ব্রেক্সিটে স্থিতিশীলতা কী খুঁজে পাবে যুক্তরাজ্য?

যুক্তরাজ্য বিগত পাঁচ বছরে তিনটি নির্বাচন ও তিনজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে। অথচ দেশটিতে একটি সংসদের মেয়াদই পাঁচ বছর। ধারণা করা হচ্ছে যে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে এই অবস্থা, তা এবার সম্পন্ন হবে এবং দেশটির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্থিতিশীলতা খুঁজে পাবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা এখানে কিছু ‘তবে-কিন্তু’ দেখছেন। এই নির্বাচন ব্রেক্সিটের পক্ষের সরকারকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। ফলে কোনো আইনের জন্য আর তাদের বিরোধীদের সমর্থনের দিকে তাকাত হবে না। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ব্রেক্সিট থেকে শুরু করে সব ধরনের আইনই পাশ করিয়ে নিতে পারবে তারা। এই যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এটাই যুক্তরাজ্যের কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনে পার্লামেন্টের আসনসংখ্যা ভাগাভাগির চিত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, তা হলো ব্রেক্সিট বিভাজন প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে পড়েছে কনজারভেটিভ এবং ব্রেক্সিট পার্টির মোট ভোটের ৪৮ শতাংশ আর বিপক্ষে পড়া ভোটের হার ৫২ শতাংশ। ২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট ছিল ৫২ শতাংশ, বিপক্ষে ৪৮ শতাংশ। ৪ শতাংশের ব্যবধানই রয়ে গেছে, তবে উল্টোভাবে। যা কিনা নির্দেশ করে, ব্রেক্সিট প্রশ্নে দেশটিতে যে চরম বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা একটুও কমেনি। সচেতন ব্রেক্সিট বিরোধিতা আগের তুলনায় বেড়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সি ভোটাররা বেশি ভোট দিয়েছেন লেবার পার্টিকে। অর্থাৎ তরুণরা ব্রেক্সিটের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু বয়স্কদের অর্থাৎ ৪০ থেকে সত্তরোর্ধদের ভোট বেশির ভাগই পড়েছে করজারভেটিভ পার্টির থলেতে। এটাও একটা বিভাজন, যা ব্রিটেনকে কাটিয়ে উঠতে হবে। এরকম আরো বিভাজন এই নির্বাচন সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও বেশিরভাগ ভোট ও জয় পেয়েছেন কনজারভেটিভরা, কিন্তু নারীদের উত্থানটাও চোখে পড়ার মতো। ফলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এখন অবধি সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়তা দেখা যাবে এবার। রেকর্ডসংখ্যক ২২০ জন নারী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এবারের নির্বাচনে। এর পাশাপাশি ৬৫ জন্য সাংসদ কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্ত¡া থেকে উঠে এসেছেন। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন সাংসদ সংখ্যালঘু জাতিসত্ত¡ার। অতীতে আর কোন ব্রিটিশ সংসদে এমনটা দেখা যায়নি।

আরেকটি বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে প্রাদেশিক নির্বাচনের ফলাফলে। দ্য স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি গত সপ্তাহের নির্বাচনে স্কটিশ সংসদের ৫৯ আসনের মধ্যে ৪৮টি জয় করেছে। এই দল স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা করতে চায়। স্কটল্যান্ডে শীর্ষস্থান দখলের পর নিকোলা স্টারজিয়ন বলেন, ইংল্যান্ডের মানুষ ব্রেক্সিট কার্যকরে জনসনকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু স্কটল্যান্ডে বরিস একজন পরাজিত নেতা। স্কটল্যান্ডকে ইইউ থেকে বের করে আনার ক্ষমতা স্কটিশরা তাকে দেননি। স্বাধীনতাকামী এনএনপি নেতা এক সপ্তাহের মধ্যে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিষয়ে গণভোটের আইনের খসড়া প্রকাশ করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ওই গণভোটের জন্য স্কটল্যান্ডের কারও সম্মতি বা অনুমতির প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী বরিস নির্বাচনী প্রচারের সময়ে বলেছেন, তিনি এ ধরনের গণভোটে সম্মতি দেবেন না। স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরা এই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ আসনে জয়ী হওয়ায় তাদের উপেক্ষা করা এখন সহজ হবে না। স্কটল্যান্ড ব্রেক্সিটের ঘোরবিরোধী। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজনে জনসনের বাধা দেওয়া ঠিক হবে না, স্টারজিয়নের এমন বক্তব্যের পর জনসন তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

যুক্তরাজ্যের অখন্ডতার প্রতি আরেকটি হুমকি তৈরি করেছে উত্তর আয়ারল্যান্ড, যারা ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে গণভোটে রায় দিয়েছিল। সেখানে কনজারভেটিভদের যে দলটি সমর্থন দিয়েছিল, তাদের আসনসংখ্যা কমেছে এবং দলীয় নেতা হেরে গেছেন। বিপরীতে আইরিশ জাতীয়তাবাদীরা বেশি সংখ্যায় জিতেছেন এবং তারাও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য গণভোট দাবি করতে পারেন। ফলে যুক্তরাজ্যের অখন্ডতা রক্ষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে।

কনজারভেটিভ পার্টি এখন যেকোনো আইন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। নির্বাচনে তাদের আসন বেড়েছে ৪৭টি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান প্রায় আশির ঘরে। বিপরীতে বিরোধী দল লেবার পার্টির আসন গতবারের তুলনায় কমেছে ৫৯টি। তৃতীয় অবস্থানে গতবার যে স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন, এবার তাদেরও আসন বেড়েছে ১৩টি। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যারা তৃতীয় শক্তি হিসেবে গণ্য হতেন, সেই লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা গতবারের তুলনায় এবার একটি আসন কম পেয়েছে এবং দলের নেতা নিজে পরাজিত হয়েছেন।

এরকম বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কি একলা চলার নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি পার্লামেন্টে ঐকমত্য ও সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করবেন? লৌহমানবীখ্যাত মার্গারেট থ্যাচারের পর গত তিন দশকে কনজারভেটিভ পার্টির এত বড় বিজয় যে বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে, তা হলো বরিস কনজারভেটিভ পার্টিকে কোন পথে নিয়ে যাবেন। থ্যাচার যে কট্টর বাজার অর্থনীতি এবং বিরাষ্ট্রীয়করণের নীতি অনুসরণ করে দলটিকে মধ্য ডানপন্থার পথ থেকে সরিয়ে কট্টর রক্ষণশীলতার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেরকম কিছুরই কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? নাকি ট্রাম্পের ব্রিটিশ সংস্করণ হিসেবে আবির্ভূত হবেন? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির মতোই যুক্তরাজ্যেও কনজারভেটিভ পার্টিকে নিও-কনজারভেটিজম বা নতুন ধরনের সংরক্ষণবাদের পথে নিয়ে যাবেন?

বরিস জনসনের বিরুদ্ধে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মকেন্দ্রিক ও সুবিধাবাদিতার নানা অভিযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো তার বিরুদ্ধেও মিথ্যাকে সত্য এবং সত্যকে মিথ্যা হিসেবে হাজির করার অভিযোগ আছে। তবে নির্বাচনের এই ফল নিশ্চিত করছে যে, তিনি একজন শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় এসেছেন এবং তার নেতৃত্বেই ব্রেক্সিটের প্রথম ধাপটি আগামী ৩১ জানুয়ারিতে কার্যকর হবে। কারণ তিনি বড়দিনের আগেই পার্লামেন্টে তার সম্পাদিত চুক্তি অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় আইনগুলো করে নিতে সক্ষম হবেন।

বরিস জনসনের জন্য আসল পরীক্ষা হবে দ্বিতীয় ধাপে, যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে তার বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ের বোঝাপড়া সম্পন্ন করতে হবে। যার মানে হচ্ছে বাণিজ্য ও সেবা খাত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে গত চার দশকের ব্যবস্থাগুলোর বদলে নতুন কী কী ব্যবস্থা করা হবে, সেসব বিষয়ে দর-কষাকষি ও চুক্তি এক বছরের মধ্যেই শেষ করা। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি অসম্ভব। কারণ, এ ধরনের বাণিজ্য চুক্তিতে কানাডার সময় লেগেছে সাত বছর। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা একই রকম।

খুব সম্ভবত জুলাইতেই বরিসকে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপের আইনকানুনগুলো মেনে চলার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে। সময় বাড়ানোর মানে হচ্ছে বাড়ানো। ব্রেক্সিটের একটি বড় উদ্দীপক ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নিজস্ব বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন। বরিসের বিজয়ের খবরকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বলেছেন যে এখনই সামগ্রিক বাণিজ্য আলোচনা শুরু হোক।

ঐতিহাসিক বিজয়ে ক্ষমতায় ফিরে দেশবাসীকে অবশ্য ঐক্যেরই আহবান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। জনসন তার নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তার সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ (ব্রেক্সিট) কার্যকর করা। তবে যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং প্রতিবেশী ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চান তাদের অনুভূতিও তিনি বুঝতে পারেন। ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেবেন বলে জানান। ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপক্ষের সবাইকে বিভক্তি ভুলে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে শামিল হওয়ার আহবান জানান তিনি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of