনা। তাই আমিই চলে এলাম আপনাদের তরমুজ ক্ষেতে। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম লাস্যময়ী রেবেকার দিকে। ঢাকা থেকে আগত কপ্টার উড়াল দিল ঢাকার দিকে। রেবেকা বসে পড়লো কাটা তরমুজের পাশে আমাদের ঘাসের বিছানায়! যেখানে আয়োজন করা হয়েছে আমাদের দুপুরের ভোজ। দখিনা বাতাসে চুল উড়ে যাচ্ছে রেবেকার! পারুল অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রয়েছে রেবেকার দিকে!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of