আবারও ক্ষেপণাস্ত্র রাজনীতিতে মন দিচ্ছেন কিম জং

বেশ কিছুকাল শান্ত ছিল কোরীয় উপদ্বীপ। শোনা যাচ্ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের বচসা। এর মধ্যে দুই কোরিয়ার নেতারা বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছেন। দুই কোরিয়ার মধ্যে ফুটবল খেলাও হয়েছে, যদিও দর্শকবিহীন। এদিকে ট্রাম্প আর কিম যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা থেকে উঠে এসে একে অপরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ২০১৯ সালজুড়ে তাই যুক্তরাষ্ট্র-কোরিয়া দ্বন্দ্ব ছিল প্রায় স্তিমিত। কিন্তু সেই মধুচন্দ্রিমার কাল বোধহয় এবার শেষ হতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বেঁধে দেয়া তারিখের মধ্যে কোনো ইতিবাচক উত্তর না পাওয়ায় কিম এখন আবারও তার সেই পুরনো ক্ষেপণাস্ত্র রাজনীতিতে মন দিচ্ছেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে এসে ডিসেম্বর মাসে দলীয় এক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কিম জং উন। তিনি সম্মেলনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সাধারণত বছরের এই সময়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের এমন সম্মেলন হয় না। তাই পিয়ংইয়ংয়ে কয়েক দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ রাখা দক্ষিণ কোরিয় বিশেষজ্ঞরা। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওই সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে কিম জং উন দেশের সার্বভৌমত্ব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ও আগ্রাসী পদক্ষেপের ডাক দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার সমাপ্তি টানতে পারে বলে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে তা শিঘ্রই সত্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা ফের শুরু করে দিতে পারে বলেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কিম জং উন তার দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগ্রাসী পদক্ষেপের ডাক দিলেন। তার এই ডাককে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে পিয়ংইয়ং হুমকি দিয়ে রেখেছিল। তারা বলেছিল, বছরের শেষ নাগাদ ওয়াশিংটন যদি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় কোনো ধরনের ছাড় দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পিয়ংইয়ং ‘নতুন পথ’ বেছে নেবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের পারস্পরিক মুগ্ধতার কাল বিগত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার ও নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে যে ধারণা ছড়িয়েছে, তাতে করে কিম উনের পক্ষে আর ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তারা আবার নিজের পথেই ফিরে যাচ্ছে। নতুন করে পরমাণু কর্মসূচি শুরুর কথা ভাবছেন কিম। তেমনটি হলে উত্তর কোরিয়া আবারও বেইজিংয়ের ঘরেই প্রবেশ করবে। যুক্তরাষ্ট্র খুব করেই চাইবে, তেমনটি যেন না হয়। কিন্তু শান্তিচুক্তিতে দু’দেশ সম্মত না হতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল উত্তর কোরিয়ার সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আরেকটি ফ্রন্টে চীনের কাছে হেরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ট্রাম্পের মতো উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে বোঝাও বড় মুশকিল। তিনি কখন কী করে বসেন, তার ঠিকঠিকানা নেই। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি তার সাময়িক ভালো মানুষির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন চলতি বছর। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আগ্রাসী নীতি গ্রহণের ডাক দেয়ার মাধ্যমে এর মধ্যে সেই আভাস খানিকটা দিয়েও রেখেছেন তিনি। কিম জং উনের আগ্রাসী হওয়ার মানে খুব সহজ। উত্তর কোরিয়া হুটহাট পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে। এই হুমকির ধারাবাহিকতায় ভিন্নভাবে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছেন কিম জং উন। নতুন বছরের শুরুর দিন তিনি সোজাসাপ্টা বলেছেন, পরমাণু ও আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্রে তার দেশ কোনো বাধ্যবাধ্যকতার মধ্যে নেই। শুধু তাই নয়, উত্তর কোরিয়া নতুন কৌশলগত অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোরও হুমকি দিয়েছে।

তবে এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ওপর যে স্থগিতাদেশ ছিল তা তুলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কিম। কিম জং উন বলেন, তার দেশ খুব শিগগিরই নতুন কৌশলগত অস্ত্র তৈরি করবে। একই সঙ্গে আলোচনার দরজাও খোলা রাখা হবে। তবে আলোচনাটা কেমন হবে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর নির্ভর করবে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই একটাই দাবি করে আসছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং পুরোপুরি পরমাণু কর্মসূচি বাতিল না করায় শেষ পর্যন্ত দু’দেশের মধ্যে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফল হিসেবে ২০১৯ সালের শেষের দিকে বেশ কিছু হালকা অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলার চেষ্টা করতেই এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। নতুন করে দেশটি আবারও এ ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে যাওয়ার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে তারা ছাড় দিতে চাইছে না। ২০১৭ সালের পর কোনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি উত্তর কোরিয়া। তারা কিছু একটা হওয়ার আশা করেছিল। তবে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত রাখলেও তা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে কখনোই রাজি হয়নি উত্তর কোরিয়া। এখন নতুন করে এ ধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা চালালে তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষীপ্ত করে তুলতে পারে। কিন্তু কিম তবু ট্রাম্পকে বাগে আনতে অস্ত্রের খেলাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। বছরের প্রথম দিন এক সভায় কিম জং উন বলেছেন, উত্তর কোরিয়া পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর স্বঘোষিত স্থগিতাদেশ চালিয়ে যেতে বাধ্য নয়। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব এবং ইরানী জেনারেলকে হত্যার পর পরমাণু আলোচনা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার সন্দেহ বাড়ারই কথা।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of