স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিব-এর চেয়ে একজন তাজউদ্দীনের গুরুত্ব

স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিব-এর চেয়ে একজন তাজউদ্দীনের গুরুত্ব

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রাম নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যতটা যোগ্য, ঠিক ততটাই অযোগ্য ছিলেন রাষ্ট্র পরিচালনায়। পরাধীন দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ভাষন, ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে ২৫ই মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাদের হাতে বন্দী হন বঙ্গবন্ধু। এবং সেদিন রাতেই ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানি নরঘাতক সেনাপ্রধান টিক্কা খানকে নির্দেশ দেন, যেন ঢাকার বুকে রাতের আঁধারে বাঙালির উপর অপারেশন সার্চলাইট চালানো হয়। এরপর গেল ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। তারপর বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করা এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। উন্নত শিরে এখান থেকেই বঙ্গবন্ধুর সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা করেননি। ক্ষমতা লোভী বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মহানায়ক হয়ে গিয়ে ভেবে পাচ্ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন নাকি প্রধানমন্ত্রী হবেন? কোন পদে অধিষ্ঠিত হলে তাঁকে ঠিক শোভা পাবে? ভাষন একটা দিয়া তিনি মনে করেছিলেন, গোটা একটা দেশ স্বাধীন কইরা ফেলাইছেন! তার তো প্রতিদান একটা লাগবোই। তাই না? বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন, তখন তিনি জানতেনই না পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীরা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বদ্বীপটিতে কি নৃশংস ভয়াবহ গনহত্যা চালানোর আয়োজন করে রেখেছে! সেই সময় তাজউদ্দীন আহমেদ শাসক দলের পুরো একটা হানাদার বাহিনীর বিপরীতে অদম্য সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছিলেন মুজিব নগর সরকার। তার মানে তাঁর এই মুজিব নগর সরকার মানেই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক আরো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করলো। যেই রাষ্ট্রের সরকার মুজিব নগর সরকার। ২৫ই মার্চ রাতের পর গ্রেপ্তারকৃত বঙ্গবন্ধুর প্রতি কতটা শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্যে তথা পুর্ব বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন? তা একটু আন্তাজ করুন। এবং সেই সময় মুজিব নগর সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। আর বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধু তো গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানের জেলে ছিলেন। আর তাজউদ্দীন সাহেব বাইরে থেকে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে শুরু করে, ভারতের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে মুক্তিবাহিনী গঠন থেকে শুরু করে ভারতের কাছ থেকে যুদ্ধ করার সমরাস্ত্র, সমরবাহিনী আদায়, আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ, মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো যতসব ভয়ংকর চাপ সামলে নিয়েছিলেন । এবং তাতে নিঃশর্ত সমর্থনও দিলেন লৌহ মানবী ইন্দিরা গান্ধী। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে এসে বঙ্গবন্ধু দেখেন ওমা তাজউদ্দিন তো প্রধানমন্ত্রী! তাঁকে রাখা হয়েছে রাষ্ট্রপতি পদে। তাঁর মনে হতে থাকলো রাষ্ট্রপতি তো একটা টুটো জগন্নাথ, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন কেন প্রধানমন্ত্রী হবেন? আমিই দেশের হব প্রধানমন্ত্রী! তারপর নির্লজ্জের মতো তাজউদ্দীনকে সরিয়ে দিয়ে তিনিই হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর তাজউদ্দীনকে দেন অর্থমন্ত্রীর পদ। কি লোভ! কি লোভ! আজ যদি তাজউদ্দীনের জায়গায় বঙ্গবন্ধু হতেন তাহলে কি এই লোভ সামলে তিনি তাজউদ্দিনের সব কথা মেনে নিতেন? প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাদ করতেন? পুরো বিশ্ব এখনো জানে যে, বঙ্গবন্ধুই হলো বাংলাদেশের সৃষ্টির মূল কারিগর। কারন সেই সময় পুরো বিশ্বের মিডিয়ার চোখগুলো বঙ্গবন্ধুর দিকে ফোকাস করেছিলো। এমন কি পাশের দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও জানতেন যে, মুজিব ছাড়া বুঝি স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করার আর কেউ নেই! কিন্তু পুরো বিশ্ব এটা জানে না যে, বাংলাদেশ জম্ম দেয়ার নৈপথ্যের কারিগর ছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ অসম্প্রদায়িক চেতনার নির্লোভ মানুষ মহামতি তাজউদ্দীন আহুম্মেদ। একটা হায়েনার মতো হিংস্র হানাদার বাহিনীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনিই দীর্ঘ ৯ মাস ধরে মুজিব নগর সরকার পরিচালনা করেছিলেন। এটা শুধু চাট্টি নয় আটটি খানি কথাও নয়।

আবারও বলছি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মোটেও দক্ষ ছিলেন না। একটা ধর্মনিরপেক্ষ ও অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনার জন্য যেটুকু মেধা ও সততার প্রয়োজন তা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিলো না। কিন্তু সেই সততা ও মেধা তাজউদ্দিন আহম্মেদের মধ্যে শতভাগ ছিলো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিশ্ব মুসলিমদের ইসলামী সংস্থা ওআইসিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধুর অন্তরঙ্গ হতে হয়। অথচ এই ভুট্টোই ৭০এর নির্বাচনে পুরো পাকিস্তানে আওয়ামিলীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবার পরেও ইয়াহিয়া খানকে বলেছিলেন, মুজিবকে যেন ক্ষমতা হস্তান্তর না করে। যুদ্ধের পর সেই মুজিব গেছেন ভুট্টোর সাথে দহরম মহরহ ভাব করতে! মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ওআইসির সদস্যপদ হতে। এই জায়গায় যদি তাজউদ্দিন আহম্মেদ হতেন তাহলে এই চিত্র আমাদের দেখতে হতো না। শেখ মুজিব পাকিস্তান জেলে থাকা কালীন তাজউদ্দিন আহম্মেদ যেভাবে তাঁর সর্বোচ্চ সম্মানের পদ রাষ্ট্রপতি পদটি আগলে রেখেছেন, স্বদেশে এসে তাজউদ্দীনের প্রতি সেই কৃতজ্ঞতাটুকু পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু দেখালেন না। একেই বলে অকৃতজ্ঞ!

স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এবং তাঁর ডাকে মুক্তিকামী বাঙালীর বুকে মুক্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। এই জন্য বঙ্গবন্ধুকে অবনত শিরে শ্রদ্ধা জানায়। খুব সম্মানের সাথে তাঁর পায়ের ধুলি গ্রহন করি। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দেশটি নেতৃত্ব দেয়ার জন্য এদেশে প্রয়োজন ছিল তাজউদ্দিন আহম্মেদেকে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অসম্প্রদায়িক চিন্তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অপরিহার্য ছিল। এই জায়গায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন পুরোপুরি অদক্ষ, অপরিপক্ক। স্বাধীনতা পর দেশদ্রোহী রাজাকারও তাঁর ভাই হয়ে যায়। মোস্তাক বিশস্ত হয়ে যায়। যদি তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলি তাহলে কি ভুল বলা হবে? সমাজতন্ত্রের আদলে একটা গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে একজন রাষ্ট্রনায়কের যে পরিমান অসম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা থাকা উচিত, তা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিলো না। কিন্তু তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে পুরোপুরি তা ছিলো। তাই আমি মনে করি প্রকৃত বঙ্গবন্ধু হলেন তাজউদ্দীন আহম্মেদ। পৃথিবীতে যতদিন বাঁচি, বাঙালী জাতীয়তাবাদ যতদিন আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে বাস করবে, যতদিন বাংলার স্বাধীনতা আমার কাছে নিনাদিত হবে, ততদিন আমার চেতনায় বঙ্গবন্ধু হয়ে থাকবেন তাজউদ্দীন আহম্মেদ, শেখ মুজিবর রহমান নয়।

ফেসবুক মন্তব্য

১ thought on “স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিব-এর চেয়ে একজন তাজউদ্দীনের গুরুত্ব

  1. এতদিন ধ’রে যে ভাবনা ও মতটিকে লালন ক’রে আসছিলাম ( দু’একটি লেখায় হয়তো প্রকাশও করেছি ), আজ এত বছর পর তার মুদ্রিত প্রকাশ দেখতে পেলাম । অজস্র ধন্যবাদ !!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 − = 75