নতুন আশার ঐক্য : আবুল হাসান রুবেল

(প্রায় ৩ বছর আগের লেখা)
গত ১৪ মে একত্রিতভাবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি। ২০০৩ সাল থেকে চার বাম দল, পাঁচ বাম দল ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চায় একসঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের ধারায় মতাদর্শিকভাবে কাছাকাছি আসে এই দুই দল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মতাদর্শিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনকে তাদের কাজের অংশ মনে করে দল দুটি। সে কারণেই তাদের এই ঐক্যকে পুনর্গঠন কাজের অংশ মনে করেছেন গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। জনগণের স্বপ্ন সত্যে পরিণত করতে হলে এদেশে কমিউনিস্ট শক্তিগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাদের সেই ভূমিকা নিতে হলে এই আন্দোলনকে বদল করতে হবে ভেতর থেকেই। তার সুবিধাবাদী কিংবা লেজুড়বৃত্তির প্রবণতা অথবা হঠকারিতা শুধু নয়, সঠিক রণকৌশলের অভাবে রণনীতির সঠিকতার অকার্যকর হয়ে পড়া, আবার রণকৌশলকেই রণনীতি করে তোলার মাধ্যমে সংগ্রামকে বেপথু করার যে চর্চা, সে বিষয়ে এই দুই দলই সোচ্চার বহুদিন ধরে। বিশেষত শ্রেণী সংগ্রামের ধারায় তার মূর্ত নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কর্তব্য নির্ধারণে বাংলাদেশ ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত যে ১৯৪৭ ও ‘৭১-এ দুটি বড় পট পরিবর্তনে কমিউনিস্টদের যথার্থ ভূমিকা রাখাকে বাধাগ্রস্ত করেছে_সেই উপলব্ধিও এই দুই দলের রয়েছে। বর্তমান বিশ্বায়নের কালে সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদের সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যে পুনরূপনিবেশিকরণের সূচনা করেছে সেগুলো বিষয়ে তত্ত্বগত বোঝাপড়া ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের বর্তমান বিপ্লবের জাতীয় চরিত্র বিষয়ে উপলব্ধির গভীরতা এই দলের ঐক্যে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই দুই দলের ঐক্য এসেছে গণসংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, কেবল দলিল চালাচালির মাধ্যমে নয়।
গণসংহতি আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির এই ঐক্যের পর ঐক্যবদ্ধ শক্তি গণসংহতি আন্দোলন নামেই তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাবেক সভাপতি বর্তমান গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুস সালামকে এই ঐক্যের তাৎপর্য বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, ‘আশা করি, এই ঐক্য আরো ঐক্যের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। কেননা এই ঐক্যকে কমিউনিস্ট আন্দোলন পুনর্গঠনের বৃহত্তর কাজের অংশ হিসেবেই দেখি। এই ঐক্যের ফলে আরো শক্তিশালীভাবে আমরা বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম ও বামপন্থী আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে পারব বলে আশা করি।’ ১৯৬৫ সাল থেকেই সক্রিয় এই নেতা প্রথমে মাইতি গ্রুপ হিসেবে পরিচিত গ্রুপের সংগঠক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে ও স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে রাজশাহী অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ভূমিহীন জনগণের খাস জমি উদ্ধারে ও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৯৬ সাল থেকে গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির গঠন প্রক্রিয়া থেকেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলন গড়ে ওঠে একদল তরুণ ছাত্র, শ্রমিকের সংগ্রামের অভিজ্ঞতায়। ২০০২ সালে ছাত্র ফেডারেশন, বাংলাদেশ বহুমুখী শ্রমজীবী ও হকার সমিতি এবং সূচনা অধ্যয়ন ও অনুশীলন কেন্দ্রের একদল তরুণ, প্রত্যয়ী, সংগ্রামে একনিষ্ঠ কর্মীদের নিয়ে গঠিত হয় গণসংহতি আন্দোলন। গণসংহতি আন্দোলন তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, ফুলবাড়ীসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে তাদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এখন দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ৯০ দশকের ছাত্রনেতা জোনায়েদ সাকি। ঐক্যবদ্ধ গণসংহতি আন্দোলনেরও তিনি প্রধান সমন্বয়কারী। এই ঐক্য বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের জীবন ও সম্পদের ওপর এখন যে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য কায়েম রয়েছে, তাতে এখন আমাদের জাতীয় অস্তিত্বই বিপন্ন। এ অবস্থায় এ দেশের দেশবিক্রিকারী বিশ্বাসঘাতক শাসকশ্রেণীর কাছ থেকে আর আশা করার কিছু নেই। এই ঐক্য তাই আমাদের কাছে, এ অবস্থা অবসানে জনগণের যে ঐক্য দরকার তারই একটি পদক্ষেপ মাত্র। আমরা এই ঐক্যকে জনগণের ঐক্য সাধনে যতটুকু কাজে লাগাতে পারব ততটুকুই এর সার্থকতা। এ জন্য আমরা অপরাপর সব জনগণের পক্ষের শক্তির ঐক্য কামনা করি।

আবুল হাসান রুবেল : কেন্দ্রীয় নেতা, গণসংহতি আন্দোলন
সমন্বয়ক, প্রতিবেশ আন্দোলন ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “নতুন আশার ঐক্য : আবুল হাসান রুবেল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 + = 22