পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত

পাকিস্তানে বহুকাল ধরেই বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর সু সম্পর্ক চর্চিত হচ্ছে। অন্তত গত দুই দশক ধরে দুই বিভাগের এই সহযাত্রা ছিল অনেকটা নিষ্কণ্টক। ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবরের অভ্যুত্থানকে বৈধতা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এক রায় দেয়ার পর থেকেই বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বেশ মজবুত। কিন্তু সম্প্রতি জেনারেল পারভেজ মোশাররফের মৃত্যুদন্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ যেন সেই সম্পর্কের যাত্রা বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আর এটাকেই দেখা হচ্ছে দেশটির রাজনীতিতে নতুন গুণগত এক পরিবর্তন হিসেবে।

সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ ২০০৭ সালের ৩ নভেম্বর যে অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, চলতি বছরের ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ মামলার রায় দিয়েছেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গঠিত বিশেষ আদালত। এই রায়ের মাধ্যমে একটা মাইলফলক অর্জিত হয়েছে এবং আগের অন্যান্য বিভিন্ন শক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে ঘোষণা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে জাফর আলী শাহ মামলায় ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবরের অভ্যুত্থানই শুধু বৈধতায় পায়নি, বরং ওই রায় মোশাররফকে সংবিধান সংশোধনের কর্তৃত্বও দিয়েছিল। যার সূত্রে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ২০০৩ সালের ১৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে এর চ‚ড়ান্ত বৈধতা দেয়া হয়েছিল। নতুন রায় মোশাররফের ক্ষমতা দখল, তার আমলে প্রণীত সমস্ত আইনকে অবৈধ প্রতিপন্ন করছে।

রাজনৈতিক উত্থানের মুখে ২০০৭ সালের ৩ ডিসেম্বর জরুরি আইন জারি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট মোশাররফ। এর বিরুদ্ধে আইনজীবীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যেটা ‘রুল অব ল মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। আর রাজনৈতিক দলগুলোও মোশাররফের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছিল যখন মোশাররফ একই পার্লামেন্ট থেকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করেন।

প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরিকে মোশাররফ ২০০৭ সালের মার্চে পদচ্যুত করেন, যদিও জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট আবার তাকে পুনর্বহাল করে। ইফতেখার চৌধুরির নেতৃত্বাধীন আগ্রাসী বিচার ব্যবস্থা মোশাররফের পুনর্নির্বাচনকে বৈধতা দেয়নি এবং সে কারণে মোশাররফ জরুরি আইন জারি করেন এবং এক সপ্তাহ বা এ রকম সময়ের জন্য সংবিধান স্থগিত করেন।

একই পার্লামেন্ট কর্তৃক মোশাররফ নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করিয়েছিলেন। কিন্তু তার শাসনকাল ১০ মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগের (নওয়াজ) সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গঠিত নতুন পার্লামেন্টে তাকে অভিশংসিত করার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তাকে জোর করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

মোশাররফের ‘দ্বিতীয় মার্শাল ল’ পাকিস্তানের ১৯৭৩ সালের সংবিধানের উপর একটা আঘাত বলে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন। তাই বর্তমান রায় বেসামরিক গণতন্ত্রের উন্নয়ন এবং প্রকৃত নির্বাচনী রাজনীতির পথে পাকিস্তানের অগ্রযাত্রায় একটা নতুন মাইলফলকের মতো বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য এই রায়টি অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। যে ধরনের রায় দেয়া হয়েছে, সেটার কারণে বিতর্ক হচ্ছে না, বরং যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং শাস্তি বাস্তবায়নের জন্য যেসব পন্থার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কারণে এই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায়ের একই সাথে একটা প্রতীকী এবং বাস্তবসম্মত গুরুত্ব রয়েছে। প্রতীকী দিক হলো এখানে একটা বিদ্যমান পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যেখানে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছে বিচার বিভাগ। লে. জেনারেল (অব) তালাত মাসুদের মতে, এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানে একটা ‘গুণগত পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে যেখানে সামরিক বাহিনীর সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। যে বিষয়টা সামরিক বাহিনীর জানা প্রয়োজন এবং এটার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়া প্রয়োজন।

পাকিস্তানে আজ যেসব ‘গুণগত পরিবর্তন’ হচ্ছে, তার অনেক কিছুর মূল রয়ে গেছে ২০০৭-০৮ সালের সেই লইয়ার্স মুভমেন্টের মধ্যে, যেটা পুরো পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সকল রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ একত্র হয়ে পদচ্যুত বিচারপতিদের সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বহালের দাবি তুলেছিল। মোশাররফের জরুরি অবস্থা বা দ্বিতীয় সামরিক আইন জারির মধ্য দিয়ে লইয়ার্স মুভমেন্ট হয়তো শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মোশাররফ সংবিধান স্থগিত করায় এবং বিচারকদের পদচ্যুত করায় আন্দোলন আবার ফিরে আসে এবং একই সাথে সেটার ধরনও বদলে যায়।

২০০৭ সালের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যে লইয়ার্স মুভমেন্ট হয়েছিল, সেটা প্রধান বিচারপতিকে পুনর্বহালের জন্য একটা প্রকৃত আন্দোলন হওয়ায়, সংবিধান স্থগিত করার কারণে এই আন্দোলনটি পরিণত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের সংবিধান পুনর্বহালের আন্দোলনে। মোশাররফ তার ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়ার জন্য যেসব পরিবর্তন এনেছিলেন, এই দাবির মাধ্যমে শুধু সেগুলোকেই বাতিল করার দাবি করা হয়নি, বরং এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ১৮তম সংশোধনীর পথ তৈরি হয়েছে, যে সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের সংবিধানে ১০২টি পরিবর্তন এসেছে। এর মাধ্যমে সংবিধানের চরিত্র বদল হয়েছে এবং কেন্দ্রীভূত প্রেসিডেন্সিয়াল ফেডারেশন থেকে বদলে একটা বিকেন্দ্রীকৃত পার্লামেন্টারি ফেডারেশনে পরিণত হয়েছে।

১৮তম সংশোধনীতে সংবিধানের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের অধীনে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদে সংবিধান বিলুপ্তি, স্থগিত করা এবং মুলতবি অবস্থায় রাখার বিধানগুলোর উল্লেখ রয়েছে এবং এ ধরনের কর্মকাÐকে ‘উচ্চ ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। ১৯৭৩ সালের সংবিধানেও এই অনুচ্ছেদটি বরাবরই ছিল, কিন্তু ১৮তম সংশোধনীর মাধ্যমে একটা বিষয় এতে সংযুক্ত করা হয়, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানের কোন আদালত (সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট) সংবিধানের এ ধরনের স্থগিত, বিলুপ্তি বা সাময়িক মুলতবির সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে পারবে না। সেখানেই এটার ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে যে, পাকিস্তানের বিচার বিভাগ কিভাবে নিজেকে সামরিক শাসন থেকে দূরে রাখতে পারবে এবং কেন এটা নিজেকে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে পারছে।

বিচার বিভাগের শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে ১৯তম সংশোধনী, যেখানে বিশেষভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে পার্লামেন্ট ও নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি নিজের ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছে বিচার বিভাগ।

সাংবিধানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যদিও এটা মনে হচ্ছে যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সরাসরি অভ্যুত্থানে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে, তবে পাকিস্তানের মতো একটা ‘গ্যারিসন রাষ্ট্রে’ রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর সরাসরি ও পরোক্ষ ভূমিকা থেকেই যাবে। অন্যভাবে বলা যায়, যদি সরাসরি কোন অভ্যুত্থান নাও হয়, তবে সরকার কাঠামোতে সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্তির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক-সামরিক শাসনের পরিবর্তিত নতুন রূপ তৈরি হবে। তবে সেনাবাহিনী যদি এখন ছাড় দিতে না শেখে তাহলে পাকিস্তান নতুন জটিলতার মধ্যে পড়বে।

প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান এবং কার্যত হিন্দুত্ববাদী শক্তির ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের জন্য সরাসরি মারাত্মক নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটা আবার সামরিক বাহিনীর শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কর্ব হওয়াটাকে সোজা চোখে দেখবে না। ফলে পাকিস্তানকে অবশ্যই প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা চরমপন্থী হুমকির মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কটের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। ইতিবাচক ইঙ্গিতকে ভবিষ্যতে বাস্তবে রূপান্তরিত করে স্থিতিশীল ব্যবস্থা কায়েম করাটা রাজনীতিকদেরই চ্যালেঞ্জ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − = 7