যুদ্ধ জয়ের পথে আফগান তালেবান

শান্তি আলোচনা, চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া, চুক্তি বাতিল, আবার আলোচনা শুরু, নতুন চুক্তির চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান তালেবানদের প্রতিনিধি দল এই চক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আলোচনা চলছেই, কিন্তু ফলাফল বা সমাধান কই! তবে সমাধান আসুক বা না আসুক, এটা সকলেই এক বাক্যে মেনে নিচ্ছে যে, তালেবানের কাছে আসলে হার মেনেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর কোনোভাবেই তাদের উপেক্ষা করে আফগানিস্তান শাসন করা সম্ভব হচ্ছে না।

সামরিক ভারসাম্যের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র সব দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও আফগান যুদ্ধের হিসাব নিকাশে এগিয়ে আছে তালেবানই। এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রস্তানের অপেক্ষা। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তালেবানদের দিকে হেলে আছে, তাদের হাতে যেতে খুব বেশি সময়ও নেই। মার্কিন ও তার মিত্র বাহিনী আফগানিস্তানের পাহাড়-পর্বত আর প্রতিক‚ল এলাকায় অপ্রতিসম যুদ্ধের শিকার হচ্ছে। আফগান যুদ্ধের মঞ্চে মার্কিন বাহিনী নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সাফল্য লাভের জন্য সীমিত যুদ্ধে নিয়োজিত হলেও বিদ্রোহীদের তা ফেলেছিল টিকে থাকার যুদ্ধে। তাই তাদের কাছে এটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে।

আফগান বিদ্রোহীরা সাবেক মার্কিন কুটনীতিক ও রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জারের একটি উক্তির সত্যতা প্রমাণ করেছে, গেরিলারা জয়ী হবে, যদি তারা না হারে; প্রচলিত সেনাবাহিনী হেরে যাবে, যদি তারা জয়ী না হয়। আফগান যুদ্ধে অব্যাহত অচলাবস্থা প্রমাণ করছে যে তালেবানই এতে জয়ী হচ্ছে। বিদ্রোহী এ গ্রুপটিকে কেবল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে হচ্ছে এবং আফগানিস্তানে অবস্থান করার আমেরিকান ইচ্ছাশক্তি অবসান হওয়ার প্রতীক্ষা করতে হচ্ছে। অপ্রতিসম যুদ্ধের কৌশলগত সুবিধার কারণে সম্ভাব্য বিমান হামলা ও গোলন্দাজ বাহিনীর হামলার সময় বিদ্রোহীরা স্থান ত্যাগ করার সুযোগ নিচ্ছে এবং এই হামলা শেষ হওয়া মাত্র তারা তাদের ঘাঁটিগুলোতে ফিরে আসতে পারছে। অন্যদিকে বিদ্রোহীদের অপ্রত্যাশিত হামলায় সরকারি বাহিনীর ধৈর্য ভেঙে যাচ্ছে।

Afghan Taliban militants stand with residents as they took to the street to celebrate ceasefire on the second day of Eid in the outskirts of Jalalabad on June 16,2018. – Taliban fighters and Afghan security forces hugged and took selfies with each other in restive eastern Afghanistan on June 16, as an unprecedented ceasefire in the war-torn country held for the second day of Eid. (Photo by NOORULLAH SHIRZADA / AFP) (Photo credit should read NOORULLAH SHIRZADA/AFP/Getty Images)

ভৌগোলিক ও কৌশলগত অপ্রতিসম যুদ্ধের সুবিধা ছাড়াও আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর সমর্থন ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং বেসামরিক হতাহত, বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো নানা কারণে বিদ্রোহীদের সমর্থন বাড়ছে। প্রতি বছরই সরকারপন্থী বাহিনীর হাতে বেসামরিক হতাহত বাড়ছেই। সর্বশেষ ইউএন অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ইন আফগানিস্তান (ইউএনএএমএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারপন্থী বাহিনীর হামলায় ২ হাজার ৩৪৮ জন (নিহত ১ হাজার ১৪৯ ও আহত ১ হাজার ১৯৯ জন) হতাহত হয়েছে। ২০১৮ সালের একই সময়ের চেয়ে তা ২৬ ভাগ বেশি।

এদিকে উদার গণতন্ত্রের বিকাশ কাবুলের বাইরে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আর জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে পুঁজি করে এবং ছায়া অর্থনীতি পরিচালনা করে (আফিম উৎপাদন ও পরিবহন কর ও ব্যবসার মাধ্যমে) চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে সমর্থন বাড়িয়ে নিয়েছে তালেবান।

গ্রাম এলাকায় বসবাসকারী বেশির ভাগ পশতুই বিদেশী দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তালেবানের ভাষ্যই গ্রহণ করে নিচ্ছে। তারা মনে করছে, যেকোনো মূল্যে বিদেশী দখলদারদের থেকে দেশকে রক্ষা করা গর্ব আর সম্মানের বিষয়। বিদ্রোহী গ্রুপটি দেশের সম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলে প্রাচীন আফগান গর্বকেই উস্কে দিচ্ছে। ঊনিশ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, ২০ শতকে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে অতি মূল্যবান স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা তারা গর্বভরে বলে থাকে। গ্রামের মানুষদের কাছে নিজেদের বার্তা প্রচারে লোকজ কবিতা, গল্প, গান ব্যবহার করে থাকে বিদ্রোহীরা।

পশতুদের মধ্যে তালেবানের সমর্থন আরো বেড়েছে। আফগান জনসাধারণের প্রায় ৪০ ভাগ পশতু। আফগানিস্তানের চেয়ে বেশি পশতু বাস করে পাকিস্তানে। ডুরান্ট লাইন পশতুদের আফগান ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত করেছে। আফগান পশতুরা পাকিস্তানে থাকা পশতুদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়ে থাকে। এ কারণেই তালেবান সহজে পাকিস্তানে ছড়িয়ে যেতে পেরেছিল।

আফগান সেনাবাহিনীতে উত্তর আফগানিস্তানের জাতিগত গ্রুপগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ আফগানিস্তানে তালেবানের ঘাঁটিতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মারাত্মক প্রতিকুলতার মুখে পড়ে তারা। উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে জাতিগত বৈরিতা থাকায় দক্ষিণে এসব আফগানকে বিদেশী মনে করা হয়। আবার দক্ষিণে পশতুদের মধ্যে সমর্থন বাড়ানোর উদ্যোগে সাফলতা আসেনি।

অবশ্য বিদেশী হস্তক্ষেপের সময় দীর্ঘ হওয়ায় ও মারাত্মক বেকারকত্বের কারণে তালেবানদের পক্ষে সহজ হয়েছে তাদের অবস্থান জোরদার করার। উত্তর আফগানিস্তানের জাতিগত গ্রুপগুলো থেকে স্থানীয় কমান্ডারদের একটি নতুন প্রজন্ম তালেবানের চাকরির প্রস্তাবে আকৃষ্ট হয়ে ঐতিহাসিক বৈরিতা সত্ত্বেও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাদাখশান প্রদেশের অনেক তালেবান যোদ্ধা এসেছে তাজিক জাতিগত গ্রুপ থেকে। তাছাড়া তালেবান বিপুলভাবে জয়ী হতে যাচ্ছে, এমন ধারণার ফলেও অনেকে তাদের সাথে যোগ দিচ্ছে। আবার তালেবানের ইসলামি মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব প্রদানের ফলেও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী তাদের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। সোভিয়েত আমলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইতেও মুজাহিদরা এই কৌশলে সাফল্য পেয়েছিল।

অন্যদিকে দুর্নীতিও আফগান সেনাবাহিনীর শক্তি শুষে নিচ্ছে। অস্তিত্বহীন অনেক সৈন্যের নাম পাওয়া যায় বেতনের তালিকায়। আবার আফগান বাহিনীর মধ্যে উচ্চ হতাহতের হারের কারণেও অনেকে বাহিনী ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য আফগান বাহিনী প্রস্তুত ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে হতাহত বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেটাকে সামাল দেয়ার জন্য তরুণদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক চাকরি সৃষ্টি করতে হবে। আর সেজন্য দরকার সম্প্রসারণশীল ও টেকসই অর্থনীতি। কিন্তু অর্থনীতি প্রায় পুরোটাই সাহায্যের ওপর নির্ভরশল হয়ে রয়েছে। আর তালেবান আফিম বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমেই তারা ছয় লাখ লোককে পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত রাখতে পারছে। তালেবানের আফিম বাণিজ্য নষ্ট করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি।

অনেক আফগানই অন্য সব মতাদর্শের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। জাতীয়বাদের গর্বই তাদেরকে ব্রিটিশ ও রুশদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে সহায়তা করেছিল। আর এটিই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। দেশ যখন হুমকির মুখে পড়ে তখন বেপরোয়া স্থানীয় পরিচিতিই সাধারণত ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচিতিতে পরিণত হয়। তালেবানকে তাই ধর্মীয় নয় দেখতে হবে আফগানু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবেই। এই চেতনাই তাদের জয়ের পথে পরিচালিত করছে। যুদ্ধে যে পক্ষই জিতুক, শেষ পর্যন্ত মানবতার হার হবে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে পশ্চিমা গনতন্ত্র কিংবা ধর্ম- কেউই মানুষের মুক্তি দিতে পারছে না। দিনশেষে এদের উভয়পক্ষের শিকারে পরিণত হচ্ছে মানুষ। যুদ্ধ মানে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর মিছিল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 − = 36