পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও ছাত্র সমাজের করণীয় | বাচ্চু চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও ছাত্র সমাজের করণীয়

আজকের জুম্ম ছাত্র-তরুণরাই আগামী দিনের জুম্ম জাতির কর্ণধার হিসেবে আর্বিভাব হবে। আজ যারা ছাত্র-তরুণ সময়ের প্রকৃতির নিয়মে তারাই হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল কর্মী ও নেতা। তাই প্রতিটি জুম্ম ছাত্রের বিপদগামীতা এবং জাতির ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ থেকে দূরে থেকে সৎ, চরিত্রবান ও আত্মনির্ভরশীল আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। ছাত্র সমাজের কর্মপ্রেরণার মাধ্যমে নির্মিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রগতিশীল শক্তির অজেয় ধারা। ছাত্র-তরুণ সমাজের অংশগ্রহণে জুম্মজাতির মুক্তির সংগ্রাম হবে অধিকতর গতিশীল ও শক্তিশালী। এই প্রত্যাশায় আজ সেই সব প্রগতিশীল ও অজেয় শক্তিশালী আদর্শের ইস্পাত-দৃঢ় কর্মীদের সংগ্রামে পাওয়ার জন্যে এক বুক স্বপ্ন, আশা-ভরসা নিয়ে কলম ধরেছি। সার্থক জনম জন্মিয়াছি পার্বত্য চট্টগ্রামে এই কথার মর্মার্থ যেই ছাত্র-তরুণ বুঝবে, সেই জুম্মজাতির জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে সামিল হবে তা আমি মনে প্রাণেই বিশ্বাস করি। জাতির ক্রান্তিলগ্নে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের পাশে ছাত্ররাই একমাত্র দাঁড়াতে পারে। যুগে যুগে তরুণ-প্রাণ ছাত্রসমাজই ইতিহাস রচনা করেছে। ছাত্র-তরুণরাই অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতির জীবনে শোনাতে পারে ঘুম ভাঙানোর গান। যেমনি ছাত্র-তরুণ অবস্থায় জুম্ম জাতিকে জাগ্রত করেছিলেন, ঘুম ভাঙানোর গান শুনিয়েছিলেন মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। পার্বত্য চট্টগ্রামে দিকে দিকে যখন অন্যায় অবিচারের সীমাহীন স্পর্ধা, যখন উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়, যখন লোমহর্ষক আর্তচিৎকারে জীর্ণশীর্ণ হয় আমার পাহাড়, যখন লংগদু, লোগাং, নান্যাচর ও কলমপতিসহ এক ডজনের অধিক লোমহর্ষক গণহত্যার আর্তচিৎকারে পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে, তখন প্রাণ আর প্রাচুর্যে ভরপুর জুম্ম ছাত্র-তরুণরাই প্রতিকারের অঙ্গীকার নিয়ে ৭০-৮০ দশকে চলে এসেছিল নির্ভীক প্রাণে সশস্ত্র সংগ্রামে। সেই ছাত্র-তরুণরাই মুক্তির অগ্র সেনানী আর তারাই পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত মানুষের জীর্ণদশা থেকে মুক্তির জন্যে জীবন আত্মবলিদানে অঙ্গীকারাবদ্ধই ছিলেন।

এই ছাত্র-তরুণদের রক্ত দিয়ে লেখা হয় জাতির নতুন ইতিহাস। তাদের চোখে-মুখে ফোটে উঠে অনাগত দিনে সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন, বাহুতে থাকে তারুণ্যের অমিত শক্তি ও সাহস। সেজন্য ছাত্র তরুণরাই চিরকালই প্রভাতের সূর্যের মত চিরনবীন। মানবসেবার মধ্যে যে মহত্ত্ব, যে আত্মত্যাগ পরায়নতা ছাত্র তরুণরাই সর্বাগ্রে তার সন্ধান করে চলে। মানবসমাজের মহৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক সময় তারা বরণ করে মৃত্যুর মহিমা। মানুষের দুঃসহ লাঞ্ছনায় ছাত্র-তরুণ সমাজ কখনোই নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারে না। মানবসমাজের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা কখনোই ছাত্র-তরুণদের আচ্ছন্ন করতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষা যে ছাত্র পাবে, সেই ছাত্র-তরুণের প্রধান উদ্দেশ্যে হবে মানবতাবোধের জাগরণ। ন্যায়-অন্যায়বোধকে জাগ্রত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে কোনে কোনে মানবতাকে কবর দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। চলছে নির্যাতন, নিপীড়নও। তাইতো জুম্ম ছাত্র-তরুণদের আজ জেগে উঠার উপযুক্ত সময় সামনে উপস্থিত হয়েছে। জুম্মজাতির জাতীয় অস্তিত্বকে বিকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে রুঁখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। তা নাহলে মনে রাখবেন, অস্তিত্বহীন জীবন নিয়ে যন্ত্রণাভরা অনুশোচনায় ভোগবেন আর বিগত জীবনের গ্লানিভরা হীনতার লজ্জার দগ্ধানি সইতে হবে আজীবনই। অস্তিত্বহীন জীবন মানেই পায়ের তলে মাটি নেই, মাথার উপরে আকাশ নেই। পায়ের তলে মাটি চড়ে গেলে সবকিছুই হারিয়ে যাবে।

একজন মানুষের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তার দেশপ্রেম। জ্ঞানার্জনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাত্র-তরুণদের মাঝে মানবসমাজের প্রগতিশীল আদর্শ ও দেশপ্রেমের ক্ষুদ্র বীজ বপন পরবর্তী কর্মবহুল জীবনে এটি এক পর্যায়ে বিশাল মহীরুপে আকার ধারণ করে। আমরা ইতিহাসের দিকে যখন ফিরে তাকায় তখন দেখতে পায়, বাস্তব জ্ঞানের আলোকে জাতির কতর্ব্যের আহবানে ছাত্র-তরুণই পারে দেশপ্রেম ও স্বজাতিপ্রেমের আদর্শে সর্বোত্তম ত্যাগ স্বীকার করতে। বহু দূরে যাওয়ার দরকার নেই, বাংলাদেশের ইতিহাসেও দেখেছি স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের ভাষা আন্দোলনে এদেশের ছাত্র-তরুণ সমাজ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে মহান আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তা আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে। ছাত্র-তরুণরাই পারে জাতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সর্বস্তরের জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে মহান ঐক্য ও সংহতির পক্ষপাতহীন মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রদর্শিত আদর্শের মন্ত্রবাণী। সমাজের মধ্যেও একটি সচেতন অংশ হচ্ছে ছাত্রসমাজ। কুসংস্কার, গোড়াঁমি, মিথ্যা ও জরাজীর্ণতাকে মুছে ফেলে একটি সুন্দর সমাজ, শোষণহীন আর বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার দায়িত্ব আজকের জুম্ম ছাত্র-তরুণ সমাজের উপর নির্ভর করবে। আশাহীন জুম্মজাতির বুকে জাগাতে পারে আশা। ছাত্র-তরুণরা প্রয়োজনে কলম ছেড়ে অস্ত্র কাঁধে নেই। জীবনকে বাজি রেখে বীরদর্পে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্র তরুণসমাজের ভূমিকা অতুলনীয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে এই ছাত্র-তরুণেরা। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ক্ষেত্রে আজ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

মুক্তির লড়াইয়ের জন্য জুম্ম ছাত্র-তরুণ সমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান তো আমার নয়, স্বয়ং মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমারই আহ্বান ছিল। জুম্মজাতি অনেক দুঃখ আর কষ্টেভরা জীবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রামের পথে চলছে। শাসকগোষ্ঠীর প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর ঘৃণা ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে। এমনতর অবস্থায় শাসকগোষ্ঠী জুম্মজাতির বিলুপ্তি চায়, আমরা চায় জুম্মজাতির প্রতিষ্ঠা। ধ্বংস আর সৃষ্টি এই দুয়ের মধ্যেকার সংগ্রাম অনিবার্য রুপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় অস্তিত্ব ও জুম্মজাতির ক্রান্তিকালে ছাত্র-তরুণ সমাজের দায়িত্ব কি হবে? এক কথায়; জাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে নিজেকে জাতির উদ্দেশ্যে অর্পন করাই ছাত্র-তরুণ সমাজের পবিত্র দায়িত্ব। ভোগবাদী সমাজের দালালীপনাকে ঘৃণা করে সবত্বত্যাগ স্বীকার করে নেওয়ায় ছাত্র-তরুণ সমাজের সঠিক দায়িত্ব পালন হতে পারে মনে করি। জুম্ম ছাত্র-তরুণরা তাদের সঠিক দায়িত্ব বুঝে নিক এই আমার আহ্বান রইল। তবে স্মরণ করো যে, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের মুক্তি নিজেকেই আনতে হয়।

নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করো; আমি কে? আমার আত্মপরিচয় কি? জুম্ম আদিবাসী নাকি বাঙালী? কোন রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে আমার শরীরে? জুম্ম জাতির এক ফোঁটা রক্ত যদি আমার শরীরে প্রবাহিত হয় তাহলে শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় যুদ্ধকে আমরা কিভাবে মেনে নেবো? যেখানে এক সময় বাপ-জাদার আপনাবাস বিজাতীয় হতে মুক্ত ছিলো সেটা আজ হিংস্র হায়েনাদের হাতে আমরা কিভাবে তুলে দেব? নিশ্চয় সবাই বলবে, না-না আমরা হিংস্র হায়েনাদের হাতে তুলে দিতে পারবো না। তাহলে মানতে না পারলে কি করবে? চুপ করে বসে থাকলে সেটার কোন সমাধান আসবে? উত্তর হবে-না। যেহেতু বৈরি দ্বন্দ্বের সমাধানের সূত্র রাজনৈতিক গ্রামারে ভালভাবে দেওয়া আছে। বৈরি দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসা বৈরি দ্বন্দ্বের মাধ্যমে যথাযথ সমাধান করতে হয়। তাহলে ছাত্র-তরুণদের সেই গ্রামারের সূত্রানুযায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

এবার আসি জেএসএস উচ্চতর আন্দোলনের কথা বলেছেন এবং আমাদের প্রিয়নেতা সন্তু লারমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে জুম্ম জনগণের পক্ষে উচ্চতর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এই ভাষাগুলো ছাত্র-তরুণ প্রজন্মকে অন্তরের গভীরে গিয়ে উপলদ্ধি করতে হবে। বাস্তবে সমস্যা সমাধানের কাজে নেমে পড়তে হবে। প্রবীন, বয়োবৃদ্ধরা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে এখন আর যুদ্ধ করতে পারবে না। তাদের কাছে যা কিছু রয়েছে বুদ্ধি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সেগুলো নিয়েই ছাত্র-তরুণদের সংগ্রামের কাজে লাগাতে হবে। এটা স্পর্শ যে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, নবীনের শক্তি আর প্রবীনের বুদ্ধি দুয়ে মিলে আসবে জুম্মজাতির মুক্তি। নবীনের শক্তি আর প্রবীনের বুদ্ধি ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলে বিজ্ঞানের সূত্রানুযায়ী একটা কিছু তো সৃষ্টি হবে। জাতির জন্যে বিলিয়ে দাও জীবন তাতে জাতির মুক্তি মিলবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য ছাত্র-তরুণ সমাজকে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার উপযুক্ত সময়ের ডাক এসেছে। তাইতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই, কি ভাবছে পাহাড়ী ছাত্র-তরুণ সমাজ? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শোষণ, নিপীড়ণ যেখানেই সেখানেই ছাত্র-তরুণ সমাজ নিজের উদ্যোগে ও অন্যান্য প্রগতিশীল ও সংগ্রামী অংশকে সাথে নিয়ে নিপীড়ণ ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম রচনা করেছে। এটায় তো ছাত্র-তরুণদের যুগের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেননা বারেবারে যেকোন জাতির ক্রান্তিলগ্নে ছাত্র সমাজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের কথা তাই স্মরণযোগ্য। জুম্মজাতির আত্মপরিচয়ের অধিকার, জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের আন্দোলনে ছাত্র-তরুণ সমাজ নিজেকে কতটুকু আত্মোৎসর্গ করার মালমশলা প্রস্তুত করেছে জানিনা। পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলে জুম্মজাতিকে যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করতে হবে। সংগ্রামের জন্য আজ সেই ছাত্র-তরুণ সমাজকে অধিকতর প্রয়োজন। জাতির প্রয়োজনের তাগিদবোধ যারা গভীরভাবে পীড়া অনুভব করবে তারাই অধিকতর আন্দোলনে সামিল হবে, এটায় আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ঐতিহাসিকভাবে জুম্মরা মোঘল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে অধুনা বাংলাদেশ আমলেও জুম্মজাতি বেঁচে থাকার বা টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে কখনো চড়ে যায়নি। এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে চলমান রাখতে হলে দরকার প্রগতিশীল, সংগ্রামী ও ত্যাগী একদল সংঘবদ্ধ ছাত্র-তরুণ সমাজ। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আমরা দেখতে পেয়েছি নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র-তরুণ সমাজরাই। বাংলাদেশের ইতিহাসেও আমরা দেখেছি, সকলক্ষেত্রে ছাত্র সমাজের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। আমরা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে ফিরে তাকায় তাহলে দেখবো যে, মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, পাকিস্তান সরকারের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ছাত্র থাকা অবস্থায় এম এন লারমার লড়াই ও সংগ্রাম, বাংলাদেশ আমলে বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর পার্বত্যাঞ্চলকে নিয়ে নানামূখী ষড়যন্ত্র এবং জুম্ম জাতির নির্মূলীকরণ তথা ইসলামী সম্প্রসারণবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-তরুণ সমাজের প্রতিরোধ সংগ্রাম গর্জে উঠেছিল। তাহলে পার্বত্যাঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম ছাত্র-তরুণ সমাজকে প্রতিরোধ যুদ্ধে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের বিজয়ের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। যেটি বাস্তব সত্য, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার কেড়ে নিতে হয়, নিজের মুক্তি নিজেকে ছিনিয়ে আনতে হয়।

আমি তো জানি কবি সুকান্তের ছাত্র-তরুণদের আহ্বান ও ঠিক তাই-“এই বয়স যেন ভীরু কাপুরুষ নয়, পথ চলতে এই বয়স যায় না থেমে, এই বয়সে তাই নেই কোন সংশয়”। তাহলে ছাত্র-তরুণ সমাজ কোন সংশয়ের মধ্যে পড়ে রয়েছে? দোদুল্যমানতা? সুবিধাবাদীতা? ভোগবাদী সমাজের দালালীপনা? নাকি ভোগবাদী সমাজের ব্যক্তি স্বার্থপরতা? এটায় যদি ছাত্র-তরুণ সমাজের বিকাশের গতিকে রুদ্ধ করে দেয় এবং এর কারণে জুম্মজাতির আন্দোলনের ভিত্তি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে জুম্মজাতির ধ্বংসের অনিবার্য পরিণতি সময়ের দাবী। যা কেউ রোধ করতে পারবে না। তাই ছাত্র-তরুণ সমাজের অগ্রণী দায়িত্ব পালন করতে আবারও ৭০ দশকের জুম্ম ছাত্র-তরুণ সমাজের ন্যায় বর্তমান ছাত্র-তরুণ সমাজের সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আদর্শিক ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান রইল। জুম্মজাতির অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র আন্দোলনের প্রাণ হিসেবে আর্বিভাব ঘটুক জুম্ম ছাত্র-তরুণ সমাজের লড়াই-সংগ্রাম।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা জুম্মজাতি কোনদিনই যুদ্ধবাজ নয়। আমরা যুদ্ধ চায় না, আমরা চায় বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার, আমরা চায় রাজনৈতিক অধিকার। কারণ, রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া জুম্মজাতির মুক্তি মিলবে না। বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আজ আমরা শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চলেছি। শাসকগোষ্ঠী বারেবারে আমাদের সেই যুদ্ধের পরিস্থিতি ও বাস্তবতার দিকে আজ নিয়ে যেতে বাধ্যই করছে। সেকারনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে সরকার কখনোই দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এগিয়ে আসেনি। আরও একটি বিষয় অত্যন্ত জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংস্কারপন্থীরা জুম্ম জনগণের মৌলিক অধিকারের উপর জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করেছিল। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার উলঙ্গভাবে হরণ করেছিল। মানুষ কখন নিজেকে বঞ্চিত মনে করে জানেন? যখন মানুষের ন্যায্য পাওয়ার অধিকার সে পায় না, তখন তিনি নিজেকে খুবই বঞ্চিত মনে করে। সংস্কারপন্থীরা জুম্ম জনগণের উপর ঠিক সেই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে জুম্ম জনতাকে বঞ্চিত করেছিল। তাই এসবের বিরুদ্ধে ছাত্র-তরুণ সমাজকে পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

প্রশ্ন হল এহেন পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় জুম্ম জাতির করণীয় কি হবে? জুম্ম জাতির মধ্যেও ছাত্র-তরুণ সমাজের করণীয় কি হবে? একটা উদাহারণ দিয়ে ছাত্র-তরুণ সমাজকে জানাতে চাই, কোন একটা এলাকায় ঘর-বাড়িতে ব্যাপকভাবে আগুন লেগেছে। এখন আগুন নেবাতে না পারলে এলাকার সকল ঘরবাড়ি পুড়ে ছাঁই হয়ে যাবে। তাহলে সবার আগে কারা সেই আগুন নেবাতে যাবে? নিশ্চয়ই সেই এলাকার ছাত্র-তরুণ সমাজকে সবার আগে এগিয়ে যেতে হবে। কেননা ছাত্র-তরুণ সমাজের মধ্যে শক্তি, সাহস আর অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। ছাত্র-তরুণরাই বন্ধনহীন মুক্তজীবন আর খোলা চোখ নিয়ে তাকায় বলে, তারা সমাজের ভুল-ত্রুটিগুলো সহজে দেখতে পায়। চিহ্নিত করতে পারে সমস্যার কারণ ও সমাধানের উপায়ও খুঁজে বের করতে পারে। লোভ আর স্বার্থপরতার কাছে পরাজিত না হয়ে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করতে পারে ছাত্র-তরুণ সমাজ। ছাত্র-তরুণ সমাজ মানেই সংঘবদ্ধ একটা শক্তি। এই সংঘবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জুম্মজাতির মুক্তি অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে প্রচলিত ধারার নষ্ট রাজনীতি কখনো কখনো ছাত্র-তরুণ সমাজকে ব্যবহার করে জুম্মলীগ, জুম্ম রাজাকারের দল সংস্কারপন্থীরা তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। জুম্মজাতির অস্তিত্বকে বিকিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাদের স্মরণে আসে না, জাতীয় বেঈমান বিশ্বাসঘাতকদের জুম্মজাতি কখনো ক্ষমা করেনি, করবেও না। এইসব প্রতিক্রিয়াশীলদের নষ্ট রাজনীতির কারণে গোটা জুম্মজাতি অবর্ননীয় দুঃখ, কষ্ট ভোগ করছে। এই বিষয়গুলো ছাত্র-তরুণ সমাজকে বৃহত্তর আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে। কলুষিত করছে ছাত্র-তরুণ সমাজের ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত ঐতিহ্যকে। ছাত্র-তরুণ সমাজের গৌরবময় ঐতিহ্য রক্ষা করার স্বার্থে এই নষ্ট রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। ছাত্র-তরুণ সমাজকে জুম্মজাতির সামগ্রিক স্বার্থেই এগিয়ে এসে কাজ করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম ছাত্র-তরুণেরা এক একজন বীরযোদ্ধা। যেই বীরযোদ্ধারা অন্যায়ের কাছে কখনোই আপোষ করবে না। ছাত্র-তরুণ সমাজের সব সময় যেন মনে হয় এবং এক অদ্ভূত অনুভূতি কাজ করতে হবে, আমি যেন তীব্র জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত একদল তরুণ-ছাত্র সমাজের মধ্যে বাস করছি। “ইতিহাসের বিচিত্র ছকের ফলে আজ ক্রিকেট খেলা ও ফুটবল খেলা, প্রেম-ভালবাসা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডার আসর প্রভৃতি যা অন্য দেশের ছাত্র-তরুণদের কাছে প্রধান আকর্ষণ হলেও তার চেয়ে এই সংগ্রামী জীবনই যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র-তরুণ সমাজের কাছে বেশি জরুরি বলে মনে করি”। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা তাই দাবি রাখে।

পুরনো সমাজকে পাল্টে দিয়ে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-তরুণ সমাজকে সংগ্রামে সামিল করা একটি মহান কর্তব্য। কিন্তু এ কর্তব্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এজন্য প্রয়োজন হয় জটিল, দীর্ঘকালীন ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের। শক্তি-সমর্থ মানুষেরাই মাত্র কাঁধে বোঝা নিয়ে দীর্ঘ পথকে পাড়ি দিতে সক্ষম। একজন সংগ্রামীকে অবশ্যই নৈতিকতার ওপর আস্থা রাখতে হয় এবং তা থেকেই শক্তি সংগ্রহ করতে হয়। কেবলমাত্র তখনই সে তার গৌরবোজ্জ্বল জাতীয় কর্তব্য পূরণে সক্ষম হবে। আমাদের নিজেদের অবশ্যই বদলাতে হবে। সক্রেটিস বলেছিলেন, know thyself-নিজেকে জানুন। নিজেকে জেনে, নিজেকে বদলাতে হবে। নিজের সমাজ ব্যবস্থাকে জেনে, নিজের সমাজব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে। পুরনো সমাজের মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি। উত্তরাধিকার সূত্রে পুরনো সমাজ থেকে আমরা যা পেয়েছি তার ভেতর সবচাইতে বিরূপ ও বিপজ্জনক হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ। নৈতিক-মূল্যবোধের নিরিখে ব্যক্তিস্বাতন্তবাদ হলো অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি প্রবণতা। এই ‘বাদ’ যদি চলতেই থাকে, এমনকি যদি খুব সামান্য পরিমাণেও চলতে থাকে, তবে তা সামান্যতম খোঁচানি পেলেই বেড়ে উঠতে পারে, নৈতিক গুণাবলিকে দমিয়ে দিতে পারে এবং সংগ্রামের জন্য পরিপূর্ণভাবে আত্ম-নিয়োগের প্রয়াস থেকে সংগ্রামী সহযোদ্ধাদের বিরত রাখতে পারে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ নিজেই বেশ অনিষ্টকারী এবং তা কপটতাকেও প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফলে মানুষ স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, অসামাজিক ও সংকীর্ণচিত্ত হয়ে পড়ে। কাজেই মানুষের স্বাধীন বিকাশের প্রয়োজন যেমনি থাকা চায়, তেমনি মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের সঙ্গে সমাজের পারস্পরিক দায়দায়িত্ব অপরিহার্য। সামাজিক সম্পর্কের ফলে মানুষকে জানা যায়। প্রকৃত নৈতিক গুণাবলি আত্মস্থ করতে হলে প্রয়োজন অনুশীলনের, নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তোলার ও নিজেদেরকে বদলে ফেলার, যা আমাদের অক্লান্তভাবে এগিয়ে চলতে যোগ্য করে তুলবে। কেউ যদি অগ্রসর হতে না চায় তবে সে অনিবার্যভাবেই পিছিয়ে পড়বে। ছাত্র-তরুণ সমাজকে ঠিক সেভাবে এগিয়ে এসে সমাজে ছাত্র-তরুণ সমাজের নৈতিক অধঃপতন রোধ করতে হবে। জুম্মজাতির ক্রান্তিলগ্নে নিজেদের পুরোভাগে মেলে ধরতে হবে। জয় হোক মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা উপলদ্ধি, অনুধাবণ করে ছাত্র সমাজের করণীয় নির্ধারণ হোক এটায় প্রত্যাশা করছি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of