ইউরোপে উদ্বাস্তুর ঢল আরও বেড়েছে

ইউরোপ প্রবল উদ্যমে উদ্বাস্তু সংকটের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। এই সংকটের ফলেই সৃষ্টি হয়েছৈ ব্রেক্সিটের মতো বিপদ এবং ক্রমাগত তাতে শক্তিশালী হচ্ছে উগ্র ডানপন্থিরা। এ অবস্থায় উদ্বাস্তুদের ঢল নিয়ন্ত্রণ করাটাই ইউরোপীয় নেতাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বছরব্যাপী নানা কৌশল ও পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও বছরের শেষে এসে তারা খারাপ খবরই পেলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গোপন রিপোর্ট বলছে, তুরস্ক হয়ে উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের ইউরোপে আসার ঢল নেমেছে। ২০১৮ এর তুলনায় ২০১৯ সালে সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে ইইউ ও তুরস্কর মধ্যেকার উদ্বাস্তু চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইইউ এর গোপন রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তুরস্ক হয়ে ৭০ হাজার দুইজন উদ্বাস্তু ইউরোপে এসেছে। ২০১৮ সালের তুলনায় সংখ্যাটা ৪৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৬৮ হাজার লোক গ্রিসে গিয়েছেন এবং সেখানকার আগে থেকেই উপচে পড়া উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। বাকিরা গিয়েছেন বুলগেরিয়া, ইটালি ও সাইপ্রাসে। হালফিল প্রবণতা হল, ইউরোপে অধিকাংশ উদ্বাস্তু আসছেন আফগানিস্তান থেকে। মোট উদ্বাস্তুর ৩০ শতাংশই আফগানিস্তানের লোক। এ ছাড়া সিরিয়া থেকে এসেছেন ১৪ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৯.৫ শতাংশ, ইরাক থেকে ৮ শতাংশ ও তুরস্ক থেকে ৫ শতাংশ। এদিকে গ্রিসের এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জের উদ্বাস্তু শিবিরে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। সেখানে খাবার, ওষুধ, পোশাক সবকিছুই বাড়ন্ত। তাই গ্রিস সরকার তাদের মূল ভুখন্ডে নিয়ে আসছে।

উদ্বাস্তুদের এই ঢল তুরস্কের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই চুক্তি অনুসারে, তুরস্কের মধ্যে দিয়ে অভিবাসী বা উদ্বাস্তুরা ইউরোপে আসতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হবে। বিনিময়ে তুরস্ক ৬০০ কোটি ইউরো পাবে। সিরিয়া সঙ্কট দেখা দেওয়ার পর ইইউ এই ব্যবস্থা নিয়েছিল। এখন অবশ্য তুরস্ক পাল্টা ইইউ’র বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছে, তাদের আরও অর্থ লাগবে। ইইউ’র রিপোর্ট বলছে, ‘অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে, তুরস্কের নজরদারি জলযানগুলি উদ্বাস্তুদের নৌকা থামানো দূরস্থান, বরং সেগুলিকে গ্রিসের জলসীমায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।’ ফলে সমস্যা বাড়ছে। রিপোর্ট এটাও জানাচ্ছে, ‘কিছু উদ্বাস্তু গ্রিসে থেকে যাচ্ছে। কিছু আবার আলবেনিয়া সীমান্তে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেখান থেকে চোরাচালানকারীদের সাহায্যে তারা অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে ঢোকার চেষ্টা করছে।’

যুদ্ধ, নির্যাতন আর সংঘাতের কারণে ২০১৮ সালে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দুই কোটি মানুষ। এর মধ্যে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন ৭০ হাজার, অর্থাৎ প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এছাড়া বিশ্বে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত কোটির বেশি। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় যা সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। বাড়িছাড়া মানুষের হিসাবে শরণার্থী, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী এবং দেশের অভ্যন্তের বাস্তুচ্যুতদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

‘বৈশ্বিক প্রবণতা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশকালে ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বৈশ্বিক প্রবণতা ভুল দিকেই যাচ্ছে। নতুন করে যুদ্ধ আর সংঘাত বাড়ছে এবং তৈরি করছে নতুন নতুন শরণার্থী। যারা আগের শরণার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, অথচ পূর্ববর্তীদের সমস্যার কোনো কিনারা হয়নি।’ ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০১৮ সাল নাগাদ ৭ কোটি ৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮৫ লাখ। এক দশকে বাস্তুচ্যুত মানুষ বৃদ্ধির পরিমাণ ৬৫ শতাংশ। ২০০৯ সালে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৩৩ লাখ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষের বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ও সময় দুটোই বাড়ছে। প্রতি পাঁচজনে চারজনের বাড়িছাড়া থাকার সময় দাঁড়িয়েছে পাঁচ বছরের বেশি। ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদনে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশসহ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের প্রশংসা করা হয়। ‘উন্নয়নশীল অঞ্চল তুলনামূলক বেশি শরণার্থীর ভার বহন করছে। বাংলাদেশ, চাদ, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, সাউথ সুদান, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডা ও ইয়েমেনের মতো কম উন্নত দেশ মোট ৬০ লাখ ৭০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যা মোট সংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ’ বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের প্রশংসা করেন ইউএনএইচসিআর প্রধান গ্র্যান্ডি। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত প্রশংসা ও সমালোচনাকে খুব বেশি পছন্দ করি না। তবে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে জার্মানি যা করেছে, সেটার জন্য প্রশংসা করছি। মাইগ্রেশন পলিসির জন্য রাজনৈতিকভাবে ‘কঠিন মূল্য’ দিয়েছেন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল। এই ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ তার কর্মকান্ডকে ‘আরো সাহসী’ করে তুলেছে। ইউএনএইচসিআর আশাপ্রকাশ করে যে, শরণার্থীদের প্রতি আরও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শনের মাধ্যমে এবং বিশ্বজুড়ে দরকারি উদার কুটনীতি পরিচালনা করে উদ্বাস্তু সংকটকে মোকাবিলা করতে ইউরোপ সক্ষম হবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of