ফেসবুক প্রেম ও বিয়ে

ফ্রান্সে থাকি আমি প্রায় দুবছর যাবত। এর আগে জার্মানীতে ছিলাম পাঁচ বছর। প্রায় সাত বছর আগে আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রামে জার্মানীর হেইডেলবার্গ ভার্সিটিতে পড়ালেখা করতে আসি আমি। গ্রাজুয়েশন শেষ করে আর ঢাকা ফিরে যাইনি। চলে এসেছি প্যারিসে। এখানে যদিও এখনো নাগরিকত্ব পাইনি আমি কিন্তু ‘পিআর’ হয়েছে আমার। সম্ভবত এ বছরই পেয়ে যাবো ফরাসি পাসপোর্ট। একটা সুপারশপে কাজ করি। দুবেলা ডিউটি আমার। যেদিন সকালে শুরু হয়, সেদিন দুপুর দুটোর পর আর কোন কাজ নেই। আর যেদিন দুটোতে শুরু, সেদিন রাত দশটার পর ফ্রি। তারপর প্রকান্ড অবসর। সুতরাং দেশি বন্ধুদের সাথে ফেসবুকে আড্ডা দেয়া ছাড়া আর সময় কাটেনা তখন।
:
দেশে বলতে গেলে কেউ আপন নেই আমার। মা বাবা গত হয়েছে প্রায় ১০/১২ বছর হলো। বোনেরা সব বিয়ে করে বিদেশে অবস্থান করছে স্বামী সন্তান নিয়ে। সুতরাং বলতে গেলে এখন একাই আমি। তাই নিজের বিয়ে মূলত নিজেকেই করতে হচ্ছে। ফেসবুকে ভাল বন্ধু খুঁজছি অনেক দিন থেকে। বিশেষ করে স্বদেশী মেয়ে। যাকে বিয়ে করে নিয়ে আসতে পারি এখানে। এর মধ্যে সোসাল মিডিয়ায় দুচারজনের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল কিন্তু নানাবিধ কারণে তারা পিছলে গেছে। কোনটাতে পিছিয়ে গেছি আমি। তবে সম্প্রতি ঢাকার বুয়েটে পড়া মেধাবীকন্যা রিফাতের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে খুব। তাকে জানিয়েছি আমার সকল প্লান। আমার সব কথাতেই রাজি সে। যদিও মা বাবার একমাত্র কন্যা রিফাত। ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজেদের বাড়ি। বাবা আগে সরকারের এডিশনাল সেক্রেটারী ছিলেন। দুবছর আগে মারা গেছেন। এখন মাকেসহ বাবার বানানো বাড়িতে থাকে রিফাত আর তার বিধবা মা। বাবা কিছু সঞ্চয় রেখে গেছেন ব্যাংকে। তার ইন্টারেস্টে আর নীচতলা দোতলা ঘরভাড়া দিয়ে মা মেয়ের চলে যায় বেশ। ৩-তলাতে থাকে ওরা।
:
রিফাতকে বলেছি এবার ঢাকা এসে বিয়ে করবো আমি। তারপর মাস তিনেক থেকে ফিরে আসবো প্যারিস। সম্ভবত ছমাসের মাঝে মিলবে আমার পাসপোর্ট। আর পাসপোর্ট পেলেই নতুন বউকে নিয়ে আসবো প্যারিস আমার ভাড়া ফ্ল্যাটে। রিফাতের পড়া যদিও এখনই শেষ হয়নি কিন্তু আমাকে এখনই বিয়ে করতে রাজি সে। আমার পাসপোর্ট পেতে পেতে হয়তো ওর পড়াটাও শেষ হয়ে যাবে। ইঞ্জিনিয়ার মেয়ে সহজে ভাল কাজ পাবে প্যারিসে। একদিন প্যারিসের চার্লস দা গ্যালে এয়ারপোর্ট এসে উঠে বসলাম ঢাকাগামী আমিরাত বিমানে। যেটা দুবাই ট্রানজিট হয়ে ঢাকা পৌঁছতে সেই রাত দশটা। ঢাকা কোন আত্মীয়ের বাসায় উঠবো না। তাই আপাতত হোটেলে ওঠার সিন্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু এটা শুনে ভীষণ গোস্বা করেছে রিফাত। তার একটা মাত্রা শর্ত, তাকে বিয়ে করতে হলে উঠতে হবে তাদের ফ্ল্যাটে। যেখানে ২১০০-স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে কেবল সে আর মা থাকেন একাকি। এবং রিফাত আমাকে রিসিভ করতে আসবে ঢাকা এয়ারপোর্টে গাড়ি নিয়ে। রিফাতের এ প্রস্তাব ভাল লাগলো আমার। কারণ আমারো ভাল লাগছিলোনা একাকি কোন হোটেলে থাকি। তারচেয়ে বরং বিয়ের আগে কটা দিন রিফাতকে চিনতে পারবো আরো ভাল করে!
:
ল্যাগেজপত্র নিয়ে ক্যানোপি থেকে বের হতেই কালো টিপ আর কালো হলদে প্রিন্টের শাড়িপরা রিফাত নজরে এলো। হাতে তার কালো বালা। হ্যা, যেমন ছবি পাঠিয়েছিল একদমই তেমন। রিফাত একটা মাইক্রো এনেছে। বললো কি কাজে ওদের গাড়িটা নাকি একটু বিজি। তাই ভাড়া করা মাইক্রো নিয়ে এসেছে রিফাত। যানজট পেরিয়ে ওর বাড়িতে পৌঁছতে পাক্কা দুঘন্টা লাগলো। ওর বাড়ির সামনে নেমে দেড় হাজার টাকা পরিশোধ করলাম মাইক্রো ভাড়া। যদিও ভাড়াটা রিফাত দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভদ্রতাবসত আমিই দিয়ে দিলাম ভাড়াটা। মনে করেছিলাম লাগেজপত্র তুলতে চাকর বাকর কেউ থাকবে কিন্তু তার ব্যবস্থা করতে পারলো না রিফাত। নিজেই বরং টেনেটুনে তুললাম নিজের সব লাগেজপত্র তিন তলাতে। একদম সুনসান বাসা। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম ঘরে ঢুকেই ওর মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করবো। কিন্তু ঘরে পেলাম না তাকে। রিফাত বললো – মা একটু জরুরী কাজে বাইরে গেছে। এখনই এসে পড়বে। ঘরের চেহারা এলোমেলো, আসবাবপত্র তেমন নেই দেখে মনটা খারাপ হলো আমার। আসলে যেমন মনে করেছিলাম তেমনটা কেবল রিফাতকেই পেলাম কিন্তু তার ঘরের পরিবেশটা কেমন যেন অগোছালো নোংরা।
:
এতো দূর থেকে জার্নি করে এলাম। কিন্তু এক গ্লাস শরবতও খেতে অফার করলো না রিফাত। একবার নিজেই বললাম – ‘একটু পানি খাবো। গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। আর স্নান করা দরকার’। পানি দিলো রিফাত সাধারণ টেপকল থেকে। আমাকে কানে কানে বললো – ‘নগদ টাকা পয়সা সোনাদানা থাকলে তা দাও আলমারিতে লুকিয়ে রাখি। বোঝতো বাংলাদেশ’! শুনে আমি বললাম – ‘হ্যা সবই আছে। তা ছাড়া তোমার জন্যে এনেছি প্যারিসের আধুনিক জড়োয়া সেট, যার দাম প্রায় চার লাখ টাকা। তা পরিয়ে দেব তোমার গলায়’। শুনে ফিক করে হাসলো রিফাত। ওর গালে চিমটি কেটে বললাম – ‘খুব লম্বা জার্নি করেছি, গোছলটা করে নেই’। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে লুঙ্গি আর তোয়ালে বের করে ঢুকলাম ওয়াশরুমে। ইস! এতো নোংরা বাথরুম। বেশ কটু গন্ধ। মনে হয় অনেকদিন কেউ ব্যবহার করেনি কিংবা পানি ঢালেনি। ভেতরে একটা সাবান পর্যন্ত নেই। নিজের ব্যাগ খুলে বের করলাম সাবান, শ্যাম্পু, রেজার। ঝরণা ছেড়ে অনেকক্ষণ গোছল করলাম মন ভরে।
:
স্নান ছেড়ে বের হতেই দেখি চারজন জিনস পরা ছেলে সোফায় বসা। রিফাত বললো – ‘ওরা কাজিন ওর। মায়ের কাছে এসেছে। অপেক্ষা করছে তার জন্যে’। মাকে ফোন লাগাতে বললে রিফাত বললো – ‘এখনই এসে পড়বে সে! জানিয়েছে আমাকে’। টেবিলে ফোন রেখে ঢুকেছিলাম ওয়াশরুমে। ঢাকার পুরনো দুয়েকজন বন্ধুকে কল করবো, তাই ফোটনার খোঁজ লাগালাম কিন্তু খুঁজে পেলাম না আমার দামি ফোনটা। ফোন খোঁজার কথা বলে ভেতরে গিয়ে রিফাত দরজা ফাঁক করে ডাকলো আমাকে। আমি ভেতরে যেতেই চার ছোকড়া ঝাপটে ধরলো আমাকে। বললো – ‘টু টা শব্দ করবি না, তাহলে জানে মেরে ফলেবো’! একজনে মুখে টেপ লাগালো আমার। অন্যজনে পিছমোরা করে হাতে বেঁধে ফেললো। বাকি একজনে পরনের পুরো কাপড় টেনে খুলে ফেললো আমার। রিফাত এলো পুরো নগ্ন হয়ে। আমার বাহুলগ্না হয়ে নানান পোচ দিলো রিফাত। যার ছবি তুলতে থাকলো ৪র্থ জন। আরেকজন ভিডিও করলো পুরো দৃশ্য। ঘন্টাখানেক এভাবে নানা এঙ্গেলে ছবি তুলে বললো – ‘আপাতত এ রুমে থাক তুই। বাকিটা দেখতে পাবি কাল’। আমাকে ভেতরে বন্ধ করে বাইরে থেকে আটকে দিলো রুমটি। ওদের কথাবার্তায় বুঝতে পারছি আমার লাগেজপত্র নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে ওরা।
:
সারারাত এভাবে মুখে কচটেপ আর হাতবাঁধা কষ্টকর সময় কাটলো আমার। পরদিন সকাল আটটার দিকে এলো ওরা। সাথে হাস্যজ্জ্বল রিফাতও। রিফাত বললো – তোমার লাগেজ পত্র সব নিয়া গেছে ওরা যায়গামত। তোমার কাছেতো আর কিছু নাই। এইবার ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড দাও, যদি জানে বাঁচতে চাও। বললাম – এটাতো ফ্রান্সের কার্ড! এটা কি এখানের মেশিনে চলবে? ওদের একজন বললো – ‘স্টান্ডার্ন্ড চাটার্ড ব্যাংকে চলবো। তুমি পিন নম্বর দাও। না হলে এ ভবনের পানির ট্যাংকিতে থাকবে তোমার লাশ। পিন নম্বর দিলে কি আমায় ছেড়ে দেবে’? কাঁপতে কাঁপতে বললাম আমি! হ ছাইড়া দিমু। তোরে দিয়া কি করুম আমরা! সঠিক পিন নম্বর লিখে দিলাম একটা কাগজে। কাঁপা গলায় বললাম – এবার আমাকে ছেড়ে দাও ভাই! রিফাত বললো – আগে টাকা তুলবে, পিন নম্বর ঠিক থাকলে ছাড়া হবে তোকে। দুপুরে এলো রিফাত আর একজন। বললো – তোকে ছাইড়া দিতে পারি এক শর্তে। আজই চইলা যাবি ফ্রান্সে। তাইলে তোর পাসপোর্ট টিকেট ফেরত দিমু। বললাম – আমার টিকেটতো ৩-মাস পরের। আজ কিভাবে যাবো আমি? রিফাত বললো – সব ঠিক করেছি আমরা গুলশান আমিরাত অফিস গিয়া। আজ রাত ১১:৫৫ মিনিটের আমিরাত ফ্ল্যাইট রিকনফার্ম করেছি তোর সিট। যদি রাজি থাকস, তবে এয়ারপোর্টে তুলে দিয়ে আসবো তোকে। আমি মাথা নেড়ে বললাম – হ্যাঁ চলে যেতে রাজি আমি। প্লিজ! ছেড়ে দাও আমায়। এবার একথালা ভাত আর তরকারি আনলো ছেলেটা আমার সামনে। বললো – ‘এইগুলা খাইয়া নে’। কাল থেকে ভুখা আমি। তাই প্রচন্ড ক্ষুধায় যা পেলাম তাই খেলাম।
:
রাত নটায় এবার এলো সেই চার যুবক। তারা বললো – ‘এ্যাম্বুলেন্সে যাবো আমরা। কোন কথা বলবি না। তাহলে তোর ন্যাংটা ছবি সব প্রকাশ পাবে ইন্টারনেটে।
আর পাসপোর্টও পাবিনা কখনো। চুপচাপ চইলা যা’। আমি হ্যা সূচক সম্মতি জানিয়ে ওদের সাথে উঠে বসলাম এ্যাম্বুলেন্সের পেছনের সিটে। এয়ারপোর্ট ডিপারচারের দোতালায় থামলো এ্যাম্বুলেন্স। ওরা চারজনই ৩০০-টাকায় কাটলো ক্যানোপিতে ঢোকার টিকেট। আমার কোন মালপত্র নেই সাথে। তাই স্কানের ঝামেলাও নেই। ভেতরে ঢুকে আমাকে নিয়ে বসে রইল ৩-জন। একজন গেল বোর্ডিং করাতে। মিনিট পাঁচেক পর বোর্ডিং কার্ড, পাসপোর্ট, টিকেট, এমবারকেশন কার্ড আমাকে দেখিয়ে বললো – ‘এটা এখন এক যায়গায় রেখো আসবো। তুই ওখান থেকে নিয়ে ভেতরে ঢুকবি। আমি অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইলাম কথকের মুখের দিকে। সে আমার পাসপোর্ট টিকেট নিয়ে ঢুকলো টয়লেটে। মিনিট খানের পর ফিরে এসে বললো – ‘ঐ টয়লেটের শেষ ইউরিনালটার ওপর রাখা আছে তোর পাসপোর্ট টিকেট। যা নিয়ে আয়’। আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে গেলাম টয়লেটের দিকে। পাসপোর্ট নিয়ে ফিরে এসে ওদের কাউকে দেখলাম না ওখানে।
:
ফ্ল্যাইটের এখনো অনেক বাকি। বসে বসে চিন্তা করতে থাকলাম আমি কি ফ্লাইট বাতিল করে একটা কমপ্লিন করবো থানাতে? কিন্তু একটা পয়সা নেই আমার কাছে। এদেশে টাকা ছাড়া নাকি পুলিশে কোন কাজই করেনা। কিভাবে কি করবো আমি? কই থাকবো? খাবো কি? তারচেয়ে চলে যাই প্যারিসে। দেখা যাক কি হয়। আর কিছু না ভেবে ঢুকে গেলাম ভেতরে। বোর্ডিং ব্রিজ পার হয়ে সরাসরি ভেতরে ঢুকলাম আমিরাতগামি দুবাই ফ্লাইটে। বিমানের দরজা বন্ধ হয়েছে। এখনই আকাশে উড়বে বিমান। এই আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ! যেখানে এসে সব হারিয়ে একদম খালি হাতে চলে যাচ্ছি আমি প্যারিসে। জানিনা দ্য গল বিমানবন্দর থেকে কিভাবে বাসায় ফিরবো আমি। কোন ফোনও নেই আমার হাতে। দেশটা কি পুরোই নষ্ট হয়ে গেছে? তবে যে শুনছি উন্নতির কথা! কিসের উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশে! একটা গান শুনতে মন চাইছে আমার। হেডফোন কানে লাগিয়ে বাংলা চ্যানেল ঘুরালাম ইকে ফ্ল্যাইটের। শাহ আব্দুল করিমের গান বাজছে –
 
“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম।
হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম
জারি গান, বাউল গান
আনন্দের তুফান
গাইয়া সারি গান নৌকা দৌড়াইতাম।
বর্ষা যখন হইত,
গাজির গান আইত,
রংগে ঢংগে গাইত
আনন্দ পাইতাম
কে হবে মেম্বার,
কে বা সরকার
আমরা কি তার খবরও লইতাম
হায়রে আমরা কি তার খবরও লইতাম।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।
করি যে ভাবনা
সেই দিন আর পাব নাহ
ছিল বাসনা সুখি হইতাম
দিন হইতে দিন
আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম….”!
 
 

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
অভিনন্দন দাস Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
অভিনন্দন দাস
পথচারী

গল্প হলেও সত্যি,.. পশ্চিম বঙ্গের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়, ভাই।