ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি মানুষ হওয়ার মানদণ্ড

অনলাইনে এক রূপবতী তরুণীর সাথে পরিচয় হয়েছিল। তরুণী আমার শহরেই থাকে। আমরা তিনদিন চুটিয়ে ফ্লার্ট করি। তরুণী ব্যাপক সুন্দরী, শরীরের প্রতিটি অঙ্গই যেন নিজ হাতে মেপে মেপে সাজিয়েছে। মেয়েদের ঢং আমার সব সময়ই ভালো লাগে, কী সুন্দর করে মেয়েরা আহ্লাদ করে!

একদিন তরুণী বলে সে নাকি পুরো এক কেজি বেড়ে গেছে। মনটা তার বড্ড খারাপ। এক কেজি বেড়ে যাওয়ার দুঃখে সে রাতে ঘুমোতে পারে নি। ইশ, কী কষ্ট মেয়েটার জীবনে! পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারে না সেই নিয়ে দুঃখ নেই কিন্তু পুরো এক কেজি বেড়ে যাওয়াতে কষ্টের কোন কমতি নেই।

একদিন তাকে বলি, জার্মান নারীবাদীদের অনুষ্ঠানে আমাকে বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমি খুবই উৎসাহী।

তরুণী বলে, তুমি কি মেয়ে নাকি?
তরুণীর প্রশ্ন শুনে ধাক্কা খাই।
তরুণীকে বলি, নারীবাদ নিয়ে আমার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
তরুণী চিৎকার করে বলে কী? তুমি কি তসলিমা নাসরিন? তুমি লেখালেখিও করো?

আমি আবারও ধাক্কা খাই। এই ধাক্কা সামাল দিতে আমার অনেক সময় লাগে।

কিছু কিছু নারীদের সম্বলই থাকে তাদের শরীর, মেধা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। শরীরকে পুঁজি করেই জীবন কাটাতে হয়। তরুণীও হয়তো এমনই। যে পরিবার এবং পরিবেশে সে বেড়ে উঠেছিল সেখানে নারীর শরীরের মূল্য চড়া, কিন্তু নারীর মেধা ও অধ্যবসায়ের কোন মূল্য নেই। জার্মানি থেকেও মানুষ এমন চিন্তাধারা লালন করতে পারে- এটা ভেবে আমি খুব অবাক হই, হতাশ হই।

কিছুদিন আগে আমার ইনবক্সে ঢাকার একজন উত্তম পুরুষ ২০১৪ সালের কোন এক সরকারী পরীক্ষার একটি প্রশ্নের ছবি তুলে আমাকে লিখে, ‘দেখ দেখ তোর বাপরে মাইয়া বানায়লাইছে।

প্রশ্নটি ছিল- বাঙলাদেশের প্রথম নারীবাদী লেখক কে?

ক) রোকেয়া

খ) হুমায়ুন

গ) তসলিমা

ঘ) সুফিয়া।

সেই উত্তম পুরুষ খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সাথে ডজন ডজন বার্তা লিখে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, সরকারী পরীক্ষার প্রশ্নে সব মহিলাদের সাথে আমার বাবার নাম উল্লেখ করার কারণে প্রমাণিত যে হুমায়ুন হচ্ছে মহিলা। যেহেতু আমি সেই চর্চায় বিশ্বাসী তাই আমিও মহিলা।

সেই উত্তম পুরুষের প্রোফাইলে গিয়ে হোঁচট খাই। দেখি, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বর্তমানে সাংবাদিকতা করছেন। কিছুক্ষণ পরেই আমি নিজেকে প্রশ্ন করি- আমি কেনো অবাক হচ্ছি?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি মানুষ হওয়ার মানদণ্ড? সভ্য হওয়ার সংবিধান? সৃষ্টিশীল, মননশীল, জ্ঞানী, উদার হওয়ার সার্টিফিকেট? না, একদম না।

আমার ২০১৩ সালের স্মৃতি ভেসে উঠে। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের কথা মনে পড়ে। হাজার হাজার বর্বর, অসভ্য, হিংস্রদানব, মূর্খ, প্রগতি, সংস্কৃতি, আধুনিকতাবিমুখ ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারার মানুষের কথা মনে পড়ে। আমার এখনও স্পষ্ট স্মরণ আছে; মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে ধ্বনিত হয়, ‘আমাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক।‘ নারীদের বন্দি করার, দাসী হিশেবে চিহ্নিত করার, স্বামীর লিঙ্গে শান্তিপ্রদান ও বাচ্চা উৎপাদনের শস্যক্ষেত্র হিশেবে নারীদের কৌশলে শেকলে বেঁধে রাখার যেই ভয়ংকর রাজনীতির যাত্রা শুরু করেছিল তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষকও সংহতি প্রকাশ করেছিল।

হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম দাবি ছিল নারীকে বন্দি করার কৌশলঃ 

৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।

৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।

কোন বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশ বা পরিবারের উপর ব্যক্তিবিশেষের উৎকর্ষ নির্ভর করে না। সেটা জার্মানি হোক আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড কিংবা সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করলেই কেউ সৃষ্টিশীল, মননশীল, মানবিক, প্রগতি, আধুনিকার স্বপক্ষে অবস্থান নেবে এমন কোন সংবিধান নেই।

ফেসবুক মন্তব্য

৩ thoughts on “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি মানুষ হওয়ার মানদণ্ড

  1. মৌলভীরা ঘরে বউ তালা মেরে রেখে মাদ্রাসাতে ছোট ছোট বাচ্চাদের বলাৎকার করে আর নারীর পক্ষে কথা বললেই এদের গাত্রদায় শুরু হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 1