হতাশার ২২ বছর ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের অনিহা

গুনে গুনে 22টি বছর অতিক্রান্ত, কিন্তু এখনো এই 22টি বছরে জুম্ম জনগনের কাছে “পার্বত্য চুক্তি”র সুফল প্রাপ্তির হিসাবে জমা পরে আছে কোটি কোটি ওজনের হতাশা। উল্লেখ্য দীর্ঘ 2 যুগের অধিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের সাফল্যে 1997 সালের 2 ডিসেম্বর তৎসময়ের ক্ষমতাসীন দল “আওয়ামীলীগ” সরকারের সাথে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি”র মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি”। “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে” মোট 72টি ধারা/উপধারা রাখা হয়েছিলো। চুক্তিতে যেসব ধারা/উপধারা রাখা হয়েছিলো সেসবের মধ্যেই রোপিত ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের একমাত্র প্রত্যয়। যেখান থেকে জন্ম হয়েছিলো স্বাধীন জীবনধারায় নিজেদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার দীপ্ত স্বপ্ন। কিন্তু 1997 থেকে 2019, এই 22টি বছরেও “পার্বত্য চুক্তি”র মৌলিক ধারাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করেনি চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামীলীগ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী(!) শেখ হাসিনা। যে চুক্তির জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো পুরষ্কার প্রাপ্তি হয়েছিলেন আজকে সেই চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে তিনি নিজেই অনিহা দেখাচ্ছেন, বিমূখতা দেখাচ্ছেন, বিরোধীতা করছেন।

22টি বছরেও জুম্ম জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেননি আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 22টি বছর অতিক্রান্ত হয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জু্ম্ম জনগণের এখনো হতাশার দিন গোনা শেষ হয়নি। আর কতদিন কোটি কোটি ওজনের হতাশাকে কাঁধে করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে নিপীড়িত জুম্ম জনগণ???

আপনি কিসের জননেত্রী(?) আপনার দেশেরই জনগণের দুঃখ কষ্ট আপনি বোঝেন না, বুঝতে পারেন না, বোঝার চেষ্টাও করেন না তাহলে আপনি জননেত্রী হলেন কিভাবে!!! প্রকৃতপক্ষে আপনি জননেত্রী হলে হয়তো আপনার দেশের জনগণের দুঃখ কষ্টের অনুভূতির বাইরে আপনার থাকার কথা নয়। আপনার দেশের জনগণ কিভাবে আছে(?) কেমন করে আছে(?) সেসব অনুভূতি আপনার অনুভূতির ভীতরেই থাকার কথা, আপনি যদি সত্যিকার অর্থে জননেত্রী হতেন। জননেত্রী শব্দটাই আপনার প্রাপ্য নয়, যোগ্য নয়। আপনি এবং আপনার মানসিকতা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের চাহিদা ব্যাপক নয়। তারা কেবল স্বাতন্ত্র্য অস্তিত্বে স্বাধীন জীবন প্রণালী গতিধারায় বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকারটুকু চাই, যার একমাত্র নেপথ্যে আছে “পার্বত্য চুক্তি”। পার্বত্য চুক্তি’র পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা মানে এটা নয় যে পুরো দেশটাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ গিলে খাবে। কি হয় জুম্মদের নূন্যতম অধিকার দিয়ে ভাগ্যর পরিবর্তন করালে। এতে কি আপনার জাত যাবে(?) নাকি মান যাবে(?) জাতও যাবেনা, মানও যাবেনা বরং আপনার মানবতা প্রদর্শনের জায়গাটা বিশ্বের কাছে অক্ষুন্ন থাকবে, সম্মানের সর্বোচ্চ মর্যাদা রক্ষা পাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জুম্মদের 22টি বছরের কোটি ওজনের হতাশার ভার একটু আপনার কাঁদে নিয়ে দেখেন তারপর ঐ কোটি ওজনের হতাশার অনুভূতিটুকু মেহেরবানি করে বলিয়েন। “পার্বত্য চুক্তি”কে কেবল একটা সাধারণ চুক্তি মনে করলে ভূল হবে আপনার। এটা মোটেও সাধারণ চুক্তি নয়। তার কারণ এই “পার্বত্য চুক্তি”র উপরেই নির্ভর করছে লক্ষ জুম্ম জনগণের বাঁচা-মরার স্বপ্ন।

পাহাড় কিভাবে আছে(?) কেমন আছে(?) দেখুন। 22টি বছরের হতাশা ও পাহাড়ে প্রভাবিত সামরিকায়নের আতংকে আজকে জুম্ম জনগনের জীবন প্রণালী কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে বহিরাগত সেটেলার বাঙালীদের কাছে জুম্ম নারীরা কতটা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে!!!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দামাল ছেলে সেনাবাহিনীদের হাতে দেশোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে অস্ত্র সততার সাথে আপনি অর্পন করেছেন আপনার সেসব জাতীয় অস্ত্র দিয়েই নিজ হাতে দেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করছে আপনার দামাল ছেলেরা। এবং আপনার ঐ জাতীয় অস্ত্র দিয়েই খুব ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরীহ জুম্মদের। আপনার দামাল ছেলে সেনাবাহিনীদের যোগসাজশে সেটেলার বাঙালীরা পাহাড়ের সহজ সরল জুম্মদের উপর ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে, গণহত্যা চালাচ্ছে, জুম্মদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ছাঁইয়ের স্তুপে পরিণত করে দিচ্ছে। এভাবে আর কতদিন নির্যাতন নিপীড়নের গোলকবৃত্তে বন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হবে জুম্মদের??? আপনি কেমন মানবতার মা!!

জুম্ম জনগণের একমাত্র প্রাণের দাবি “পার্বত্য চুক্তি”র যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আপনার চরম অনিহা ও পরিপন্থীতা থাকায় আজ পাহাড়ে ভ্রাতৃত্ব সংঘাত ব্যাপকহারে প্রভাব ফেলেছে। দিনে দিনে সহস্র লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে পিচ্ছিল হচ্ছে পাহাড়ি পথ। এটা আপনার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয় সেটা আমরা জানি। কারণ আপনিতো সেটাই চেয়েছিলেন। আপনার উপর আমাদের আর কোন আস্তা নেই, বিশ্বাস নেই, নেই ভালোবাসাও।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনে রাখবেন পাহাড়ে জুম্ম জনগণের দীর্ঘ 2 যুগের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং আছে। আপনি জুম্মদের সেই 2 যুগের অভিজ্ঞতাকে আবারো পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য করবেন না। 22টি বছরের হতাশা দূর করে অবিলম্বে “পার্বত্য চুক্তি” পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করে জুম্মদের স্বাধীন জীবন প্রণালীর নূন্যতম অধিকারটুকু ফিরিয়ে দিন। আমরা শান্তি চাই, সংঘাত নয়। তবে আমাদেরকে 2 যুগের অধিক অভিজ্ঞতাকে ‘পার্বত্য চুক্তি” বাস্তবায়নে প্রয়োগীক অর্থে ব্যাবহার করতে বাধ্য করবেন না।

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
ড. লজিক্যাল বাঙালি Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
ড. লজিক্যাল বাঙালি
পথচারী

কেবল পাহাড়ের ৪ উপজাতীয় গ্রুপ অস্ত্র ত্যাগ করলেই চুক্তির পুরো বাস্তবায়নের কথা আসবে। যদি অস্ত্রই ত্যাগ না করে, যদি শান্তিই না আসে, তবে কিসের শান্তি চুক্তি! এখন চিন্তার সময় এসেছে এ চুক্তি বাতিল করার!