যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে যুদ্ধের ব্যাপারে বিভ্রান্ত করা হয়েছে : আফগান পেপার্স

‘লেসন লার্নড’ নামে এক প্রকল্পের আওতায় আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সেনা ও অন্যান্যদের কয়েক শ’ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান। দুই হাজার পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন তৈরি করেছিল স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকন্সট্রাকশান (সিগার) অফিস। কিন্তু সরকার তা প্রকাশে বাধ সাধে। চলে তিন বছরের আইনি লড়াই। অবশেষে আদালতের রায় পক্ষে এলে এখন এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ প্রকাশ করছে ওয়াশিংটন পোস্ট। এই ডকুমেন্টকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে ‘আফগাস পেপার্স’ নামে। আফগান যুদ্ধের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এসব গোপন সাক্ষাৎকার থেকে দেখা গেছে যে, জেতার অযোগ্য এই যুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন জনগণকে সবসময় বিভ্রান্ত করা হয়েছে।

সিগারের প্রধান দায়িত্ব হলো মার্কিন যুদ্ধ প্রচেষ্টা থেকে দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে দূর করা। দুই হাজার পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে যুদ্ধের ব্যাপারে ভেতরের বহু মানুষের মতামত উঠে এসেছে, যে যুদ্ধে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যায় হয়েছে এবং দুই হাজার তিনশরও বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে বিশ হাজারেরও বেশি। এই ডকুমেন্ট অনেকটাই পেন্টাগন পেপার্সের মতো। পেন্টাগন পেপার্স ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের গোপন ইতিহাস, যেটা ১৯৭১ সালে ফাঁস হয়ে যায়। সেখানেও দেখা গেছে সামরিক ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল।

এই সাক্ষাৎকারগুলো নেয়া হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। আফগানিস্তানে গৃহীত নীতির ব্যর্থতা থেকে কি শেখার আছে, সে ব্যাপারে সিগারের নিয়মিত অডিটের পাশাপাশি এই সাক্ষাৎকারগুলো নেয়া হয়েছিল। সিগারের প্রধান জন সোপকো বলেছেন যে, এই ডকুমেন্টগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ‘আমেরিকান জনগণকে সবসময় মিথ্যা বলা হয়েছে’। ডকুমেন্টে দুটো বড় যে দাবি করা হয়েছে, তার একটি হলো মার্কিন কর্মকর্তারা বিভিন্ন পরিসংখ্যান বদলে দিয়েছেন যাতে আমেরিকান জনগণকে এটা বোঝানো যায় যে, আমরা যুদ্ধে জয়ী হচ্ছি এবং বিভিন্ন সরকার আফগান কর্মকর্তাদের ব্যাপক দুর্নীতির ব্যাপারে সবসময় চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ফলে তারা মার্কিন সহায়তার অর্থ অবাধে লুটপাটের সুযোগ পেয়েছে।

বুশ ও ওবামা প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউজে আফগান যুদ্ধের জার হিসেবে কাজ করেছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাম লিউট। তিনি ২০১৫ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আফগানিস্তানের ব্যাপারে মৌলিক জ্ঞান থেকেই আমাদেরকে দূরে রাখা হয়েছিল। আমরা জানতামই না যে, সেখানে আমরা কি করছি’। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের জঙ্গিদমন বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বব ক্রাউলি। তিনি বলেন, ‘একটা ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার জন্য প্রতিটি তথ্য বিকৃত করা হয়েছে’।

ট্রাম্প প্রশাসন আর তালেবানদের মধ্যে এখন আলোচনা চলছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক চলছে যে আফগানিস্তান থেকে ১৩ হাজার সেনা প্রত্যাহার করা হবে কিনা। প্রায় নিশ্চিত চুক্তি চ‚ড়ান্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তালেবানদের সাথে আলোচনা বাতিল ঘোষণা করার পর নতুন করে আলোচনা শুরুর অংশ হিসেবে ৭ ডিসেম্বর আফগানিস্তানের তালেবানদের সাথে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেছেন মার্কিন বিশেষ দূত জালমাই খলিলজাদ।

যুক্তরাষ্ট্রের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনায় প্রাথমিক পর্যায়ে সহিংসতা কমানোর জন্য তালেবানদের প্রতিশ্রæতির উপর জোর দেয়া হবে এবং স্থায়ী অস্ত্রবিরতি হবে মূল লক্ষ্য। একইসাথে বিভিন্ন আফগান পক্ষের মধ্যে যাতে আলোচনা হতে পারে, সেজন্যেও ভিত্তি প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন খলিলজাদ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে তালেবানদের রাজনৈতিক অফিস রয়েছে। আফগানিস্তান বিষয়ক ন্যাটোর সিনিয়র সিভিলিয়ান প্রতিনিধি নিকোলাস কেই লন্ডনে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের জানান, এবার আফগানিস্তান শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে একটা ‘জোরালো আঞ্চলিক ঐক্যমত তৈরি হয়েছে’। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘২০২০ সালটি শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সুযোগ। কিন্তু আমাদেরকে বাস্তববাদী হতে হবে। ২০ বছর যুদ্ধের পর শান্তি আনতে সময় লাগবে। শান্তির পথে হয়তো আরও সহিংসতা আর হতাশা পার হতে হবে’।

এটা প্রায় সকলেই স্বীকার করছে যে, আফগান শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে যে ঐক্যমত তৈরি হয়েছে, সেটা ‘নজিরবিহীন’। তবে সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। এ অবস্থায় তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার বাইরে খুব ভালো কোনো চুক্তির জন্য বেশি সময় দিতে পারছে না। ফলে চুক্তি আজ বা কাল হবে, কিন্তু তার মাধ্যমে টেকসই শান্তি আসে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের হাতে আংশিক বা পূর্ণ যে কায়দাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করুক, বর্তমান ক্ষমতাভোগীদের সঙ্গে তাদের দ্ব›দ্ব তাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। ফলে আফগানিস্তানে গড়ে ওঠা মার্কিন ও ব্রিটিশ অনুসারীরা একাংশ দ্রæতই ভোল পাল্টাবে এবং অন্য অংশ মার খাবে।

আফগান পেপার্সের এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে। এমনকি আফগানিস্তানে যুদ্ধাপরাধ সংগঠনের বিষয়ে যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটাও একই কাতারের ব্যাপারের। আসেব অভিযোগ আমলে নিয়ে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আফগান, মার্কিন ও ব্রিটিশ অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হলে এটা তালেবানকেও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার রাস্তা খুলে দেবে। ন্যাটোবাহিনী ও তার মিত্রদের বিচার করা হলে আফগানিস্তানে শান্তির স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হবে। এটা সেখান থেকে পশ্চিমা বিদ্বেষ দূরীকরণেও ভ‚মিকা রাখবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 1