একটি ব্যাতিক্রমী জার্মান শনিবার

দুইবছর আগেও আমার জার্মান শনিবারগুলো ছিল অন্যরকম। শনিবারের সকাল শুরু হতো শুক্রবারের হ্যাংওভার দিয়ে, আর সন্ধ্যা কারো জন্মদিন কিংবা বিভিন্ন কারণ অকারণের পার্টি দিয়ে। আর এখন শুরু হয় জার্মান ব্যুরোক্রেসি দিয়ে কিংবা অসমাপ্ত আর্টিকেলের কন্টেন্ট দিয়ে, যেটা কিনা সোমবার অফিসে জমা দেবার শেষ দিন। এটাই কি বেড়ে ওঠার লক্ষণ? আজকের সকালটা শুরু করেছি ‘Steuererklärung’ অর্থাৎ   ‘ট্যাক্স রিটার্ন’ এর কাগজ পত্র সংগ্রহের মাধ্যমে, মানে ২০১৯ সালে যে ট্যাক্স দিয়েছি তার একটা অংশ ফেরত পাবো, জার্মানরা কাগজ ভালোবাসে, পাগলের মতো ভালোবাসে, যেকোন কাজে, সেটা বড় হোক আর ছোট আপনাকে এটা সেটা হাবি যাবি অমুক তমুক নানান ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে হবে।  

বার্লিনের আজকের আবহাওয়া ভয়াবহ, পৃথিবীর একটি মানুষও যদি আর স্বপ্ন না দেখে, একটি মানুষেরও যদি আর কোন আশা না থাকে, একটি মানুষও যদি আর না হাসে, পৃথিবীটা দেখতে যেমন হবে ঠিক তেমন আজকে, বিষাদ, অন্ধকার এবং অপ্রাসঙ্গিক বৃষ্টি। বাহিরে বরং না তাকানোই ভালো, ইন্টারনেটে তো আরো নয়। ইরাকে মার্কিন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলায়মানি নিহত হয়েছেন। নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার আশংকা, ভালো লাগছে না। আর ওইদিকে অস্ট্রেলিয়া জ্বলছে, ভয়াবহ দাবানলে সব পুড়ে যাচ্ছে। এর চেয়ে বরং বই কিংবা নেটফ্লীক্সই ভালো।

 

দুটি বই পড়ছি এখন, একটির নাম ‘eure Heimat ist unser Albtraum’ মানে ‘তোমাদের মাতৃভূমি আমাদের দুঃস্বপ্ন’ ১৪ জন লেখক-লেখিকা, যাদের রয়েছে মাইগ্রেশন ব্যাকগ্রাউন্ড, তাদের অভিজ্ঞতায় জার্মানি কেমন? এই প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে বইতে, সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুচ্ছ। বইয়ের এক জায়গায় আটকে যাই অনেকক্ষণ, অনেকবার পড়েছি ওই পাতাটি, লেখিকা ফাতেমা আদেমির জার্মানিতে চাকরির পরিবেশ নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছে ‘জার্মান ড্রিম’, ‘মাইগ্রেশন সবসময়ই প্রতিশ্রুতিমূলক উত্তম জীবন, একটি জার্মান ড্রিম। আমার দাদা-দাদির জার্মান ড্রিম ছিল টাকা সঞ্চয় করা এবং টার্কিতে এক টুকরো জমি কেনা। আমার মা-বাবার জার্মান ড্রিম  ছিল তার সন্তানদের শিক্ষিত করা এবং একটি বড় জার্মান গাড়ি কেনা, আমার জার্মান ড্রিম  কি? একদম সহজঃ আমি চাই জার্মানদের চাকরি কেড়ে নিতে, আমি এমন কোন চাকরি চাইনা যেটা আমাকে উদ্দেশ্য করে তৈরি হয়েছে, আমি সেই চাকরি চাই যেটা জার্মানদের জন্য সংরক্ষিত, এবং অবশ্যই সাথে সমান বেতন, সমান চুক্তি এবং সমান সুযোগ।’

ফাতেমা তিন জেনারেশন ধরে জার্মানিতে আছে, তারপরও জার্মান জব মার্কেট দ্বারা সে বা তাদের কমিউনিটি বর্ণবাদের স্বীকার হচ্ছে, এই লেখিকা এখানে জন্মগ্রহণ করেছে, এখানের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়েছে তারপরও তাকে জার্মান ভাবা হয় না এবং যুদ্ধ করতে হচ্ছে সমতার জন্য, আর আমি? আমি এসেছি মাত্র চারবছর, এই ভাষা আমার মাতৃভাষা না, কিন্তু এই ভাষায় পড়াশুনা করছি, সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছি, হ্যাঁ জার্মানদের সাথে। আমার সাংবাদিকতা একাডেমীতে আমার সেমিস্টারে ১৮ জন, বাকি ১৭ জনই জার্মান। এই লেখিকার লেখায় ‘কমন গ্রাউন্ড’ পেয়ে ওই পাতায় আটকে আছি, কিন্তু সেই কথা লেখার সময় এখনো আসেনি। তবে ভাবছিলাম আমার ‘জার্মান ড্রিম’ এর কথা, আমারটা সহজ নাঃ আমি এখানে জন্মগ্রহণ করিনি, আমি এখানের শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠিনি, আমি একটি গরিব দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, আমার এখানকার সহপাঠী বা কলিগরা একটা স্টোরি শেষ করতে যদি দুই দিন সময় নেয়, আমার লাগে সেখানে পাঁচদিন, কিন্তু হ্যাঁ তবুও আমি জার্মান সাংবাদিক হতে চাই, জার্মান পাঠকদের জন্য লিখে যেতে যাই। 

নাহ আজ আর বেশি ক্রিটিক্যাল চিন্তা করবো না, আরাম আয়েশ করবো। বাথটাবের কল ছেড়ে দিয়ে, চুলে একটু গরম তেল ম্যাসেজ করতে বসলাম, আহা শরীর, চুল কোন কিছুরই যত্ন নেয়া হয় না, আমার জার্মান ড্রিম এর পেছনেই চলে যায় সকাল বিকেল কিংবা রাতগুলোও। বাথটাবে শুয়ে চিন্তা করছিলাম,  ছোটবেলায় খুব ফ্যান্টাসি ছিল এই বাথটাব নিয়ে, ভাবতাম মানুষ যখন অনেক অনেক বড়লোক হয় তখন তাদের বাসায় একটা বাথটাব থাকে, আমি আর আমার বড় বোন স্বপ্ন দেখতাম একটি বাথটবের, বাংলাদেশে প্রথম সামনাসামনি বাথটাব দেখেছিলাম আমার বড়লোক বান্ধবী অরিনদের নতুন বাসায়, শিহরিত হয়েছিলাম, অরিনকে বলেছিলাম একদিন আমি এই বাথটবে গোসল করতে চাই, আর হয়ে ওঠেনি। এখানে বাথটাব খুবই স্বাভাবিক বিষয় এবং আমার আর বাথটাবের ফ্যান্টাসি নেই, আমার বড় বোনেরও নেই, এখন বাংলাদেশে বাসায় একটি বাথটব বাসানো খুব অসম্ভব কিছু না, কিন্তু আমাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে অন্যকিছু, বাথটাব না।

মোবাইলে মহীনের ঘোড়াগুলি চলছে, ‘শহরের উষ্ণতম দিনে…’ নাহ বাংলা গান বেশি শুনতে পারিনা, দেশের কথা খুব মনে পরে, বুকের মধ্যে কেমন যেন ঝাঁকুনি দেয়। বাংলাদেশ কেমন আছে? মানুষ নাকি অদৃশ্য ভাবে জিম্মি হয়ে আছে? ওরা নাকি কাউকে প্রতিবাদ করতে দিচ্ছে না? ওদের কিসের এত ভয়? সেদিন দেখলাম ওই অল্পসংখ্যক বামপন্থিদের মিছিলে আবারো হামলা করেছে, সিপিবি শান্তিনগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন এর আহত মাথা আবারো রক্তাক্ত!  উফফ খুব বেশি মানসিক চাপ। মানসিক চাপ হলে কোন প্রিয় কিছু রান্না করি কিংবা হস্তমৈথুন করি যদি প্রেমিক পাশে না থাকে।  হস্তমৈথুন আমাকে প্রশান্তি দেয়, বাংলাদেশের নারীদের বড় একটা অংশ অর্গাজমের সাথে পরিচিত না, নারীর অর্গাজম এখনো ট্যাবু, অধিকাংশ পুরুষ সঙ্গীটিই  নারীর প্রশান্তির কথা ভাবে না, কি স্বার্থপর! আমার বাংলাদেশি সব প্রেমিকরাই ছিল ওই গ্রুপের।

টিং- হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, আজ কোথাও যাবো না বলেই মনস্থির করেছি, একটা হাউস পার্টির  দাওয়াত ছিল, যদি যাই তাহলে নতুন মানুষজনের সাথে পরিচয় হবে, ওটাই অসুহ্য লাগে আজকাল, সেই একই স্মল টক, একই প্রশ্ন আর একই উত্তর, মাঝেমধ্যে ওই একই প্যানপ্যানে বোরিং প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে হবে বলে নতুন জায়গায় যাইনা। এটা কি আমি যে বড় হয়ে গেছি তার উপসর্গ নাকি হতাশার?

যাই হোক এখন বার্তাটা এসেছে এক কাছের বান্ধবীর, সে আমার বাসায় আসতে চায় তার নাকি একটু ‘স্পেস’ দরকার। সে কিছুদিন আগে তার বয়ফ্রেন্ডেরর সাথে একি বাসায় উঠেছে, তাদের সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই নড়বড়ে, অনেক আগেই বলেছিলাম এই আইডিয়াটা খুব ভালো না, একসাথে মুভ করা। কিন্তু সে বাস্তবতার সাথে ভালো বোঝাপড়া করে উঠতে পারেনি।গত সপ্তাহে ওকে একটা বই ধার দিয়েছি ভার্জিনিয়া উলফ এর ‘A Room of One’s own’ একজন নারীর প্রাইভেসি যে কত গুরুত্বপুর্ন তারই কথা। আমি খুবই উত্তেজিত বান্ধবীর অভিমত জানার জন্য, তার কথা শোনার জন্য। আজকাল কথা কম বলি, শুনি বেশি, নিজেকে ভালো শ্রোতাও মনে করি। সত্যিই বড় হয়ে গেছি নাকি?

আমার একটি ব্যাতিক্রমী জার্মান শনিবার, যে শনিবার আমাকে গভীরভাবে নিশ্বব্দে বলে যায় ‘তুমি বড় হয়ে গেছো’

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of