হিরোইনের খোঁজে!

ঢাকাইয়া সিনেমার পোকা আমি। যখনই নতুন কোন ছবি রিলিজ হয়, তা মিস করিনা কখনো। কোন রকমে ১০/১২ টাকা জোগার হলেই কমদামি টিকেট কিনে সিনেমার একদম সামনের সিটে বসে মুভি দেখি আমি। বিশেষ করে রিক্সাওয়ালার সাথে বড়লোকের মেয়ের প্রেম জাতীয় মুভি খুব পছন্দ আমার। ছবি দেখতে দেখতে নিজেকে ঢাকাই ছবির হিরো কল্পনা করতে থাকি আমি। তাই নিজের ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখাকে পুঁজি করে বলতে গেলে একদম খালি হাতে ঢাকায় উপস্থিত হলাম একদিন। প্রথমেই ভাড়ায় জোগার করলাম একটা রিক্সা। একবেলা ষাট টাকা ভাড়া। রিক্সার ভেতরে গানের সিস্টেম চালু করলাম। যাতে চালানোর সময় নিজে গান শুনতে পারি কিংবা শোনাতে পারি আমার পছন্দের প্যাসেঞ্জারকে।
:
সব প্যাসেঞ্জার পছন্দ নয় আমার। আমি কেবল ওঁৎ পেতে থাকি হিরোইন টাইপের সুন্দরী মেয়ে প্যাসেঞ্জারের খোঁজে। যাদের দেখলে এগিয়ে যাই আমি তার কাছে। ভাড়া হাঁকি খুব কম, যাতে টপ করে উঠে পড়ে তারা আমার রিক্সায়। পছন্দের হিরোইন তুলে নিজেকে হিরো কল্পনা করি আমি। এক ফাঁকে অন করে দেই হিন্দি গান। কখনো রেকর্ড করা বাঁশির সুর। কেউ কেউ জানতে চায় এ বাঁশি কার বাজানো। নিজেকে তখন হিরো ভেবে প্রকাশ করি – এটা আমার নিজের বাজানো। কেউ কেউ সিমপ্যাথি দেখায়, পরিচয় জানতে চায় আমার। কখনো ভাড়ার উপরে বখশিশ দিতে চাইলে, তা প্রত্যাখ্যান করি আমি। মুখে দৃঢ়তা এনে বলি – ‘না ম্যাডাম, ভাড়ার বেশি টাকা নিতে পারুম না। ওটা হারাম আমার লাইগা’। আমার কথায় কেউ ঠোঁট উল্টে হাসে!
:
শাহবাগের কাছে একদিন বিকল গাড়ির কাছে দাঁড়ানো দেখি এক সুন্দরী ম্যাডামকে। চোখে মুখে বিরক্তির ভাব। রিক্সা নিয়ে পাশে দাঁড়াই তার। কণ্ঠে মিষ্টতা এনে বলি – কই যাইবেন ম্যাডাম? ধানমন্ডি যাওয়ার কথা বলে সে। ড্রাইভারকে গাড়ি ঠিক করে নিয়ে আসতে বলে এক লাফে আমার রিক্সায় উঠে বসে পরীর মত সুন্দরী ললনা। সুযোগ বুঝে বাঁশের বাঁশি হাতে নেই আমি। একহাতে রিক্সা চালিয়ে অন্য হাতে বাঁশি বাজানো শুরু করি তাকে মোহিত করতে। আমার বাঁশি শুনে প্রশংসার বদলে বিরক্তি প্রকাশ করে ম্যাডাম। ধমকের সুরে বলে – হিরোগিরি দেখাইতে চাও? বাদ দাও ঐসব ভ্যাঁ ভ্যাঁ আওয়াজ! বিরক্ত লাগে। বাসার সামনে গেলে একটা একশ টাকার নোট মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলে – পথেও একটু শান্তিতে চলতে পারলাম না, সব যায়গায় উৎপাত!
:
বিরক্ত হয়ে কষ্টকর রিক্সা চালানো ছেড়ে দেই এবার। গার্লস কলেজের সামনে মোবাইল রিচার্জের দোকান খুলি ফুটপাতে টেবিল চেয়ার পেতে। অনেক সুন্দরী মেয়েরা রিচার্জ করতে আসে আমার কাছে। অবলীলায় তাদের নিজ নিজ নাম্বার বলে দেয় আমার কাছে। এর মাঝে অপ্সরীর মত চেহারার এক মেয়ে দুয়েকদিন পর পর আসে আমার কাছে। চোখে চোখ রেখে আমার দিকে তাকায়। মাঝে মাঝে তার দিকে চেয়ে থাকি অনেকক্ষণ আমি। লক্ষ্য করে হাসে মেয়েটি। তার দুটো নম্বর টিক দিয়ে রাখি আমি। রাত ১১-টার দিকে ফোন দেই তাকে। কিন্তু হ্যালো বলে আর কিছু বলার কথা খুঁজে পাইনা। পরদিন আবার একই সময়ে কল দিয়ে নিজের পরিচয় দেই। কি চাই জানতে চায় মেয়েটি। কিন্তু তেমন কিছুই বলতে পারিনা সাহস করে। পরদিন সকালে ৪-যুবক নিয়ে হাজির হয় মেয়েটি। ওরা এসেই কিল ঘুষি মারতে শুরু করে আমাকে। আর জোরে জোরে বলে – রাত এগারোটায় ফোন করে বিরক্ত করবি শালা? হিরোগিরি? ওরা চেয়ার টেবিল ভেঙে দেয় আমার। শাসিয়ে যায় এখানে আর যেন না দেখি!
:
আবার পেশা পাল্টাই আমি। এবার কসমেটিক্সের দোকান ফুটপাতে। নানার ঢংয়ের কাস্টমার আসে। তার মাঝে অল্প বয়সি মেয়েরাই বেশি। কারো কারো হাসি আর সুন্দর মুখ দেখে কম দামে কিংবা লস দিয়ে বিক্রি করি মালামাল। এর মাঝে নাজমা নামের মেয়েটি আসে প্রায়ই। ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে সব সময় সেজেগুজে থাকে মেয়েটি। পাশের ১০-তলা ফ্ল্যাট দেখিয়ে বলে ওখানের ৯-তলায় ওদের ফ্ল্যাট। নাজমা যদিও আহামরি রূপবতী কেউ নয়, কিন্তু ৯-তলা ফ্ল্যাটবাড়ির মেয়ে বলে ওর প্রতি লোভ জন্মে আমার। ক্রমে সম্পর্ক বাড়তে থাকে আমাদের। মাঝেমধ্যে দুজনের চোখে চোখে কথা হয়। একদিন মা বাবা ঘরে না থাকাতে খালি ফ্ল্যাটে নাজমা ডাকে আমাকে। চকচকে খাটের ধবধবে বিছানায় বাহুলগ্না হয় সে আমার। এরপর এমন সুযোগ গ্রহণ করি আমরা প্রায়ই। নাজমাকে শাড়ি, থ্রি পিছ কিনে দেই গাটের পয়সা খরচ করে। কখনো চাইনিজ কিনে আনি ওর জন্যে! নিজের দোকান লাটে ওঠে নাজমার খপ্পরে পড়ে। একদিন নির্জন দুপুরে নাজমার আহবানে তার ফ্ল্যাটে গেলে, ৩-যুবক আটক করে আমাকে। নাজমা আমাকে আঙুল দিয়ে সনাক্ত করে বলে – “হ্যাঁ, এ-ই প্রেগন্যান্ট করেছে আমাকে”। যুবকরা আটক করে কাজী ডেকে নাজমার সাথে বিয়ে পড়িয়ে দেয় আমার। তখন জানতে পারি, নাজমা এ ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে। মা বাবাহীন এতিম মেয়ে নাজমা।
:
বৌ নাজমাকে নিয়ে এবার গ্রামে ফিরে আসি আমি। নিজের জমিতে চাষাবাদ শুরু করি। বুঝতে পারি – সুন্দরী হিরোইন পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। নিজের গ্রাম থেকে হিরোইনের খোঁজে শহরে গিয়ে কাজের মেয়ে নাজমাকে নিয়ে ঘরে ফিরতে হলো আমাকে! সম্ভবত এর নামই ঢাকাই ছবির কুফল।
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 6