নীরবে ধসে পড়ছে ঢাকার পুঁজিবাজার

২০১০ সালে যখন যখন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ধস নেমেছিল তখন বিষয়টি সবাই খুব দ্রুতই টের পেয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে সরকার বিষয়টি তদন্তে মনোযোগ দেয়। তদন্ত কমিশন সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি ব্যবসায়ী মহলের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল তীর বিদ্ধ করলেও সরকার পরে তাদের বিচারের আওতায় আনেনি। ফলে বাংলাদেশে পুঁজিবাজার আর কখনোই গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টির জায়গায় যেতে পারেনি। সেই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার এ মুহূর্তে মোকাবিলা করছে বিরাট বিপর্যয়।

বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দেয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকে নেমেছে বিশাল ধস। বাজার মূলধন কমে গেছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। অবস্থা এমন যে, পুলিশী বাধা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা কালো কাপড় পরে অবস্থান নিয়েছেন মতিঝিলে। অনেকে বলছেন ১৯৯৬ সাল ও ২০১০ সালের পর এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আগে সূচকের ধারাবাহিক পতন ঘটলে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করত বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রতিবাদ ঠেকাতে ডিএসইর একটি সাধারণ ডায়েরীর প্রেক্ষিতে তারাও কোনো কর্মসূচীতে যেতে পারছে না। ফলে একপ্রকার নীরবেই ধসে পড়ছে দেশের পুঁজিবাজারের মূল কেন্দ্র।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ার বেশি বিক্রি হয়ে যাওয়ার ফলেই এমনটা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে গ্রামীণফোন। পুঁজিবাজারে যতগুলো মৌলভিত্তির কোম্পানি আছে, তারমধ্যে অন্যতম ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি), গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন ও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। গত বছর আকস্মিক গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি করে বসে বিটিআরসি। যা নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গড়ায়। সেখানেও গ্রামীণফোনের বিপক্ষে রায় গেছে। সার্বিকভাবে এই পাওনার দ্বন্দ্ব গ্রামীণফোনের দর পতনে ভূমিকা রেখেছে। যা পুরো বিদেশী বিনিয়োগকারীসহ পুঁজিবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

পুঁজিবাজারে ধসের পেছনে বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের দ্বন্ধকে মূল কারণ হিসাবে উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, গ্রামীণফোনের সাথে বিটিআরসির যে একটা ঝামেলা শুরু হয়, এতে শুধুমাত্র গ্রামীণফোনের ক্ষতি হয়নি। পুরো পুঁজিবাজারের কাঠামো ধ্বংস হয়েছে। কারণ বিদেশিরা যখন আসে তখন ফান্ডামেন্টাল শেয়ার দেখে। তারা গ্রামীণফোনের পাশাপাশি অলিম্পিক, ইউনাইটেড পাওয়ার, বিএটিবিসি এবং স্কয়ার ফার্মার শেয়ার কেনে। আর বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের দ্বন্ধের কারনে সবগুলোতেই বিক্রি করেছে। শুধুমাত্র গ্রামীণফোন আর বিএটিবিসি বিক্রি করার ফলে বিগত দুই মাসে ১৭৪ পয়েন্ট পরেছে। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ইউনাইটেড পাওয়ার, বিএটিবিসি এবং অলিম্পিক এই ৫টি কোম্পানি মার্কেট পতনের জন্য ৮০ শতাংশই দায়ী।’

একাংশ বিশ্লেষকদের দাবি, দিনের পর দিন পুঁজিবাজারে অরাজকতা চলছে। তাই আস্থাহীনতায় কোনো সম্ভাবনা না পেয়ে শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে বিনিয়োগকারী। শেয়ারের দাম তলানীতে চলে গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ‘পর্যাপ্ত তহবিল নেই’ বলে নিরব। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক এই বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় না হওয়ায় আতঙ্কে শেয়ার ছেড়ে নিরাপদ অবস্থান খুঁজছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। লোকসান হলেও পুঁজি টিকিয়ে রাখতে তারা শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছে। এভাবে দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে টানা পতন চললেও বিনিয়োগকারীকে বাজার নিয়ে কোনো বার্তা দেয়নি স্টেকহোল্ডাররা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন বাজার কোথায় গিয়ে ঠেঁকে তা দেখার জন্য।

দরপতনের ধাক্কাটা ভয়াবহ। এক বছরের মধ্যে ঢাকা স্টক একএসচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা কমে গেছে। টানা পতনের জেরে ৭ জানুয়ারি ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫০ পয়েন্ট হারিয়ে নেমে আসে ৪ হাজার ২৮১ পয়েন্টে। তাতে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৬৫৫ পয়েন্ট। সেদিন বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের জিডিপির আকার এখন ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। সে হিসেবে ডিএসইর বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১৩ শতাংশ। দ্য গ্লোবাল ইকোনমি ডটকমের সর্বশেষ হিসাবে, ২০১৮ সালে বিশ্বের জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের গড় বাজার মূলধন ছিল ৭০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পাশের দেশ ভারতে তা ৭৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সে হিসেবে ঢাকার পুঁজিবাজার অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এ অবস্থায় রেমিটেন্স ছাড়া অর্ধনীতির সব সূচকের নেতিবাচক অবস্থানে থাকা, বাজারে তারল্য সঙ্কট, গ্রামীণফোনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার টানাপড়েন, ডলারের বিপরীতে টাকার মান হারানো এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজার ছেড়ে চলে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ পুঁজিবাজারে ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে নেমে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সুশাসনের বড় অভাব রয়েছে। আর সেটা নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রেও সত্যি। তিনি বলেন, এখন একটা বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ এই দুঃসময়ে আমরা কোনো পক্ষের কোনো জোরালো ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি না। একদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য সংকটের ফলে পুঁজিবাজারে টাকা আসছে না। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা আগেই লোকসান করে পুঁজিবাজার থেকে বের হয়ে গেছে। যে গুটিকয় বিনিয়োগকারী ছিল, তারাও শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই ক্রমাগত পতন হচ্ছে। সমস্যা সমাধানের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of