গল্প: মুম্মিতার দেহফ্রেন্ড

 

গল্প: মুম্মিতার দেহফ্রেন্ড
সাইয়িদ রফিকুল হক

সোহানী মায়ের সঙ্গে আজ বিকালে শপিং করতে যাচ্ছিলো নিউ মার্কেটে। ওরা মার্কেটের দুই-নাম্বার গেইট দিয়ে ভিতরে ঢুকছিল।
এমন সময় সোহানী দেখে ফেললো মুম্মিতা মিম্মাকে। সেও হয়তো শপিং শেষ করে এই গেইট দিয়েই বাইরে বের হচ্ছিলো। কিন্তু সোহানী তাকে এই ভিড়ের মধ্যেও দেখে ফেলেছে। মুম্মিতা হয়তো তাকে এখনও দেখেনি। ভিড়ের মধ্যে সবাই তাড়াহুড়া করে বের হচ্ছে।
অনেকদিন পরে মুম্মিতার সঙ্গে তার দেখা। ইদানীং সে ভার্সিটির হলে থাকে না। সে শুনেছে, কার সঙ্গে যেন মুম্মিতা এখন লিভ-টুগেদার করছে। খবরটার সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সময় কিংবা ইচ্ছা—কোনোটাই তার ছিল না।

অনেকদিন পর হল-বান্ধবীকে দেখে সোহানী কিছুটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে তার মাকে মার্কেটের গেইটের একপাশে একটা নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে মুম্মিতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তারপর দ্রুত ওর একদম কাছে গিয়ে ওর একটা হাত ধরে আলতো টান মেরে বলে, “অ্যাই, কেমন আছিস? ইস্, কতদিন পরে দেখা!”
মুম্মিতা খুব অবাক হয়ে বলে, “ভালো।”
তারপর সে বিস্ফারিত চোখে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, “আরে, তুই এখানে?”
এতোক্ষণে সে যেন সোহানীকে দেখতে ও চিনতে পেরেছে।
সোহানী হেসে বলে, “এই তো—শপিং করতে এসেছি।”
মুম্মিতা কিছু বলি-বলি করেও আর বলে না। শুধু কেমন করে যেন হাসে!
সোহানী আবার বলে, “তোর দিনকাল এখন কেমন যাচ্ছে রে?”
মুম্মিতা হাসিমুখে বলে, “খুব ভালো। আর নিজের চোখেই তো দেখতে পাচ্ছিস।”
সোহানী এবার মুম্মিতার দিকে ভালোভাবে চেয়ে দেখে—ওর চেহারায় আগের চেয়ে যেন জৌলুস বেড়েছে। সদ্যো বিবাহিত একটা মেয়ের চেহারায় যে সুখ আর প্রশান্তি ঝলমল করে ওর মধ্যেও সেই ভাবটা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।

মুম্মিতা লোক-চলাচলের রাস্তাটা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়ায়। তারপর একদৃষ্টিতে সোহানীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, “আমি এখন হলে থাকি না বলে—তুই খুব সুখে আছিস—না?”
সোহানী হেসে মায়া করে বলে, “তা নয় রে। আমি তোকে এখন খুব মিস করি। আর যাই হোক, তুই তো আমাকে মায়া করতিস।”
মুম্মিতা এবার আচমকা বলে, “তুই বিয়েশাদী করবি না?”
সোহানী লাজুক মেয়ের মতো ফিক করে হেসে বলে, “সবে তো অনার্স ফার্স্ট ইয়ার শেষ করলাম। অনার্সটা আগে শেষ করি। তারপর নাহয় বিয়ের কথা…।”
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই মুম্মিতা আগের মতো হেসে বলে, “আমার এতো দেরি সয় না। সময়ের কাজ সময়ে করাই ভালো।”
সে এমনভাবে কথাটা বললো—যেন সে বিয়েটা কবেই সেরে ফেলেছে!
সোহানী এবার প্রসঙ্গটা একটু ঘুরিয়ে বলে, “তুই একা-একা শপিংয়ে এসেছিস?”
এবার মুম্মিতা হেসে চোখের ইশারায় তাকে জানিয়ে দেয়—সে একা নয়। আর ডানদিকে একটু তাকিয়ে দ্যাখ।
সে ডানদিকে তাকিয়ে দেখে—একটা সাতাশ-আটাশ বছরের স্মার্ট যুবক গাড়ির চাবি হাতে মুম্মিতার জন্য অপেক্ষা করছে। ওই ছেলেটার মুখেও কী দারুণ একটা হাসি-হাসি-ভাব!

সোহানী ভেবে পায় না—এরা এতো-এতো সুখ পায় কীভাবে! বিয়ে নাই—শাদী নাই! অথচ, একজোড়া ছেলে-মেয়ে কী সুন্দর স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করছে! আর একসংসারে বসবাস করছে!
সোহানী দেখলো, মুম্মিতা তার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে এই ছেলেটার দিকে অন্তত দশবার তাকিয়েছে। আর ওদের চাহনি দেখলে গা শির শির করে! ওদের হাবভাবই যেন আলাদা। এই ছেলেটাকে সোহানী আগে কখনো দেখেনি।
মুম্মিতা হঠাৎ আবেগঘন হয়ে সোহানীর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে পুরে বলে, “একটা মানুষের সঙ্গে বেশিদিন থাকতে আমার ভালো লাগে না রে। তবে এইটাকে একটু ভালো লেগেছে। মনে ধরেছে। দেখি কতদিন থাকতে পারি।”
সোহানী আর সহ্য করতে পারে না—বলে, “এইটা তোর নতুন বয়ফ্রেন্ড? কততম রে?”
সোহানীর এইরকম বোকা-বোকা কথা শুনে মুম্মিতা যেন হেসে একেবারে গলে পড়ে। তার হাসি যেন থামতেই চায় না। তারপর সে আগের মতো হেসে গলে পড়তে-পড়তে বলে, “কততম নয় রে। আর এইটা আমার বয়ফ্রেন্ডও নয়! এইটা আমার শুধুই দেহফ্রেন্ড। সে অনেক টাকা দেয় রে। আর টাকার সুখ—বড় সুখ। যদি ভালো লাগে—তবে থেকে যাবো ওর কাছে।”
তারপর “যাই রে”—বলে সে সোহানীর হাতের মুঠোর ভিতর থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যায়।
আর সোহানী নির্বাক কাঠের পুতুলের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ঘনঘোর বিস্ময়ে—সে তার এমনি ফ্রেন্ড নয়—বয়ফ্রেন্ডও নয়—একেবারে দেহফ্রেন্ড!

সেখানেই সোহানীর মাথাটা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২৬/১১/২০১৯

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of