নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এগিয়েছে পাকিস্তান

পাকিস্তানের পরিচয়ই দাঁড়িয়ে গেছে এরকম যে, সন্ত্রাস কবলিত দেশটির অর্থনীতি বিধ্বস্ত। সেখানকার শাসকরা ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়েই কোনো রকমে টিকে আছে। ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে জানা যায়, দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বেইল আউট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া মাত্র দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ছিল তাদের। আগের বছর পাকিস্তানের মুদ্রা মানের ২০% পতন ঘটে। এতে অর্থনৈতিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। অন্যদিকে মাসের পর মাস কোন চুক্তি ছাড়াই ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা চলে। এই অবস্থায় পাকিস্তান পড়ে মহাসংকটে। গত দশকে তুরস্ক ও হাঙ্গেরির সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে।

ডলারের মজুত বাড়ানোটা ছিল তখন তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেল, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। তাই অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখতে শিগগিরই আইএমএফের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেয়াটা দরকারি ছিল। কিন্তু আইএমএফ যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কার চায় পাকিস্তান সরকার তাতে রাজি না হওয়ায় সাহায্য করার প্রশ্নটি আটকে যায়। ফলে তহবিলের জন্য পাকিস্তান বন্ধু দেশগুলোর দ্বারস্থ হয়। চীন, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো পাকিস্তানের সহায়তায় এগিয়ে আসে। এরই মধ্যে পাকিস্তান ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা আদায়ে সক্ষম হলেও দেশটির অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান হয়নি। উল্টো পাকিস্তানের ব্যাংকিং খাতকে ‘নেতিবাচক’ মার্কিং করে মুডি র‌্যাংকিং।

পাকিস্তান এরপর শান্ত ছেলের মতো যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের পরামর্শ অনুসরণ করেছে এবং আইএমেফের দেয়া শর্তগুলোও মেনে নিয়েছে। ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নীতিগত কিছু পরিবর্তন এসেছে। বাজেট ঘাটতি কমানের জন্য ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে। ব্যবসায় সুবিধার জন্য কর আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর এসব পদক্ষেপের কারণে এখন বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে, এমনকি স্বয়ং আইএমএফ কর্তৃকও প্রশংসিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভঙ্গুর অর্থনীতির এই দেশ।

আইএমএফ বলছে যে, পাকিস্তানের শিল্প ও সামাজিক খাতের উন্নয়ন হয়েছে এবং চলমান অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচি সঠিক পথে চলছে। সেখানে নিযুক্ত আইএমএফের আবাসিক প্রতিনিধি মারিয়া তেরেসা দাবান সানচেজ বলেছেন, পাকিস্তান সরকার এখন আইএমএফের সহায়তায় শক্তিশালী ও দৃঢ় অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যাপারে দঢ়প্রতিজ্ঞ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর্থিক নীতি ও সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, বছরের প্রথম কোয়ার্টারে সেটা অর্জিত হয়েছে। কর্মসূচি সঠিক পথে রয়েছে এবং নীতি থেকে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে।

আইএমএফ প্রতিনিধি বলেন, পাকিস্তান আজ যে সব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে, সেগুলো বহু বছর ধরে চলে আসা ভারসাম্যহীন নীতির ফল। এতদিন শুল্ক খাতে কোন সমন্বয় ছিল না, চক্রাকার ঋণ ছিল, নীতি রেট ছিল নেতিবাচক পর্যায়ে। সম্ভবত কিছু ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। আর্থিক ঘাটতি ছিল অনেক বেশি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে সেটা পরিশোধ করা হচ্ছিল। সেসব থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশের ভুল নীতিগুলো পাল্টে দিচ্ছে এবং লাভজনক নীতিগুলো বাস্তবায়ন করছে। এই প্রক্রিয়ার কারণে অর্থনীতির কিছু ধীর হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পরিবর্তনের সাথে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এটা। আমাদের বিশ্বাস যে, এর ফলে মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে।

১৯ ডিসেম্বর আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড ৩৯ মাস দীর্ঘ বর্ধিত ফান্ড ফ্যাসিলিটির অধীনে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক তৎপরতার প্রথম রিভিউ শেষ করেছে। পাকিস্তানের জন্য আইএমএফ যে ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এই রিভিউয়ের পর পাকিস্তান সেখান থেকে ৪৫২.৪ মিলিয়ন ডলার হাতে পেয়েছে। ফলে এই নিয়ে পুরো ছাড় করা হলো ১ হাজার ৪৪০ মিলিয়ন ডলার। তবে পাকিস্তানের কর ব্যবস্থায় আরও উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আইএমএফ বলছে, প্রত্যেক ব্যক্তি এবং সকল খাতকে করের আওতায় আসতে হবে। কর সিস্টেম হতে হবে সহজ, স্বচ্ছ এবং দক্ষ, যাতে সবার উপর এটা প্রযোজ্য হয়।

পাকিস্তান এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে মনে করে আইএমএফ। মারিয়া তেরেসা দাবান সানচেজ বলেন, পাকিস্তান তাদের নিরাপত্তার কঠিন বছরগুলো পেছনে ফেলে এসেছে। এখন এটা ব্যবসায়িক সম্প্রদায় এবং সমাজের সাধারণ মানুষের সময় যাতে তারা এই নতুন সময়কে উপভোগ করতে পারে এবং পাকিস্তানের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে।

পাকিস্তানে যে ২০১৯ সালে নিরাপত্তা বেড়েছে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে নিরপেক্ষ সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিআরএসএস) এক সমীক্ষায়। দেশটিতে সন্ত্রাস সংশ্লিষ্ট প্রাণহানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩১ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। মিডিয়া প্রতিবেদন ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে থিঙ্ক ট্যাঙ্কটি ঘোষণা করেছে, উত্তপ্ত বেলুচিস্তান প্রদেশে জঙ্গি ও বিদ্রোহীদের দ্বারা সবচেয়ে আক্রান্ত এলাকা হলেও তা সত্তে¡ও প্রাণহানি ব্যাপকভাবে প্রায় ৪৪.২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে ৪০৫ জন নিহত হয়েছিল, সেখানে ২০১৯ সালে হয়েছে ২২৬ জন। একইভাবে ইতিবাচক নিরাপত্তা পরিকল্পনার ফলে সব অঞ্চলের লোকজনই কম হতাহতের শিকার হয়েছে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of