মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় নেত্রী হয়ে উঠছেন

বহুদিন পর গত ৬ জানুয়ারি ভারতশাসিত কাশ্মীরে বিনোদনের কোনো নমুনা দেখা গেল। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসের শুরুতে কাশ্মীর রাজ্য ও সেখানকার জনগণের বিশেষ সংরক্ষিত অধিকার কেড়ে নেয় মোদি সরকার। তখন থেকেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি অবরুদ্ধ প্রায়। দীর্ঘদিন পর হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে কাশ্মীরে আয়োজন করা হয় আই লীগের একটি ম্যাচ। এতে লড়াই করে পশ্চিমবঙ্গের দল মোহনবাগান এবং কাশ্মীরের স্থানীয় দল রিয়েল কাশ্মীর। খেলার সময় সাংবাদিকরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন কাশ্মীরিরা রিয়েল কাশ্মীর নয়, বরং মোহনবাগানের পক্ষে  শ্লোগাগান দিচ্ছেন। অতদূরে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে শীত ঠেলে এত বাঙালি খেলা দেখতে গিয়েছে, এটা মেনে নেয়া শক্ত। আবার কাশ্মীরিরা নিজেদের ল রেখে ভারতের অন্য অঞ্চলের একটি দলকে সমর্থন দিচ্ছে, এটাও ছিল অবাক করা ব্যাপার। বিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। ম্যাচ শেষে কাশ্মীরিরা জানিয়েছেন, তারা ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যের টিম’ হিসেবে মোহনবাগানকে সমর্থন করেছিলন। ২-০ গোলে খেলাটি জিতেছে মোহনবাগান।

এই ঘটনাটিকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করছেন ভারতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলন তাকে সমগ্র ভারতে একটা অবস্থান গড়ে দিচ্ছে। শুধু মুসলমানরা এই আইনের বিরোধিতা করছেন না। ভারতের প্রগতিশীল মানুষজন, সাধারণ মানুষ এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্র-তরুণ এই আইন ও এনআরসির বিরোধী। মমতা তাদের ভরসাস্থল হয়ে উঠছেন। কাশ্মীরের মানুষ কাশ্মীরি দল বাদ দিয়ে মমতার কারণে মোহনবাগানকে সমর্থন করাটা নিশ্চয়ই তৃণমূল নেত্রীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

কাশ্মীরের শোপিয়ানের শওকত শরাফ মনে করেন, শুধু মুসলিমেরা নন, সারা দেশের মানুষেরই একটা শক্ত ভরসা দরকার। তার কথায়, ‘একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের জন্য যুদ্ধ করছেন। মোহনবাগান তো তারই রাজ্যের ক্লাব।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ তাকি অবশ্য মনে করেন, উত্তরপ্রদেশের মতো যেখানেই এখন মানুষের উপরে ‘নিপীড়ন’ হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মতো অনেকেই তার প্রতিবাদ করছেন। একইভাবে উপত্যকায় গত পাঁচ মাসের কড়াকড়ির প্রতিবাদে যারা সরব হয়েছেন, কাশ্মীরিরা তাদের ভুলবেন না। এখানেই বাংলার জন্য বিশেষ বার্তা দিচ্ছেন মোহাম্মদ তাকি। বলছেন, ‘কাশ্মীরের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, সাংসদেরা, বিশিষ্ট জনেরা, ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ করেছেন। বাংলায় যেন এই বার্তা যায় যে, কাশ্মীরিরাও তাদের পাশে আছেন।’

এই অর্জনের জন্য মমতাকে অবশ্য কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির বিরুদ্ধে শক্তঅবস্থান নিতে হয়েছে। যা কিনা তার জন্য অনেক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। সরকারের নির্দেশকে অমান্য করতেও পিছপা হননি তিনি। বলেছেন, ‘কেউ গুজবের পেছনে দৌঁড়াবেন না। আমি জীবন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু কখনো বিজেপিকে পশ্চিম বঙ্গে ডিটেনশন সেন্টার বানাতে দেবে না।’ খবরে এসেছে, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের সরাসরি নির্দেশে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্ট্রেশন-এনপিআর বা জনগণনার কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। যদিও এই কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে রাজ্যগুলো সহযোগিতা করতে আইনত বাধ্য। কিন্তু রাজ্য সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া এনপিআর-এর কোন কাজ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে। মমতা কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে এও বলেছেন, ‘যদি মনে করেন আমি এবং আমার সরকার অসাংবিধানিক কাজ করছি, তা হলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বরখাস্তের সাহস দেখান! কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু হতে দেব না!’

মমতা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন এবং নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবেন। এই লড়াইকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন তিনি। ফলে আইনটি পাস হওয়ার পর এর বিরুদ্ধে কলকাতাজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছেন মমতা। সেই সূত্র ধরেই সারা ভারতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সকলের উদ্দেশে মমতা বলেন, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন প্রত্যাহার করতে হবে। যতক্ষণ না প্রত্যাহার করা হবে, ততক্ষণ আমরা রাস্তায় থাকব। এই লড়াই আর থামবে না। মমতা বলেন, আমাদের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। আমরা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগি মানি না। ধর্ম যার যার, সংবিধান সবার। আমি বাংলায় আছি। আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে এনআরসি করতে হবে, সিএবি করতে হবে।

তবে কেবল নিজ রাজ্যে আন্দোলন গড়ে তুলেই ক্ষ্যান্ত দিলেন না মমতা। বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে এমন সব রাজ্যের সরকারকে চিঠি লিখেছেন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও বার্তা পাঠিয়েছেন এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে এক সামিয়ানার নিচে আসার জন্য। প্রক্রিয়াটি এখনো অনেক দুর্বল এবং পুরনো শত্রæদের সঙ্গে কীভাবে একসঙ্গে পথ চলবেন সেটা এখনো মমতা ঠিক করতে পারেননি বলেই মনে হয়। যাই হোক না কেন, এখনো অঙ্কুরে থাকলেও বলা যায় যে, এর মাধ্যমে সর্বভারতীয় স্তরে অবিজেপি দলগুলির কাছাকাছি আসার একটি প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে।

মোদি বিরোধিতা মমতাকে শক্ত ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে। তিনি মোদির হিন্দুত্ববাদের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক একটি ইমেজ গড়ে তুলছেন। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন নিজের পক্ষে আনতে পারলে তার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দরজাটাও খুলে যাবে, যদি বিজেপিকে খুব বাজে পরাজয়ের স্বাদ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে মমতাকে অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র নীতিতেও সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। মমতার সাফল্য এই যে, ভারতের অনেক রাজ্যের তুলনায় বাংলায় দারিদ্র্য কমছে বেশি এবং সেটা দ্রæতগতিতে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী ও তৃণমূল নেতা অরূপ বিশ্বাস মনে করেন, ‘এক সময়ে গোখলে বলেছিলেন, ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।’ এখন বলতে হবে, ‘হোয়াট মমতা থিঙ্কস টুডে, রেস্ট অব ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’। সিএএ, এনআরসি, এনপিআরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মমতা সারা দেশকে পথ দেখিয়েছেন। সকলেই এখন সেই প্রতিবাদের পথে আসছেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of