সংকটের মুখে জার্মানির জোট সরকার

ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র জার্মানি বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সম্প্রতি তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। কিন্তু দেশটিতে উগ্র ডানপন্থার উত্থান সেখানকার উদারবাদী রাজনীতিকদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। ২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান রক্ষণশীল দল (সিডিইউ) জয়লাভ করায় অ্যাঙ্গেলা মেরকেল টানা চতুর্থবারের মতো চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। কিন্তু বিজয়ী হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ডানপন্থিদের উত্থানে ভীত হয়ে প্রধান বিরোধী দল সামাজিক গণতন্ত্রী (এসপিডি) দলের সঙ্গে মহাজোট করে সরকার গঠন করে মেরকেলের দল। সেই থেকে সিডিইউ ও এসপিডির মধ্যে নানা ইস্যুতে দ্বন্ধ লেগেই আছে।

শুরুতে এ দ্বন্ধ যদিও ছিল ক্ষমতা বণ্টনকে কেন্দ্র করে, তবে এখন সেখানে এসে যুক্ত হয়েছে সমর্থকদের চাপ। মহাজোট সরকারের শরিক দল এসপিডির নেতৃত্ব বদলের ফলে গোটা সরকারের স্থায়িত্বই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার টিকে গেলেও ২০২১ সালে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সংকট চলতে পারে। দলের সমর্থকদের আকাহ্ক্ষা মেনে না চললে যে পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে, সেই বাস্তব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে জার্মানির সামাজিক গণতন্ত্রী এসপিডি দলের নেতৃত্ব।

একের পর এক নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর দলটি সরাসরি সদস্যদের কাঁধে নতুন নেতা বাছাইয়ের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে দুই ব্যক্তির যৌথ নেতৃত্বের এক মডেল মেনে কয়েকজন প্রার্থী সেই দৌড়ে নাম লিখিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী ও জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস। তার সঙ্গী ছিলেন ক্লারা গাইভিৎস। শনিবার দলের সদস্যরা শলৎস ও গাইভিৎস-এর বদলে তুলনামূলকভাবে অখ্যাত এক জুড়িকে দলের কান্ডারী হিসেবে বেছে নিলেন। নরবার্ট ভাল্টার বোরইয়ান্স ও সাস্কিয়া এস্কেন এবার নেতা হিসেবে দলের হাল ধরবেন। তারা দল, তথা দেশকে আরও বামপন্থি পথে চালিত করতে চান।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জার্মানির ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শরিক দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গোটা দেশ তথা ইউরোপের উপর প্রভাব রাখতে পারে। এসপিডি দলের হাতে গোনা সদস্যদের একাংশ যে ভোট দিলেন, তার ফলে অদূর ভবিষ্যতে জার্মানিতে সরকারের পতন ও রাজনৈতিক আঙিনায় আমূল রদবদবলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দলের নতুন দুই নেতা মহাজোট সরকারের চরম বিরোধী বলে পরিচিত।

আনুষ্ঠানিকভাবে হাল ধরার পর তাদের কারণে দল মহাজোট ত্যাগ করলে আগামী নির্বাচন এড়ানো কঠিন হবে। তারা নতুন করে কোয়ালিশন চুক্তি নিয়ে দরকষাকষির ঘোষণা করলেও বাকি দুই শরিক দল সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জোট সরকার চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

এই মুহূর্তে এসপিডি ও চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেলের সিডিইউ একেবারেই ভোটারদের সামনে যাবার জন্য প্রস্তুত নয়। দুই শিবিরেই দলের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে সংকট চলছে। বিগত কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে দুই দলের প্রতি সমর্থন কমে গেছে। মহাজোট সরকার প্রতিশ্রুতি পালন করতে একের পর এক পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও ভোটারদের সমর্থন হারাচ্ছে। বিশেষ করে এসপিডি দল ছোট শরিক হওয়া সত্ত‌্বেও ঘোষিত নীতিমালার একটা বড় অংশ কার্যকর করতে সফল হলেও কিছুতেই জনসমর্থন পাচ্ছে না।

দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের এই সংকটের মূল ফায়দা তুলছে চরম দক্ষিণপন্থি এএফডি দল। সংসদে প্রধান বিরোধী দল একের পর এক রাজ্য নির্বাচনে ভালো ফল করে চলেছে। আগাম নির্বাচন হলে সেই সাফল্যের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সপ্তাহান্তে সেই দলেও নেতৃত্বে রদবদল ঘটেছে। বাকি দলগুলি এএফডি-কে ব্রাত্য করে রাখলেও তাদের জয়যাত্রা রুখতে এখনো কার্যকর ভুমিকা পালন করতে পারছে না।

এসপিডি দলের সাধারণ সদস্যদের একটা বড় অংশ জোট সরকার ত্যাগ করার পক্ষে আরো সোচ্চার হয়ে ওঠায় নতুন নেতার পক্ষেও এমন চাপ উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠবে। ২০১৩ সাল থেকে চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের ছোট শরিক হিসেবে থেকে যাওয়ায় এসপিডি দলের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে বলে দলের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাই ২০২১ সালে বর্তমান সরকারের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছেন না অনেকে।

একের পর এক নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের কারণে এসপিডি দল এতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, জোট সরকার ত্যাগ করে আগাম নির্বাচনের ঝুঁকি এই মুহূর্তে সহজ বিকল্প হবে না। অন্যদিকে জনসমর্থন তলানিতে ঠেকার ফলে সরকারে থাকার উপযোগিতাও দেখছে না দলের একটা বড় অংশ। এমন উভয় সংকটের মুখে দল শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে মেরকেলসহ গোটা দেশকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির জটিলতা নির্দেশ করছে যে, জার্মানির মহাজোট সরকার এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু ২০২২ সালে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত অস্থিরতা চলতে থাকবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। চ্যান্সেলর হিসেবে আঙ্গেলা মেরকেলের শেষ কার্যকালে তার ইউনিয়ন শিবিরের নেতৃত্বের লড়াই আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

জার্মানির ঘরোয়া রাজনীতির এই জটিলতা সরাসরি ইউরোপ ও বিশ্ব রাজনীতির উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। চ্যান্সেলর হিসেবে দেশের মধ্যে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও বিশ্বনেতা হিসেবে আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ভাবমূর্তি এখনো উজ্জ্বল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের ঠিক পরে বিভিন্ন ইইউ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণের ক্ষেত্রেও জার্মানির বিশেষ ভুমিকা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ঘিরে দুশ্চিন্তার মাঝে জার্মানিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরোপে একেবারেই কাম্য নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =