গরিবের প্রতিশোধ স্টাইল (পর্ব-৩) শেষ পর্ব

 

ছোট পশুর নদীর তীরে দুটো কুমির বালির গর্তের ওপর বসে আছে অনেকক্ষণ। ভালভাবে নিরীক্ষণ করে বুঝলাম ওরা ডিম পারছে বালির গর্তে। একটা জালের ফাঁদে পাকড়াও করলাম। বাকিটা তেড়ে আসলো আামার দিকে। দৌড়ে একটা বাঁকা বৃক্ষে উঠলাম। তা দেখে আবার ডিমের স্থলে গেল মুক্ত কুমীরটি। এবার গাছ থেকে বল্লম খাড়া করে নিক্ষেপ করলাম ওর মগজ বরাবর। ব্ল্লমের ঘায়ে নিস্তেজ হয়ে রইল ২য় কুমিরটি। আমি নেমে পরীক্ষা করে দেখলাম মারা গেছে ২য়টি কিন্তু প্রথমটি তখনো ঝাকা-নাকা করছে। ঝাঁপিয়ে পড়ে চোয়াল চেপে মুখটি বাঁধলাম শক্ত রশি দিয়ে। ওর নড়বার শক্তি রইলো না। দুটোর চামড়া ছাড়াতে অনেক বেলা হয়ে গেল। মাংসগুলো খাদে ফেলে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে ভেঙে ফেললাম সব ডিমগুলো। যেন একটা বাচ্চাও আর না হতে পারে এ নদীতীরে। নটা চামড়ায় অনেক ওজন। জেলেদের একটা পরিত্যক্ত ভেলাতে সব চামড়া নিয়ে তা পাতা দিয়ে ঢেকে রশির গুণ লাগিয়ে তা টানতে টানতে এগুলাম বাড়ির দিকে। কিন্তু ভয়লেশহীনভাবে হাঁটছি ঐ নদীর হাঁটু জল দিয়ে। বাঘ কিংবা কুমিরের কোন ভয় নেই আমার। মনে হচ্ছে সবগুলোকে শেষ করে ফেলেছি আমি।

:

ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হলো। আমার আগমন টের পেয়ে সখিনা দৌড়ে এলো কেরোশিনের কুপি নিয়ে। মোবা্ইল করলাম সতীনাথ বাবুকে। রাতের মধ্যেই ৯-টা চামড়া নিতে হবে। সবগুলোতে কুড়ি হাজার টাকা দিলো সতীনাথবাবুর লোক। তারপরো ভাল। দুয়েকদিন পর পর ১০/১৫/২০ হাজার টাকা কামাই করছি বনে বনে ঘুরে। রাতে সখিনাকে বুকে জড়িয়ে বললাম – সম্ভবত এ বনে আর কোন বাঘ বা কুমির নেই। কাল একবার যাবো শেষ যাওয়া। সখিনা শিহরিত হয়ে বললো – তাইলে আমিও যামু। কিন্তু এতো শ্বাসমূলের খুটোর মাঝে সখিনা হাঁটবে কিভাবে। শেষে না ওর নরম পা গেঁথে থাকে হেথাল কাঁটায়! আজ দুটো জীবন্ত মুরগি নিয়েছি সাথে। পরীক্ষা করবো বাঘ আর কুমীরের। প্রথমে বাঘের আস্তানার কাছে বেঁধে রাখলাম লাল মুরগি। কিন্তু কোন বাঘ এলো না। পুরো জঙ্গলে হাঁটলাম এ মাথা থেকে ওমাথা। শেষে নদী আর ওর খালগুলোতে জলের কাছে বেঁধে রাখলাম মুরগি দুটো। কিন্তু একটা কুমিরেরও দেখা মিললো না। নিজে হাঁটু জলে নেমে পানি নাড়াচাড়া করলাম। কুমীর থাকলে নিশ্চয়ই আসতো। কিন্তু কেউ এলোনা। সব কি শেষ তবে!

:

রাতে বনবিটের কাছের বাজারে এসে হাঁক ছেড়ে বললাম – শোন ভাই বোনেরা শোন! তোমাদের স্বামী সন্তান ভাই মা বোনদের খেয়েছে যে বাঘ আর কুমির! তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি আমি। কাল থেকে বিনা ভয়ে তোমরা মাছ ধরতে পারবে বনের খাল আর নদীগুলোতে। আর মধু কাটতে পারবে নির্বিঘ্নে। কোন ভয় নেই তোমাদের। সব শত্রু শেষ হয়েছে। এবার ভাল থাকবে তোমাদের সন্তানরা। আর এখানে সন্তান স্বামীহারা হবেনা কেউ। আমার মা বাবা হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি, তোমাদের স্বজন হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি! কেউবা মাথায় তুললো আমাকে। সব চা দোকানি চা খেতে অনুরোধ করলো আমাকে! শুনে সবাই জাগ্রত জয়ধ্বনি করলো। আমি অন্ধকারে হারিয়ে লুকিয়ে চলে গেলাম আমার নিভৃত কুঁড়েতে! রাতে সখিনারে ডেকে বললাম – সখিনা! এখানেতো আর থাকবো না আমি। অনেক দূরে চলে যাবো সমতলে। যেখানে নেই কোন বন-বাদাড়। তুই কি যাবি আমার সাথে? চোখ ভিজিয়ে সখিনা বলে – কই যাইবো ঠিক করেছো?

– নানা বাড়ির দেশে যাবো! মায়ের বাবার বাড়ি ছিল যেখানে। এখান থেকে অনেক দূরে! অন্য জেলাতে। লঞ্চে যাইতে হয়!

– কিন্তু মাকে কি করবো? সে কি যাইবে আমাদের লগে?

– হ, তারেও নিয়ে যামু আমাগো লগে। আমার মাকে কুমিরে না খাইলে কি ফেলে যাইতাম!

কিন্তু সখিনার মা রাজি হয়না আমাদের সাথে যেতে। বরং স্বামীর ভিটিতেই থেকে যেতে চায় সে বাকি জীবনটা। প্রতিবেশী কালু, ছিদাম, রুহুল আশ্বাস দেয়, তাকে তারা দেখে রাখবে মায়ের মতন।

:

সূর্য ওঠার আগেই নৌকায় ওঠে সখিনা, উঠি আমি। মালঞ্চ নদী পার হয়ে সাগর মোহনা ধরে পূব দিকে অনেকদূর যেতে হবে আমাদের। রাঙাবালি, জাহাজমারা আর খলসে দ্বীপের পর মায়ের বাবার বাড়ির দ্বীপগাঁ “উজানচর”। সেখানে মার ভাই তথা মামারা আছে। মা কিছু জমিও পেয়েছে ঐ দ্বীপে। একবার অনেক আগে মায়ের সাথে গিয়েছিলাম মামা বাড়ি দেখতে। রাঙাবালি গিয়ে ঢাকার লঞ্চে উঠতে হবে। দুপুর ১২-টায় ছাড়বে লঞ্চ। তারপর মামা বাড়ির দ্বীপে ভীড়বে রাত দুটোয়। প্রবল জীবন তাড়নায় নৌকা বাইতে থাকি আমি একাকি। আলতা পায়ে আর লাল ঠোঁটে সখিনা গলুইয়ে বসা। যেন নতুন বউকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি বর হিসেবে! নৌকোর তলদেশে কে যেন ধাক্কা দেয়। কুমির কি! তীরে একটা বাঘের মত হুঙ্কার শুনি! থাকারতো কথা নয়। শোনার ভ্রান্তি হতে পারে! ভারত থেকে এসেছে নাকি? বন থেকে বেড়িয়ে ধুঁ ধুঁ রাঙাবালির লঞ্চঘাট দেখতে পাই। স্রোতের টানে বেলা এগারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাই রাঙাবালি লঞ্চঘাটে। নীচে মাল রাখা খোলের কাছে একটা কাঁথা বিছিয়ে তাতে বসিয়ে দেই সখিনাকে। ক্ষুধা লেগেছে দুজনেরই। ঘাট থেকে মুরি আর বাতাসা কিনে আনি। সাথে দুটো রসগোল্লা। আজ সখিনাকে নিজ হাতে রসগোল্লা না খাওয়ালেই নয়। সম্ভবত এটাই আমাদের জীবনের প্রথম অভিসার! সখিনা আমি গোগ্রাসে গিলতে থাকি শুকনো মুরি আর বাতাসা। এক সময় রসসহ রসগোল্লা তুলে দেই সখিনার রাঙা ঠোঁটে! লজ্জা পেয়ে সখিনা বলে – কি করছো তুমি? চাইরদিকে মানুষ ভরা! ছেড়ে দেয় লঞ্চ ঢাকার দিকে।

:

অনেক চেনা অচেনা ঘাটে থামে ঢাকাগামী আধুনিক লঞ্চ। কত মানুষ ওঠে আর নামে। হাঁস-মুরগি, লাকড়ি-দুধ, ইলিশ মাছে ভরে যায় লঞ্চের পেছন দিকটা। বলতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই এখন। নামে খুব কম, ওঠে বেশী। সন্ধ্যা নামার পর ক্লান্তিবসত সখিনা ঘুমিয়ে যায়। আমারো চোখ জড়তে সময় লাগেনা। হঠাৎ পাশের এক যাত্রীর ধাক্কায় উঠে বসি আমি – কি মিয়া আপনে নাকি শ্রীপুর ঘাটে নামবেন? ঐতো শ্রীপুর থামলো বইলা। চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসি লঞ্চের ডেকে। সখিনাকে ডেকে তুলি কাঁচা ঘুম থেকে। রাত প্রায় দুটো। আমাদের এখন নামতে হবে এই চরের অন্ধকার ঘাটে। আমাদের সাথে আরো ৪-জন লোক নামে। তারা যাবে অন্য পথে। আমার নানা সোমেদালি মাতবরকে চেনেনা তারা। লঞ্চের হুইসেল শুনে ঘাটের এক দোকানি বের হয়েছে সম্ভবত প্রচ্ছাব করতে। তার কাছে জানতে চাই উজান চরের মাতবর বাড়ির কথা। তিনি ঘুম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন উজানচরের পথ। যা অনেক দূর। দুতিন ঘন্টা হাটতে হবে বেরিবাঁধ ধরে।

:

ঘাসচরে রাতের শিশিরভেজা কুয়াশার অন্ধকারে সখিনার হাত ধরে হাঁটতে থাকি আমি! কিন্তু অচেনা এ পথ আর যেন শেষ হয়না। জানিনা উজানচর আর কত দূর! শীত লাগছে সখিনার। তার উষ্ণতা দরকার! ঘনিষ্ঠ হয় সখিনা আমার বুকের কাছে। জড়াজড়ি করে আমরা হেঁটে চলেছি তারাভরা আকাশের নিচে এক অনন্ত পথ ধরে! জানিনা এ পথ কবে শেষ হবে!

[৩-পর্বে শেষ]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of