ভর্তি এবং মা!

আমার মায়ের প্রথম সন্তান তথা আমার বড়বোন যখন স্কুলে ভর্তি হতে গেলো, তখন স্কুলের হেডমাস্টার থেকে শুরু করে পরিচিত সকল মাস্টারগণ বিস্মিত হয়ে মার কাছে জানতে চাইলেন – “মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করতে চাইছেন কেন? অন্য কোন বাড়ির কোন মেয়েকে কি কেউ স্কুলে পাঠায় এখানে”?

– অন্যে পাঠায় না বলে কি আমার মেয়েকে শিক্ষিত করতে পারবো না?

– কিন্তু আপনার মেয়েকে কোথায় বসাবো? মেয়েদের জন্য আলাদাতো কোন বেঞ্চ নেই!

মায়ের নানাবিধ তদবির আর অনুরোধে প্রথম ছাত্রী হিসেবে ভর্তি করানো হলো গাঁয়ের একমাত্র স্কুলে। বেঞ্চেরও ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু রাস্তাঘাটহীন স্কুলে না হয় শুকনোর দিনে বিল পথঘাট দিয়ে যাওয়া যাবে কিন্তু বর্ষায় কি হবে?

তারও ব্যবস্থা করলেন মা। একজন ছৈ-ওয়ালা নৌকার মাঝি ভাড়া করলেন মা। যে বর্ষার ছমাস বোনকে নিয়ে যাবে স্কুলে এবং নিয়ে আসবে তাকে স্কুল থেকে। এভাবে চললো আমার বড় বোনের শিক্ষা। মা মেয়ের এ প্রথম সংগ্রামে গ্রামে থেকেও বোন গ্রাজুয়েট হলো সম্ভবত প্রথম!

মনে আছে, বোন প্রাইভেট স্নাতক পরীক্ষা দিতে আমাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে গিয়েছিল আমাকে নিয়ে। তখন খুব ছোট ছিলাম আমি! এক মাস পরীক্ষার জন্য একটা পুরনো জমিদার বাড়ির একটা কক্ষ ভাড়া করেছিলাম আমরা। বিশাল সে হিন্দু জমিদার বাড়িতে দুই ভাইবোন একা থাকতাম। ভয়ে রাতে আঁৎকে উঠতাম দুজনে।

:

ভাইকে কে যেন ভর্তি করিয়েছিল মাদ্রাসায়। মা তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসে ভর্তি করান স্কুলে। কিন্তু মাদ্রাসার ছেলেকে স্কুলে নিয়ে আসাতে ক্ষেপে যান মাদ্রাসার মোদারেছগণ। তারা মার কাছে জানতে চান “জান্নাতি শিক্ষা” বাদ দিয়ে কেন “জাহান্নামি শিক্ষাতে” দেয়া হলো ছেলেকে? কিন্তু মাকে টলাতে পারেনি ঐসব মৌলভীগণ। মা বলেছিল – ‘সব শিক্ষাই স্বর্গীয়’। তারা ‘বদদোয়া’ করেছিল মায়ের এ ‘কুকর্মে’। কিন্তু ভাই ঐ সময় ১ম বিভাগে মেট্রিক পাস করে ওদের মুখে ছাইকালি তুলে দেন। পরবর্তীতে ভাই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হলে চলে যান সৌদি আরব। সেখানে প্রায় চল্লিশ বছর অবস্থানকালে ঐ মাদ্রাসায় অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন তিনি, যাতে তার পুরনো মাদ্রাসা শিক্ষকদের দু:খ কিছুটা কমে তার চলে আসার জন্য!

:

মায়ের দ্বিতীয় কন্যা স্কুলে পড়তে পড়তে তার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। কথা ছিল এসএসসি পরীক্ষার পর তুলে দেয়া হবে তাকে এবং বরের বাড়ি গিয়েও ঐপক্ষ অব্যাহত রাখবে তার পড়ালেখা। কিন্তু বরের বাড়ির চাপাচাপিতে পরীক্ষার আগেই বোনকে তুলে নেন তারা। এবং পরীক্ষা আসন্ন হলে ‘মেয়েদের আর পরীক্ষা দিয়ে কি হবে’ এমন কথা বলে পরীক্ষা না দিতে বোনকে চাপ দিতে থাকেন। কৌশলে মা অসুস্থ্যতার কথা বলে মেয়েকে নিয়ে আসেন এবং নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে সকল পরীক্ষা দেওয়ান। অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করে পাশ করেন মার ২য় কন্যা। মার কঠোর মনোভাবের কারণে তার ২য় কন্যাকে কলেজে পড়াতে বাধ্য হন তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

:

এর পরের মায়ের ছেলেকে পড়ার সুবিধা করার জন্য মা ভর্তি করতে যান দূরের এক ভাল স্কুলে। কিন্তু সেখানের টিচারগণ সব অপরিচিত মায়ের। শেষে যেচে সবাইর সাথে পরিচয় করে ভাইকে হাফ বেতনে ভর্তি করিয়ে লজিংয়ের ব্যবস্থা করেন স্কুলের পাশের এক বাড়িতে। গ্রাম থেকে স্কুল পাশ করলেই ছেলেকে চট্টগ্রাম পাঠান মা কলেজে পড়াতে। একটা এফ টাইপের সরকারি বাসাতে গাদাগাদি করে থেকে মা সেখানে তার সব ছেলে-মেয়েকে কলেজে ভর্তি করে অব্যাহত রাখেন সবার পড়ালেখা। শহরের সরকারি বাসাতে চাল-ডালের যেন কোন সমস্যা না হয়, তাই নিয়মিত গ্রাম থেকে সংগ্রহ করতে থাকেন গ্রাম্য চাল-ডাল তেল-নুন ইত্যাদি।

:

বিজ্ঞান পড়ানোর জন্য ছোট মেয়েকে ভর্তি করার দূরের এক স্কুলে, কারণ কাছের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ নেই। তারও যাতায়াত সমস্যা বর্ষকালে, যেতে ভয় পান একাকি। পথে অনেকগুলো বাঁশের সাঁকো। পিচ্ছিল রাস্তা। তাই আশে পাশের ১০/১২টা মেয়ের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদেরও ঐ স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করেন মা। বোন তখন ১০/১২ মেয়ের সাথে ঝাঁক বেধে স্কুলে যেতে যেতে খুব ভাল ভাবে শেষ করলো স্কুলের গন্ডি। এবং যথারীতি চট্টগ্রামে কলেজে পাঠালো মা তাকে এফ টাইপের সরকারি ফ্ল্যাট বাসাতে।

:

আমাকে যখন ভর্তি করাতে নিয়ে গেল স্কুলে। হেডমাস্টার মার খুব পরিচিত বলে মাকে খাতির যত্ন করলো খুব। হেড স্যার যা যা জিজ্ঞেস করলেন আমার কাছে, পটাপট সব বলে দিলাম আমি। শেষে মা তাৎক্ষণিক সিন্ধান্ত নিলেন – টুতে নয়, সরাসরি থ্রিতে ভর্তি করাবেন আমাকে। এবং তাই হলো – থ্রিতে ভর্তি হলাম আমি। আর তাই যখন এসএসসি পাশ করলাম, তখন আমার বয়স ঝাড়া চৌদ্দ। চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টার পড়ার পর মা বললেন – ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি করাবেন আমাকে। কিন্তু মাকে না বলে ‘বাইরাইন’ চলে গেলাম আমি আকস্মিক! তাতে মার সেকি কান্না। দেড় বছর পর যখন রঙিন ‘টিভি’ আর ‘ভিসিআর’ নিয়ে ছুটিতে এলাম মায়ের কাছে। মা ছুটি-ফুটি বাদ দিয়ে ভর্তি করালেন আমায় ঢাকা ভার্সিটিতে। এবং ক্রমাগত পড়তে থাকলাম সাহিত্য আর ভাষাতত্ত্ব মায়ের আদেশে।

:

এভাবে মা তার সকল সন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন জীবনের সব স্কুলে। আজ অনেক বছর মা হারা আমরা সকল ভাইবোন। কিন্তু ভর্তি নামক ভালবাসার হাড়ের পাহাড়ে বসিয়ে গেছেন মা আমাদের! যার জীবনময়তার আকাশে নক্ষত্র হয়ে উড়ে যাই আমরা প্রত্যহ প্রতিনিয়ত! মা যেন ছিলেন শিক্ষাতে মৃতবৎসা এক মাতাল ভিখারিণী আমাদের জন্যে! তার ভালবাসা যেন নদীভুখ মূঢ়তায় বিচরণের আনন্দময়তা কেড়ে নেয় অনেকের! এক দায়বোধে রচিত ভালবাসার পৃথিবীর ছিদ্রে ছিদ্রে মা বসিয়ে গেছেন আমাদের সবাইকে! এ যেন পাড়াগাঁয়ের শীতার্ত হিমেল জোছনা রোদ! আমাদের পাড়াগাঁয়ের মূঢ়তার দিনরাত্রিগুলো এভাবেই উজ্জ্বলতর করেছিল মা। তার মেঠাপথের ধুলোময় পরিস্ফুট রোদের আলোয় আলোকিত আমরা! তাই আজো মৃত মায়ের সুপক্ব রাত্রির গন্ধে ভেসে যাই আমরা তার প্রেমজ ভালবাসায়! এবং মনে হয় –

 

“এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে;

– জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা।

অনেক হয়েছে শোয়া;

– তারপর একদিন চ’লে গেছে কোন দূর মেঘে।

অন্ধকার শেষ হ’লে যেই স্তর জেগে ওঠে আলোর আবেগে :

সরোজিনী চলে গেলো অতদূর? সিঁড়ি ছাড়া

– পাখিদের মত পাখা বিনা?

হয়তো বা মৃত্তিকার জ্যামিতিক ঢেউ আজ? জ্যামিতির

ভূত বলে: আমি তো জানি না।

জাফরান – আলোকের বিশুষ্কতা সন্ধ্যার আকাশে আছে লেগে:

লুপ্ত বেড়ালের মত; শূন্য চাতুরির মূঢ় হাসি নিয়ে জেগে!

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of