ম্যান্ডেলার দেশে বর্ণবাদ বাড়ছে!

দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসছে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালানো দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমস্যাটি দূর হয়ে যায়নি। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে দশকব্যাপী চলা একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, এ যুগেও দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ বর্ণবাদকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে মনে করে না। গবেষণাটি পরিচালনা করে দক্ষিণ আফ্রিকার বেসরকারি সংস্থা ইনস্টিটিউট অব জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের সমন্বয়ে গড়া একটি দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ার ইচ্ছা অনেকটাই কমতির দিকে।

বর্ণবাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা আজ বর্ণবাদ নির্মূলে সারা বিশ্বের আদর্শ। তবে দেশটির বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলার রেখে যাওয়া বর্ণবাদবিরোধী আদর্শে সম্প্রতি ফাটল ধরেছে বলে মনে হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর থেকে শুরু করে আজও বর্ণবাদের বিভাজনের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে ম্যান্ডেলার দেশের মানুষকে। বর্ণবাদের বিভাজন দূর করে সংহতি ফিরিয়ে আনতে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি) গঠন করেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। আজও কাজ করে যাচ্ছে এ কমিশন। তবে সামাজিক বিভেদ ঘুচছে না। উল্টো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের গবেষণা ও আর্কাইভ বিভাগের পরিচালক ভারনে হ্যারিস বলেন, ‘বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকল্প বিপদের মুখে আছে। মনে হয় দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ অতীতের হিসাব খুব দ্রুত মিটিয়ে নিতে চাচ্ছে। অনেক দেশ এর জন্য অপেক্ষা করে অন্তত ২০ বছর। তবে আমরা অপেক্ষা করতে পারলাম না।’ হ্যারিস জানান, সম্প্রতি জোহানসবার্গ, প্রিটোরিয়া, ডারবান, ভুলুমফন্টেনপোর্ট এলিজাবেথ ও কেপটাউনসহ বড় বড় অনেক শহরের বিভিন্ন সড়কের নাম পরিবর্তন করছে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার। যেটি বর্ণবাদকে উসকে দিচ্ছে।

নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর এই ধরণের চিন্তা কোনদিন করেননি। ম্যান্ডেলাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে এবং বর্ণবাদী আইন বাতিলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডিক্লার্কের ভূমিকা ছিল। ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ডিক্লার্ক। সেই ডিক্লার্কের নাম পরিবর্তন করছে বর্তমান সরকার। হ্যারিস বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বেশির ভাগ মানুষ আজও বর্ণবাদের বিভাজিত সমাজে বাস করে। এটা তাদের ক্ষুব্ধ করে। পুরনো বিভাজন এবং পুরোনো বর্ণবাদ এখন আরও স্পষ্ট। বর্ণবাদ মাথাচাড়া দেয়ায় অভিবাসীরাও শান্তিতে নেই দক্ষিণ আফ্রিকায়।

২০১৮ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যখন ম্যান্ডেলার দল ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি)’ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতায় আসে, তখন জাতীয় পর্যায়ে তারা মাত্র ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। যে কারণে অনেক অঞ্চলে বর্ণবৈষম্য নতুন মাত্রা ধারণ করেছিল এবং শ্বেতাঙ্গদের সাথে কৃষ্ণাঙ্গদের আরও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এর ফলে শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অর্থনৈতিক জগত থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা তেমন কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ৭১ শতাংশ সম্পদ মাত্র ১০ শতাংশ ধনিক শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে, অপরদিকে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করা ৬০ শতাংশ মানুষের দখলে রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ সম্পদ। আর মধ্যবিত্ত ৩০ শতাংশের দখলে রয়েছে বাকি ২২ শতাংশ সম্পদ।

স্থানীয়রা বলেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ লোক ক্লান্ত দেহে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে, সেই পরিসংখ্যানটা অত্যন্ত দুঃখজনক। যে ক্ষুদ্র অংশটি দেশের উন্নয়নের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, তারা মূলত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী। শ্বেতাঙ্গরা এখনো অভিজাত শ্রেণী হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দারিদ্র্যের মাত্রা অনেক বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মারে লিবব্র্যান্ড, যিনি ২০০৮-১৭ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক অগ্রগতি নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজাত শ্রেণীর অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ, অন্তত শীর্ষ ৫ শতাংশ। আমরা এখন এমন এক পথে হাঁটছি যেখানে বৈষম্যহীন সমাজের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। এই সমাজে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমাগত দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক তথ্যচিত্রে দেখা যায়, দেশটির শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদগুলোর ৬৭ শতাংশ শ্বেতাঙ্গদের দখলে। আর কৃষ্ণাঙ্গদের দখলে মাত্র ১৪.৩ শতাংশ। অন্যদিকে যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদগুলোর ৭০ শতাংশ শ্বেতাঙ্গদের দখলে, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের পদগুলোর ৭০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গদের দখলে। এই সামগ্রিক চিত্র বলে দেয়, বর্ণবৈষম্যকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের মধ্যে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। এই লড়াই যেকোনো সময় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকরা এর আশু কোনো সমাধান দেখছেন না। অধ্যাপক মারে লিবব্র্যান্ড বলেন, এটি এমন এক জটিল পরিস্থিতি, যেখানে আপনি চাইলেও দ্রুততর কোনো সমাধান দিতে পারবেন না, কেননা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থা দায়ী। তবে এর সমাধানে সকল ধর্ম-বর্ণের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of