পেশাদারিত্ব এবং ……!

জীবনে সপ্তপদি পেশাতে নিয়োজিত ছিলাম আমি। যখন যে পেশায় যুক্ত হলাম তখন মনেপ্রাণে চাইতাম নিজের বেসাতি বাড়াতে। গ্রাম্য ডাক্তারের পেশা গ্রহণের পর মনেপ্রাণে চাইতাম কলেরা লেগে যেন গ্রামছে গ্রাম সাফ হয়ে যায়। যাতে হাজারো রোগীর মাঝে নিজের রমরমা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারি আমি। একবার চৈত্রমাসে গ্রামে মহামারী আকারে কলেরা লাগলে, রোগীর আত্মীয়স্বজন সবাইকে বললাম – রোগির কাপড়চোপড় যেন খালের পানিতে ধোয়া হয় এবং ঐ পানি যে সব মানুষ পান করে। ব্যস, যা হওয়ার তাই হতো। নিজের চাওয়াটা ষোল আনা পূর্ণ হতো আমার। জেলে পেশা গ্রহণের পর মনে মনে চাইতাম নদীগুলোতে যেন মাছের বন্যা হয়। মাছধরায় সরকারের বিধিনিষেধ মানতে চাইতাম না আমরা। ডিমওয়ালা, রেণুজাতীয় মাছ ধরতে চাইতাম সব সময়। কোন মাছ বাড়াতে চাইতাম না, কেবল ধরতে চাইতাম দিনরাত!
:
কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণের পর মনে মনে চাইতাম ধান চালের যেন আকাল থাকে সব সময়। পিয়াজের দাম বাড়ার কারণে খুব খুশি হয়েছিলাম আমি। মনে মনে চাইতাম ৩০০ টাকা কেজি দরে যেন পিয়াজ থাকে চিরন্তন। নৌকার মাঝি হিসেবে পেশা গ্রহণের পর মনে মনে চাইতাম – লঞ্চগুলোতে যেন বজ্রপাত হয় কিংবা ডুবে যায় যাত্রীসমেত। যাতে আমার হাতে বাওয়া নৌকোয় উঠতে বাধ্য হয় মানুষ। এরপর এলাম শহরে। রিক্সা চালাতে শুরু করলাম প্রথমে। হরতাল হলে রিক্সার রমরমা ব্যবসা। তাই হরতাল চাইতাম সব সময় কিংবা বাস ট্যাক্সির ধর্মঘট। ১০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা চাইতাম! সিএনজি চালানো শুরু করলে আমার শত্রু হলো টাফিক পুলিশ। মনে মনে চাইতাম ট্যাম্পারিং মিটারসহ যেন চালাতে পারি সিএনজি। মিটারে যাাওয়া একদম পছন্দ ছিলনা আমার! এরপর হলাম বাসচালক। রাস্তায় রিক্সা দেখলে তাকে পিষে মারতে ইচ্ছে হতো আমার। আর ছাত্ররা হাফ ভাড়া দিতে চাইলে তাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে মন চাইতো আমার। প্রতিযোগী বাসগুলোকে আটকে নিজেই সব প্যাসেঞ্জার তুলতে চাইতাম আমি। সিটিংয়ের নামে ন্যুনতম ৩০ টাকা ভাড়া আদায় করতাম আমি! দুচার টাকা ভাড়া পছন্দ হতোনা আমার!
:
ওকালতি পেশা গ্রহণের পর মনেপ্রাণে চাইতাম যেন মোয়াক্কেল বছরের পর বছর ঘোরে মামলাগুলোয়। কোন মামলার তাড়াতাড়ি রায় হোক তা কখনো মানতে পারতাম না আমি। ভুক্তভোগীকে ধুনপুন বুঝিয়ে মামলা পরিচালনার নানাবিধ পরামর্শ দিতাম আমি। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আরো মামলা করতে বলতাম নানা উপায়ে। যখন স্কুল টিচার হলাম, কখনো ক্লাসে ঠিকঠাক পড়া বোঝাতাম না। যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়ে। কেন সব শিক্ষার্থী আমার কাছে প্রাইভেট পড়ছে না, তা নিয়ে হতাশা ছিল আমার মনে। সরকারি চাকুরীতে ঢোকার পর পাবলিককে মনে করতাম তেলাপোকা। তাদেরকে ঘোরাতে আনন্দ পেতাম আমি। ৩ দিনের কাজ করতাম ৩ মাস কখনো ৩ বছরে। ট্রাফিক পুলিশ হওয়ার পর মনে মনে ভাবতাম সব যেন বেআইনি থাকে। যেমন অধিক যাত্রীবহন, দাঁড়িয়ে যাত্রী নেয়া অবৈধ থাকাতে সুবিধা হতো আমার। অর্থ উপার্জনের প্রধান অস্ত্র ছিল এটা। রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার পর ফুটপাতে দোকান বসানোটা নেশা হলো আমার। পুলিশ দোকান তুলে দিলে পরদিন দ্বিগুণ টাকায় আবার দোকান বসার ব্যবস্থা করতাম আমি। চাইতাম এটা যেন অবৈধই থাকে, যাতে টাকার বিনিময়ে বৈধতা দিতে পারি আমি।
:
এভাবে যে পেশায়ই যখন গিয়েছি সেটার পুরো ফায়দা তোলার চেষ্টা করেছি আমি। আমার এ ঋণাত্মক চিন্তন কেবল যে আমার মাঝে সংক্রামিত হয়েছে তা নয়। এদেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, রিক্সাওয়ালা, বাসচালক, ফুটপাতের দোকানি, কসাই, মুদিওয়ালা সবাই আমার মতই। যেখানেই আপনি যান, সবখানেই আমার মত নেতিবাচক মানসিকতার লোকজন দেখবেন। কদাচিৎ যদি দুয়েকজনকে ব্যতিক্রম দেখতে পান, সেটা নিছকই কাকতালীয়। সুতরাং আপনার মনে রাখতে হবে এক নেতিবাচক দেশে বসবাস করছেন আপনি। সুতরাং …………………!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of