কেমন আছে বাঙলাদেশ?

গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা যে কোন দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দুর্বৃ্ত্তরা যে কাজটি সবসময় করে থাকে তা হচ্ছে, প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠ রোধ করা, তাদেরকে হেনস্থা করা, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা। ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে মনীষার সাথে যা কিছু করা হয়েছিল, তাকে আমরা ধরে নিতে পারি অগনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের রুটিন কাজ। কিন্তু মনীষার পরিবারের সাথে এই বিজয়ের মাসে যা ঘটে গেল, তা বাঙালি জাতির জন্যে দারুণ লজ্জার। ১৯৭১ এ মনীষার পরিজনদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল এবং সে কারণে মনীষার বাবা এবং দাদীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০২ সালে। গেজেট আকারে প্রকাশিত সেই সত্যকে ডিঙিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার জন্যে মনীষার বাবা ও দাদীকে রাজাকার হিসেবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হল ২০১৯ এর ডিসেম্বরে(!), এই উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যের সংযোজন জাতি হিসেবে আমাদের জন্যে ভাষাহীনভাবে লজ্জার। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এসে কী করে রাজাকার হয়?
গায়ের জোরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রকারী দুর্বৃত্তরা যে কী পরিমাণ দেওলিয়া হয়ে গেছে, কতটা নীচে নেমে গেছে, কত বেশি করে অযোগ্য-অথর্ব দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে, তা এই ঘটনার পর আর কোন উদাহরণের প্রয়োজন নেই। এই সব দুর্বৃত্তদের মুখ-নি:সৃত অহংকারের সমস্ত স্বর আজ সম্পূর্ণভাবে ধুলোতে গড়ায়।

ফেইসবুকে ডা. মনীষা চক্রবর্তী আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করার পুরস্কার পেলাম আজ। ধন্যবাদ আওয়ামী লীগকে। সদ্য প্রকাশিত রাজাকারদের গেজেটে আমার বাবা এবং ঠাকুমার নাম প্রকাশিত হয়েছে। আমার বাবা এড. তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা,ক্রমিক নং ১১২ পৃষ্টা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও পেয়ে থাকেন! আজ রাজাকারের তালিকায় তিনি ৬৫ নাম্বার রাজাকার’ !

হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রীপরিষদ একের পর এক যেসব ক্ষমার অযোগ্য ভুল করে যাচ্ছেন; সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার হিসেবে সরাকারিভাবে তালিকাভুক্ত করা, এইসবকিছুই বাঙলাদেশের জন্ম এবং লাল সবুজের ইতিহাসের সাথে চূড়ান্ত ধৃষ্টতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা! গনমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কোন পদক্ষেপ নেয় নি হাসিনা সরকার; বরং দায় এড়ানোর চেষ্টা, জাতীয়ভাবে ইতরকর্ম আড়াল করার চেষ্টা হাসিনা সরকারকে করেছে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে বছরের পর বছর ধরে তারা প্রচুর হইচই করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ২০১৯ এর আওয়ামীলীগ দারুণভাবে দূষিত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বাঙলার বুকে আজ আবির্ভূত।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ১৫ ই ডিসেম্বর যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজাকারদের নাম-পরিচয় নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্যই তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ হ্যাঁ, জনরোষে স্থগিত হওয়ার আগেই নতুন প্রজন্ম রাজাকারের সে তালিকা হাতে পেয়েছে, তারা জানতে পেরেছে, হাসিনা-সরকার কর্তৃক প্রকাশিত রাজাকারের সরকারি তালিকায় মুজাহিদ, নিজামী, সাকার নাম নেই; বরং রাজনীতির মাঠের প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছেন রাজাকার!

হাসিনা-সরকারের অযোগ্য, অথর্ব, মন্ত্রীপরিষদ বাঙলাদেশ এবং দেশের গৌরবের ইতিহাসের জন্যে ক্ষতিকর; এর ফলাফল হবে দীর্ঘমেয়াদী। গায়ের জোরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা এদেরকে করে তুলবে আরোও বেশি করে দুর্ধর্ষ, ভয়ংকর ও হিংস্র। আজকে আমরা ঐ অগনতান্ত্রিক দুর্বৃত্তদের একের পর এক যেসব জঘণ্য ইতর কর্ম দেখতে পাচ্ছি, তা বাঙলাদেশের ইতিহাসের গৌরবকে ছাপিয়ে হতাশার, আনন্দকে ছাপিয়ে যন্ত্রনার।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 2 =