ছাত্র আন্দোলন কি পারবে ভারতকে পথ দেখাতে?

ভারতবর্ষের রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিই ছিল গত শতকের ষাট দশকের তীব্র ছাত্র আন্দোলন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে ছাত্রদের হাত ধরে। এরপর সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একের পর এক ছাত্র আন্দোলন চলতে থাকলে বাংলাদেশে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবেদন তলানিতে এসে পৌঁছায়। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালেও ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনের মূল কারিগরও ছিল ছাত্ররাই। কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন এত ব্যাপকতা লাভ করলেও আশেপাশের দেশগুলোতে ততটা ঘটেনি। তবে সম্প্রতি ভারতে ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক প্রচেষ্টাকে ছাড়িয়ে গেছে।

ভারতের যে বিতর্কিত আইনটি প্রতিবেশী তিনটি রাষ্ট্রের অমুসলিমদের নাগরিকত্বের সুযোগ দিচ্ছে, সেই আইনটির প্রতিবাদে গত কয়েকদিন সারা ভারতজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা প্রতিবাদ করছে, কারণ তারা অনুভব করছে যে এই ‘নাগরিকত্ব সংশোধন আইন’ পক্ষপাতমূলক এবং ভারতের কুড়ি কোটি মুসলমান সংখ্যালঘুকে কোণঠাসা করে ফেলবার একটি হিন্দু-জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, নতুন আইনটি ‘তাদের জন্য যারা বছরের পর বছর নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে এবং ভারত ছাড়া আর কোথায় তাদের যাবার জায়গা নেই’। দিল্লি এবং উত্তরাঞ্চলীয় আলীগড় শহরের দুটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে পুলিশের হামলা হয়েছে, এমন অভিযোগের জেরে ভারত জুড়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসগুলোর ভেতরে পুলিশ ঢুকে পড়ে এবং অভিযোগ আছে লাইব্রেরি, পাঠকক্ষ, এমনকি টয়লেটে ঢুকে পর্যন্ত তারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

ওই সহিংসতার এমন সব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যা রীতিমত পীড়াদায়ক। দেশজুড়ে ছাত্রদের উত্তেজিত হওয়ার পেছনে এই ভিডিওগুলিও জ্বালানী হিসেবে কাজ করেছে। ছাত্র এবং শিক্ষকেরা একেবারেই ছেড়ে কথা বলছে না। ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটি, অশোকা ইউনিভার্সিটি কঠোর ভাষায় এক বিবৃতি দিয়েছে যেখানে লেখা হয়েছে ‘রাষ্ট্রের স্পন্সর করা সহিংসতা’। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া ভারতের সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘ছাত্রদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে’।

একটি ভিডিওতে আইনের এক ছাত্র প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা কি আদৌ কোন গণতন্ত্রে বাস করছি?’ মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার বরাবরই ভিন্নমত পোষণকারীদের ভালো চোখে দেখে না এবং এটা এখন স্পষ্ট যে ছাত্রদের এখন সমস্যার উৎস হিসেবেই দেখছে সরকার। কিন্তু চলমান ছাত্র জাগরণ আমাদেরকে এমন একটি দেশের জনগণের মানসিকতা সম্পর্কে কিছু বার্তা দিচ্ছে, যে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স পঁচিশের কম। একটি হলো, মুসলমান ছাত্রদের সংগে প্রতিবাদে অন্য এমন সব সম্প্রদায়ের সদস্যরাও যোগ দিচ্ছে যাদের ওপর এই আনটি সরাসরি কোন প্রভাব ফেলবে না। বিশ্লেষক আজায আশরাফ বলছেন, এই বিক্ষোভ ‘ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল ভারতীয়র সেই লালিত আদর্শকে পুনরুত্থিত করেছে, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে।’

দ্বিতীয়ত, কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার, নাগরিক পঞ্জি, হামলার লক্ষে পরিণত হওয়া এবং রাজনীতিতে গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার মতো কিছু ধারাবাহিক বিপত্তিকর ঘটনাপ্রবাহের পর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মুসলামনরা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, মোদীর সরকারের অধীনে এই মুসলমানেরা নানাভাবেই প্রায় ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে পড়ছেন। মি. আশরাফ বলছেন, ‘এই ছাত্র বিক্ষোভ মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনকে একটি সন্ধিক্ষণ এনে দিয়েছে।’

আরও যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বিক্ষোভ ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসগুলোতে যা যেগুলো প্রথাগতভাবে প্রতিবাদ বা আন্দোলনের বাইরেই ছিলো। এটা আসলে প্রমাণ করে যে আইন নিয়ে ক্ষোভ মিশে গেছে ধূসর অর্থনীতি আর চাকরীর অভাবজনিত অসন্তোষের সাথে। তরুণ ভারতীয়রা বেড়ে উঠছে উচ্চাশা আর হতাশার সাথে। তারা মনে করে সরকারের উচিত দেশে বিভক্তি তৈরি করে এ ধরণের বিতর্কিত আইন না করে বরং অর্থনীতির ধীরগতির সমাধানে মনোযোগী হওয়া। অবাক ব্যাপার হলো সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকের কণ্ঠেও এখন এ ধরণের একই সুর দেখা যাচ্ছে।

ঔপন্যাসিক চেতন ভগত, যিনি মোদীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত, তিনি এবারের পুলিশী অ্যাকশনের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। যারা ভারতকে নিয়ে হিন্দু রাজা ও তার সভাসদদের নিজে ফ্যান্টাসি দেখেন এটা মনে রাখুন, এমনকি আমি অসিহষ্ণুতার সমর্থকও (যা আমি নই) হই তাহলে আপন বিশ কোটি মুসলিমকে দুরে সরাতে পারবেন না। চেষ্টা করে দেখুন, ভারত পুড়ে যাবে। জিডিপি ধসে পড়বে এবং আপনার সন্তানেরাই অনিরাপদ ও চাকুরিহারা হবে। এসব ফ্যান্টাসি বন্ধ করুন।’

ভারতের ইতিহাসে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থনের অভাবে ছাত্র আন্দোলনগুলো সফল হয়নি এবং এবারেও হয়তো তার সাথে পার্থক্য হবে না। ধীরে বা দ্রুতই ছাত্রদের ক্লাসে ফিরতে হবে, পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে। তবে এ দফায় ছাত্রদের আরো কর্তব্য পালনের দায়িত্ব রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকে স্পষ্ট দিশা নেই কোথাও। আর এ শূন্যতার কারণেই ছাত্ররা এবার এই আন্দোলনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

আন্দোলনের কর্তৃত্ব এখন যদিও বিরোধী দলগুলোর নেয়ার কথা, কিন্তু দলগুলো বিভক্ত। এমনকি আঞ্চলিক রাজনৈতিক তারকারাও মনে হয় ক্লান্ত ও ধরাছোঁয়ার বাইরে। একমাত্র সর্বভারতীয় দল কংগ্রেস প্রাসঙ্গিক থাকার লড়াই করছে। অনেকের বিশ্বাস, বিরোধী দলগুলো বর্তমান অবস্থাটাই ধরে রাখতে চান, পরিবর্তনে তারা আগ্রহী নয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মোদিকে বিরোধিতার স্বার্থে সক্রিয় হলেও তারাও আসলে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে নয়। ফলে ভারতের সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইকে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ছাত্র সমাজের সামনে এসেছে। সেই দায়িত্ব তারা কতটা পালন করতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স পঁচিশের কম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 5 =