ভাড়াটে

তখন আমি কলেজে পড়ি। বরিশাল শহরে থাকতাম নিজ বাড়িতে। আমি যে দোতলা পাকা বাড়িতে থাকতাম, সে বাড়িটা ছাড়াও আলাদা ১০-টা ঘর ছিল আমাদের টিনের। তা ভাড়া দিতাম মাসে ৬০০-টাকা করে। দশ ঘরে ছ’হাজার টাকা পেতাম মাসে। প্রতিমাসে ভাড়া তুলতাম আমি। তা থেকে নিজের খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকা মায়ের কাছে গ্রামে পাঠিয়ে দিতাম। একবার দুটো ঘর খালি হলো। তাই টু-লেট টানালাম ঘরের সামনে। একদিন দুপুরে মাঝ বয়েসি এক নারী এলো ঘর ভাড়া নিতে। বললো – তার স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে থাকে। নিজের একমাত্র মেয়ে নিয়ে থাকবে সে একটি ঘরে। এখন যেখানে আছে সেখানের ঘরটি মন্দ নয়। কিন্তু বখাটেদের জ্বালায় বেড়ুতে পারেনা তার কালেজ পড়ুয়া মেয়েটি। তাই বাসা বদল করতে চায় সে। বিনীতভাবে বললাম – চাকুরীজীবি ছাড়া কাউকে ভাড়া দেব না, মায়ের নির্দেশ। কারণ এ বাড়ি মায়ের। মহিলা বললো – তার স্বামীও চাকুরী করে বিদেশে। ৩-মাসের ভাড়া অগ্রিমের কথা বললাম – তাতেও রাজি হলো মহিলা। কথা হলো পরের মাসের ১-তারিখ থেকে উঠবেন তিনি আমার বাসাতে একমাত্র কলেজ পড়ুয়া কন্যাকে নিয়ে।
:
সন্ধ্যায় মহিলা আবার এলেন। বললেন – ‘বাবা, তোমার ঘরতো খালিই। ওখানে বখাটেদের জ্বালায় কলেজে যেতে পারছেনা আমার কন্যাটি। তুমি পারমিশন দিলে কালকেই উঠতে চাই আমি’। পরদিন খুব ভোরে মালপত্রসহ ঘরে উঠলেন মহিলা। কিন্তু এক কন্যা নয় তিন কন্যা। জানতে চাইলাম – এরা কারা। মহিলা হেসে বললো – ঘরটা আমার খুব দরকার ছিল। বেশি মানুষ শুনলে তুমি ভাড়া দাও কিনা। তাই আমার ৩ কন্যার বদলে তোমাকে এক কন্যার কথা বলেছি। হেসে ফেললাম আ্মি তার কথা শুনে। বললাম – ঠিকাছে, তিন মেয়ে যেহেতু ফেলবেন আর কই! এবার উঠলেন যখন তাই তিন মাসের অগ্রিমটা দিন। মহিলা বললো – কাল রাতেই তার স্বামীকে ফোন করে বলেছে টাকা পাঠানোর কথা। দুয়েক দিনের মধ্যে টাকা এসে পড়বে। তখন ৩ মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে দেবেন তিনি। মহিলা তার তিন মেয়ের সাথে পরিচয় করালো আমাকে। ছোটটি ক্লাস এইটে পড়ে, মেজটি ক্লাস টেনে আর বড়টি ইন্টারে শেষ বর্ষে কলেজে। মায়ের কথামত মেয়েরা ‘ভাইয়া’ বলে সালাম করলো আমাকে।
:
দেখতে দেখতে দুমাস চলে গেল। মহিলার স্বামী প্রবাস থেকে কোন টাকা পাঠালো না। এ দুমাসে অগ্রিম কিংবা চলতি কোন ভাড়াই পরিশোধ করলো না সে। এমনকি একমাসের বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া রইল তার ঘরের। বিকেলে ঘরে ফিরে বেশ কড়া কথা শুনালাম মহিলাকে তার মেয়েদের সামনেই। ঘর ছেড়ে দিতে বললাম তাকে পরের মাসে। নিজ ঘরে ঢুকে বসতেই দরজায় খট খট শব্দ। দরজা খুলে দেখি রীতা নামের বড় মেয়েটি। বললো – ভাইয়া ভেতরে আসবো? আসতে বললাম তাকে। সে আমার কাছাকাছি বসলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো – ভাইয়া একটা সত্যি কথা বলবো? ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম – সত্য মিথ্যা যা বলার বলো। রীতি বললো – ‘আসলে আমার বাবা নেই। বিদেশে থাকেনা আমাদের কেউ। মায়ের সাথে বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে অনেক বছর হলো। মা এখন মামা বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে কিছু টাকা এনে আমাদের সংসার চালায়। আগে আমরা যে বাসাতে ছিলাম, সেখানে ৬-মাসের ভাড়া বাকি থাকাতে বাড়িওয়ালা নামিয়ে দিয়েছে আমাদের। আসলে আমাদের সংসার চলছে না। আপনি আমার যা চান নিন, আমাদের নামিয়ে দেবেন না প্লিজ ভাইয়া’!
:
কথা শেষ করে রীতা আকস্মিক চেয়ার থেকে উঠে একদম আমার কাছে এলো। আমার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। আমি কি করবো বুঝতে পারলাম না। বললাম – তুমি এখন যাও। কি করা যায় চিন্তা করে দেখি। রীতা যেতে চায়না, তারপরো তাকে অনেকটা ঠেলে ঘর থেকে বের করে দিলাম ভয়ে। সারারাত ঘুম হলোনা আমার। মা খুব হিসেবি। প্রতিমাসে পুরো ঘর ভাড়ার হিসেব নেন আমার থেকে। ওদেরকে থাকতে দিলে সে টাকার হিসেব দেব আমি কোত্থেকে? পরদিন কলেজে যাওয়ার আগে রীতা আবার এলো। বললো – কলেজে দেখা করবো আমি। কথা বলে আবার জড়িয়ে ধরলো আমাকে। তরুণ বয়স আমার। কুমারী রীতার উষ্ণ আহবান ঠেলতে পারলাম না। খুব কাছাকাছি হলাম ওর। সেও নৈকট্যে এলো আমার। আমি ভুলে গেলাম ওদের ঘর ভাড়া আর বিদ্যুৎ বিলের কথা। নিজের খরচ কমিয়ে ওদের ভাড়ার হিসেব দিলাম মাকে।
:
একদিন টেনে পড়া মেজ মেয়ে কণিকা দরজা নাড়লো এবার। বললো – ‘তিনশ টাকা ধার দিতে হবে। খুব দরকার। এক সপ্তাহ পর দিয়ে দেব’। আমি না করার আগেই একদম বুকের কাছে এলো সে। হেসে চোখ টিপে বললো – একটা ইয়াং মেয়ে তিনশ টাকা চেয়েছে তার জন্যে এতো চিন্তা কিসের? টাকা তো কত ভাবেই শোধ দিতে পারবো আমি! পারবো না? বলে একদম বুকের কাছে ঘনিষ্ঠ হলো সে। টাকার ব্যাপারে না করতে পারলাম না আমি। তিনশ টাকা নিয়ে বিদায় নিলো শেষতক। একদিন রাতে এলো এইটে পড়ুয়া ১৪-বছরের ঝর্ণা নামের মেয়েটি। বললো – ‘মা ৫০০-টাকা ধার দিতে বলেছেন’। কথা বাড়াতে দিলাম না তাকে। খুব শক্ত কথা বলে বিদায় দিলাম তখনই। সারারাত ঘুমাতে পারলাৈম না এ পরিবারের দুশ্চিন্তায়। এরা কি ৩ মেয়ে লেলিয়ে দিয়েছে আমার দিকে!
:
পরদিন কলেজে যাওয়ার আগে ছোট একটা চিরকুট পেলাম দরজার ফাঁকে। রীতা চিরকুট পাঠিয়েছে। তাতে লেখা – ‘আজ জরুরীভাবে কলেজে দেখা করুন। না হলে আপনার বিপদ হবে’। চিন্তিত মনে দুপুরে দেখা করলে রীতি বললো – “ভাইয়া কণিকা থেকে সাবধান! আজ সে আপনার ঘরে যাবে। আপনি তার গায়ে হাত দিয়েছেন এমন কথা বলে সে চিৎকার করবে। মা তখন সব ভাড়াটিয়া নিয়া আপনার ঘরে যাবে। এমনকি কণিকার ইজ্জত নষ্ট করেছেন, এমন কথা বলে ব্লাকমেইল করতে পারে আপনাকে। এটা মা আর কণিকার প্লান”! কথা শুনে মাথা ঘুরে গেল আমার। কিভাবে বাঁচবো এ অক্টোপাস থেকে! এ সময় মাকে খুব দরকার আমার। তাই আকস্মিক লঞ্চে উঠে বসলাম গ্রামে যেতে। সন্ধ্যায় মাকে খুলে বললাম সব কথা। সব শুনে মা চিন্তিত হলেন। তারপরো সকালের লঞ্চে বরিশাল এলো আমাকে নিয়ে।
:
মায়ের দূর সম্পর্কের এক মামাতো ভাই ছিল। বরিশাল সিআইডিতে কাজ করতো তখন। তাকে খুলে বললো সব কথা। তিনি প্লান মতো একা ঘরে থাকতে বললো আমাকে। মা আর আমার সাথে এলোনা। সে রইল তার মামাতো ভাইর বাড়িতে। বিকেল থেকে একাকি রইলাম আমি নিজ ঘরে। বেশ কবার সুযোগ বুঝে ঢোকার চেষ্টা করলো কণিকা। ঠিক আযানের সময় আমার ঘরে ঢুকলো সে। চিৎকার দেয়া বা সিন ক্রিয়েট করার আগেই ঘরের ভেতর থেকে বেড়িয়ে এলো মা আর তার মামাতো ভাই কবির সাহেব। কণিকাকে চ্যালেঞ্জ করলো তারা দুজনে। ডাকা হলো কণিকার মাকে। ঘর ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হলো তাৎক্ষণিক। রাতে রীতা এসে ক্ষমা চাইলো মা আর আমার কাছে। চোখ ভিজিয়ে এক মাস সময় চাইলো মায়ের কাছে সে। ভালবাসায়পূর্ণ মায়ের হৃদয় উথলে উঠলো সব শুনে। মা বললেন – ‘তোমাদের কোন ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত থাকো। তবে আমার ভাল ছেলেটাকে নষ্ট করোনা’। আরো সাত মাস রইলো তারা বিনা ভাড়াতে। রীতার একটা প্রাইভেট ফার্মে জব হওয়াতে একদিন ঘর ছেড়ে ঢাকা চলে গেল তারা। আর দেখা হয়নি ঐ পরিবারের সাথে!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4