হঠাৎ কেন মুসলিমদের নেতা হতে চাইছেন মাহাথির!

নব্বইয়ের ঘরে বয়স হলেও বৃদ্ধ মাহাথির ঠিকই মালয়েশিয়াকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রাজনীতিতে এটি তার দ্বিতীয় ইনিংস। এর আগে ২২ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৩ সালে উত্তরসূরীদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সরে যান। কিন্তু উত্তরসূরীরা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না দেখে নিজের দলের বিরুদ্ধে দল বানিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচন করে জয়ী হন এবং আবারও প্রধানমন্ত্রীত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ দফার মাহাথির যেন ভিন্ন কেউ।

দ্বিতীয় ইনিংসে যেন যৌবনের মাহাথির ফেরত এসেছেন। কিংবা যৌবনে তার যা করার কথা ছিল, বৃদ্ধ মাহাথির সেসব করা শুরু করেছেন। মাহাথির তার প্রথম ইনিংসে ছিলেন বহির্বিশ্ব নিয়ে নির্লিপ্ত মার্কিন নীতির সমর্থক একজন উদারপন্থি নেতা। কিন্তু এখন তিনি প্রতিবাদী, বহির্বিশ্বের ঘটনাবলি সম্পর্কে সোচ্চার এবং কিছু ক্ষেত্রে তার অবস্থান মার্কিন নীতির বিরুদ্ধেও যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের সমস্যা সমাধানের পথ নিয়েও ভাবছেন মাহাথির।

এখনও এক মাসও অতিবাহিত হয়নি মাহাথির ইতিমধ্যে তার এসব ভাবনা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের একাংশের সঙ্গে সম্মেলনও করে ফেলেছেন। ‘কুয়ালালামপুর সামিট-২০১৯’ নামের এই অনুষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৮ থেকে ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। মালয়েশিয়ার ওই সম্মেলনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের নেতারা যোগ দেয়। যারা অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আপত্তিকর। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, ইরান ও কাতার। মালয়েশিয়া অবশ্য পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াকেও এর মধ্যে ডেকেছিল। কিন্তু সৌদি আরবের বিরোধিতার কারণে এই দুই দেশের শীর্ষ নেতারা ওই সম্মেলনে যোগ দেননি। যদিও তারা প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

সংবাদ ভাষ্যকাররা অবশ্য বলেছেন যে, ইসলামি বিশ্বের ওপর সৌদি প্রাধান্যের বিরুদ্ধে লড়াই করাই ছিল এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রকৃত কারণ। সম্মেলনের আয়োজক মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এ ধরনের দাবি প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও এতে সই হওয়া চুক্তিগুলো ওই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ইরানসহ এই ৫ দেশের ৪টিই সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রাধান্যবিশিষ্ট ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য হলেও তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সেইসাথে ব্যাপক অর্থে ওআইসিরও বিরোধী।

গত কয়েক দশকে সৌদি আরব ও ইরান বেশ কয়েকবারই একে অপরের প্রভাব হ্রাস করার জন্য প্রক্সি ওয়্যারে সম্পৃক্ত হয়েছে। অধিকন্তু কাতারের অংশগ্রহণকে সৌদি নেতৃত্বাধীন ও আমিরাত, মিসর ও বাহরাইনের অনুমোদিত দুই বছরের অবরোধকে প্রতিরোধের চিহ্ন বলে বিচেনা করা যেতে পারে। সৌদি আরবের সাথে কাতারের বিরোধের মূল কারণ দেশটির নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা। এই নীতি সৌদি আরব ও আমিরাতে রাজনৈতিক ইসলাম নীতির চেয়ে ভিন্ন। তবে আরব বসন্তের সময় বিপ্লবীদের পক্ষেই ছিল কাতার। আবার এই অবরোধের সময় কাতারকে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে তুরস্ক।

এদিকে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ক মুসলিম ইস্যুতে সোচ্চার হিসেবে নিজেকে ইসলামি দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এতে সৌদি আরবের নেতৃত্ব চাপের মুখে পড়ে যায়। একইভাবে বছরখানেক ধরে সৌদি আরবের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া উদ্বেগে রয়েছে সেদেশে ওহাবি প্রভাব বাড়া নিয়ে। আর ইন্দোনেশিয়ায় সৌদি বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা রয়েছে। তাছাড়া ওই দেশে ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকদের প্রতি করা আচরণ নিয়েও অসন্তুষ্টি রয়েছে। ফলে সৌদি আরব থেকে ইতোমধ্যেই মালয়েশিয়ার সৈন্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে, সৌদি তহবিলে গড়া সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র থেকেও মালয়েশিয়া সরে গেছে।

কুয়ালালামপুর শীর্ষ সম্মেলনে জোরালো রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রত্যাশা ছিল। আর সেটিই হয়েছে ভারতের সংবিধান ও নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি-বিরোধী (এনআরসি) বিক্ষোভের সমালোচনা করার মাধ্যমে। কেন বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে পড়ছে এর কারণ উদ্ঘাটন ও এ নিয়ে করণীয় ঠিক করতেই সম্মেলন ডাকা হয়। তবে ডলারের বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে স্বর্ণ ও পণ্য অদলবদল প্রথা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ সবাইকে চমকে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়টা বিবেচনা করছি। কাজেই এটি কার্যকর করতে একটি কলাকৌশলের খোঁজ পাব বলে আমরা আশাবাদী।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই ডলার ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর এই ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলারই আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার পর মাহাথির ইরানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাইরের হুমকি থেকে সুরক্ষা পেতে মুসলমান দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। সোলেইমানি হত্যাকে আইনবহির্ভূত আখ্যায়িত করে তিনি একে সৌদি গুপ্তহত্যার শিকার সাংবাদিক জামাল খোসোগির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকান্ড কেবল ওই দেশটির আইনবিরোধী তাই না, তাবত বিশ্বের আইনবিরোধী। জামাল খাসোগি হত্যাকান্ডের সঙ্গে এই ঘটনার মিল রয়েছে, সেটাও দেশের বাইরে ঘটেছিল বলে জানান এই নবতিপর প্রধানমন্ত্রী। সম্ভাব্য উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার হুশিয়ারি দিয়ে এই হত্যাকান্ডকে সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যায়িত করেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক এই প্রধানমন্ত্রী। ইরানের পক্ষে এমন শক্ত বিবৃতি খুব কমই পাওয়া গেছে।

মাহাথির এমনকি নিজ দেশের জন্য ক্ষতি কবুল করতেও কসুর করছেন না। কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘে সরব হওয়ায় ভারত মালয়েশিয়া থেকে অপরিশোধিত পাম তেল আমদানি বন্ধ করলেও তিনি তাতে নিজ অবস্থান ত্যাগ করেননি। উল্টো বলেছেন, টাকার কথা চিন্তা করে যদি আমরা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে যাই, তাহলে আমাদের একাহ্নেও অন্যায় ঠেকাতে পারব না।

প্রশ্ন হলো মাহাথির আসলে কী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন? তিনি কি মুসলিম বিশ্বের নেতা হতে চান? নেতা হয়ে কী করবেন, এই বয়সে তার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে! নাকি তিনি সত্যিই চান মুসলমানদের সংকট সমাধানে কিছু ভূমিকা পালন করতে। এর আগে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের একটি সংবাদমাধ্যম খোলার কথাও ভাবেন মাহাথির। তিন দেশ মিলে যৌথভাবে ইংরেজি ভাষায় টিভি চ্যানেলটি খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইসলামভীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর কথা ভেবেছিলেন তারা। এটা একটি ভালো ইঙ্গিত বহন করে যে, মাহাথির হয়তো নিজেকে মুসলিমদের মধ্যে অমর করতে চাইছেন, কিংবা বহুমেরুর বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনে ভূমিকা রাখতে চাইছেন তিনি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of