চীন-ভারতের মাঝে ভারসাম্যের লড়াইয়ে নেপাল

গত অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেপাল সফর ও সেই সময় সই হওয়া বেশ কয়েকটি চুক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুততার সাথে আরো উন্নত করার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীন ও নেপালের মধ্যে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি ওই দুই দেশ ছাড়াও ভারত ও প্রতিবেশি দেশগুলোতে আলোড়ন তুলেছে। মাও সেতুঙ ও রাজা বিরেন্দ্র ১৯৭৩ সালে প্রথম এ বিষয়টি নিয়ে প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন। এর পর কয়েক দশক ধরে বহু ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও স্বপ্নটা শেষ অবধি টিকে গেছে।

এর মধ্যে বিরেন্দ্রকে তার নিজের ছেলে ও উত্তরসূরি গুলি করে হত্যা করেছে, নেপালে মাওবাদী উত্থান হয়েছে, এক যুগ ধরে গৃহযুদ্ধ হয়েছে, এবং ভয়াবহ ভ‚মিকম্পে ৯০০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং কাঠমান্ডুর প্রতীকী স্মৃতিচিহ্নগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ভারতের সাথে পাঁচ মাসের দীর্ঘ অবরোধ সহ্য করতে হয়েছে নেপালকে। ৪৫ বছর পর চীন যখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য নতুন অধ্যায় খুলতে শুরু করেছে এবং নেপাল ভারতের প্রভাবের বিকল্প খুঁজছে, সেই মুহূর্তে নক্ষত্রগুলো আবার একই সারিতে এসেছে এবং সেই প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, যেটা দীর্ঘদিন ধরে অসম্ভব বিবেচনা করে আসা হয়েছে।

এই ভিশন কার্যকর করা হবে মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং। প্রকৌশলীদেরকে ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলওয়ে নির্মাণ করতে হবে যেটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪০০ মিটার থেকে ৪০০০ মিটার উঁচু দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। এটা নির্মাণ করাটাই একটা মারাত্মক কঠিন কাজ। হিমালয় অঞ্চলের ভেতর দিয়ে নির্মিত যে কোন রুটেই ভূমিধস আর ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকবে। এক হিসেবে দেখা গেছে এই রেললাইনের প্রায় ৯৮ শতাংশ জুড়ে থাকবে টানেল আর ব্রিজ।

এরপর রয়েছে খরচ। প্রাথমিক হিসেবে, যেটা এখনও সুনির্দিষ্ট নয়, সেখানে দেখা গেছে, এই রেলওয়েতে ব্যয় হবে ৩ বিলিয়ন ডলার। নেপাল এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে, তাদের জিডিপি ২৮ বিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি। চীনের সহায়তায় তা সেটা কোমল ঋণ, অনুদান বা অন্য যে কোন ভাবেই হোক, যদি এই রেলওয়ে প্রকল্পটি নির্মিত হয়, তাহলে নেপাল অনেকটাই ঋণের চাপে পড়বে, বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের সমালোচকরা যে অভিযোগ করে আসছে। ফলে বেইজিংয়ের চাপের কাছে চরম অসহায় হয়ে পড়বে নেপাল।

নেপালের স্থানীয়রা অবশ্য দেশের জোড়াতালি দেয়া সড়ক আর বিমান নেটওয়ার্কের সমালোচনা করে আসছেন। তারা এই রেলওয়েকে একটা সম্ভাব্য প্রাণসঞ্চারণকারী সুযোগ হিসেবে দেখছেন। যা দেশকে ভারতের বাণিজ্য রুটের উপর নির্ভর করার হাত থেকে মুক্তি দেবে। অন্যদিকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পার্বত্য এলাকা দিয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড নির্মাণের বিষয়টিকে বেইজিং ভূরাজনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি সেই দৃষ্টিতে দেখছে, ১৯৭৯ সালে কারাকোরাম হাইওয়েকে যে দৃষ্টিতে দেখা হয়েছিল।

এই শতাব্দিতে প্রথমবারের মতো চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেপাল সফরে আসার পর শি জিনপিং ঘোষণা দেন, আমরা বহুমুখী ট্রান্স-হিমালয়ান সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করবো এবং নেপালকে তাদের স্বপ্ন পূরণ ও নিজেদের স্থলবেষ্টিত অবস্থাকে স্থল-সংযুক্ত অবস্থায় রূপান্তরিত করতে সাহায্য করব। তার সেই ঘোষণা নিয়ে নেপালে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে বড় উদ্বেগ ভারতকে নিয়ে। ভারত যদি বিরোধী অবস্থানে যায় নেপালের জন্য তা অকল্যাণকর।

গেল সপ্তাহের শেষ দিকে নেপালের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও এক সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব তাদের দেশ ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুস্প কমল দাহাল ওরফে প্রচন্ড উভয় দেশের সাথে সমান মর্যাদায় ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের আহবান জানান। আর দ্বিতীয়জন এম কে রাসগোত্রা তার দেশকে আশ্বস্ত করে বলেন, চীন-নেপাল সম্পর্ক নিয়ে সাধারণভাবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

প্রচন্ড তার অভিমতে বলেন, চীন-ভারত প্লাস বা ২+১ ধারণা চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে সমান হিস্যার কথা বলেন না। এ কারণেই নতুন ফরম্যাটের প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার বিরোধী নন। তিনি কেবল তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আরো সুষ্ঠু ব্যবস্থা কামনা করেন। আর রাসগোত্রা তার ভবিষ্যত চীন-নেপাল রেলওয়ে সরনাথ ও গয়া দিয়ে ব্যাঙ্গালোর ও হায়দরাবাদ পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং তা এমনটি পশ্চিম উপক‚ল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক একীভূত হওয়ার স্বপ্নের কথা বলেন।

চীন ও নেপালের মধ্যকার বিনিয়োগ সহযোগিতার ফলে একটি আন্তর্জাতিক রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সৃষ্টি করতে পারে। আর তা শেষ পর্যন্ত ভারতকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ভূবেষ্টিত নেপালকে চীন-ভারত সহযোগিতার বন্ধনে পরিণত করতে পারে। এটা তিন দেশের মধ্যে ত্রিদেশীয় অংশীদারিত্বের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে তিন দেশ তাদের অর্থনৈতিক ও ক‚টনৈতিক সম্পদ বিনিয়োগ করতে পারে এটি অর্জন করতে। কারণ এটি তিন দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।

নেপাল তুলনামূলক ছোট হলেও দুই বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলে তার অনেক বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্রিকস ও এসসিওর সদস্য চীন ও ভারত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নেপালকে নিয়ে সহযোগিতার দিগন্ত সম্প্রসারিত করতে পারে। চীন-নেপাল-ভারত রেল করিডোর (যাকে হিমালয় সিল্ক রোড নামে অভিহিত করা হয়) সফলভাবে নির্মিত হলে সেটা বাংলাদেশকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে আরো সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। আর এটি বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হতে পারে।

ভবিষ্যতে হিমালয় সিল্ক রোড বিসিআইএমের সাথে সংযুক্ত হয়ে নতুন একটি মেগা প্রকল্পে রূপান্তরিত হওয়াটা অসম্ভব হবে না। হিমালয় সিল্ক রোডে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এটিকে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-নেপাল (বিসিআইএন) করিডোরে পরিণত করতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে উন্নয়ন করার আকাঙ্ক্ষা এবং সেগুলোকে আসিয়ান দেশ মিয়ানমারে প্রবেশের দরজা হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করলে বলা যায়, ভারত বিসিআইএমকে কাজে লাগিয়ে তার ওই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে পারে সহজেই। একে বলা যেতে পারে ‘এশিয়ান রিং’।

ভারত যদি নেপাল হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য করার সুবিধা উপলব্ধি করতে পারে, তবে সে স্বাভাবিকভাবেই সে তখন মিয়ানমারকেও সংযুক্ত করতে চাইবে। ফলে নেপাল চীন-ভারত সহযোগিতার যোগসূত্রে পরিণত হতে পারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 1 = 9