মাননীয় প্রধানমন্ত্রী : আমাদের শিক্ষানুভূতি আজ আঘাতপ্রাপ্ত !!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাদের শিক্ষানুভূতি আজ তীব্রভাবে আঘাতপ্রাপ্ত!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার ধর্মানুভূতি যেমন আছে আমাদেরও আছে শিক্ষানুভূতি। আমরা অশিক্ষিত এবং মূর্খ নই। আমাদের শিক্ষার ওপর আঘাত আসলে তার দায়ও আপনাকে নিতে হবে। আপনার প্রশ্রয় পাওয়া মোল্লা-মাওলানারা যখন ভুল তথ্য পরিবেশন করবে বিশাল জনসমাগমে, এরা যখন বিজ্ঞান শিক্ষাকে বারটা বাজিয়ে দিবে, তখন এর জবাবদিহিতা আপনাকেই করতে হবে সবার আগে। কারণ, মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আপনি সাফাই গেয়েছেন ধর্মের, সাফাই গেয়েছেন কথিত ধর্মানুভূতির!

কাজী ইবরাহীমের মতো অশিক্ষিত মোল্লা মাওলানা যখন ঠিক ভাবে ’এন্টার্কটিকা’ নামের মহাদেশের নামটিই উচ্চারণ করতে পারে না, তখন টিভি পর্দার সামনে বসে এন্টার্কটিকা মহাদেশ নিয়ে যেসব ভুলভাল মিথ্যে তথ্য জাতির সামনে বলেছে এই ব্যক্তি, তখন আমাদের শিক্ষানুভূতিতে চরমভাবে আঘাত লেগেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এই মূর্খ-বৃদ্ধ যখন বাংলাদেশের শিশুদের ভ্যাকসিন কার্যক্রম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে জাতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার উপক্রম করেছে, তখন আমাদের শিক্ষানুভূতিতে তীব্রভাবে আঘাত লেগেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দয়া করে বলবেন কি, আপনি এদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?

বাংলাদেশের প্রথম নভোচারী হিসেবে রকেটে চড়া অবশ্যই গর্বের বিষয়, কিন্তু জীবনে রকেট প্রত্যক্ষ না করেও তারেক মনোয়ারের মতো মূর্খ উন্মাদ মোল্লা-মাওলানারা যখন রকেটে চড়ার মিথ্যে দাবি করে, তারা যখন সহস্র অশিক্ষিত লোকসমাগমকে মুগ্ধ করার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশের বিজ্ঞান চর্চাকে হেয় প্রতিপন্ন করে, তখন আপনি কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত একটি গিরিখাত। এই গিরিখাতের দৈর্ঘ্য ২৭৭ মাইল (৪৪৬ কি.মি.) এবং প্রায় ১৮০০ মিটার গভীর। ৪৪৬ কিলোমিটার বিস্তৃত গিরিখাতটি কি প্রমাণ করে যে, পৃথিবী নামের গ্রহটিকে কোন এক সময়ে কেউ দ্বিখণ্ডিত করেছিল? না, অবশ্যই এটা প্রমাণ করে না। বরং ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এটাই উপস্থাপন করে যে, টেকটোনিক প্লেটগুলির অবস্থানের পরিবর্তনের বহুবিধ ফলাফলের একটি হচ্ছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন নামের বিশাল এবং দীর্ঘ ফাটলের ন্যায় প্রাকৃতিক গিরিখাতের উৎপত্তি।

চাঁদের বুকে মহাশূণ্য ও ভূ-তাত্ত্বিক জনিত কারণে এলোমেলোভাবে বিস্তৃত বহু ফাটল আছে, কিন্তু এর কোনটিই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ধারে কাছে নেই। অ্যাপোলো ১১ এর চন্দ্র অভিযান শেষে নীল আর্মস্ট্রং যে ফাটলের উল্লেখ করেছিলেন, তার দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৩০ মিটার, যাকে বলা হয় ”লিটল ওয়েস্ট লুনার ক্রেটার”। এপলো ১১ এর নভোযাত্রী নীল আর্মস্ট্রং যে লুনার ক্রেটার বা ফাটলের কথা বলেছেন তা ”বোউল আকৃতির খাত”, পৃথিবীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো দীর্ঘ-লম্বা গিরিখাতের মতো কিছু নয়। সবকিছু মিলিয়ে এটা কখনোই প্রমাণ করে না যে, পৃথিবীতে বসে কেউ একজন কোনকালে চাঁদকে দুই টুকরো করেছিলেন!

আরো সহজ করে যদি বলি, চাঁদ দুই টুকরো হলে তা কেবল আরব-জাতি দেখবে, এমন নয়; বরং দেখবে সমস্ত বিশ্বের মানুষ। এমন অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ কেবল আরবের বইপত্রে উল্লেখ থাকবে, এটাও হতে পারে না; বরং উল্লেখ থাকতো সভ্য রোমানদের ইতিহাসে, অপেক্ষকৃত উন্নত গ্রিকদের ইতিহাসে, পারস্যের ইতিহাসে, আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে।

আবার, ভৌগোলিক বিষয়ের কথা যদি চিন্তা করি, চাঁদ যদি দ্বিখণ্ডিত হয়, তবে চাঁদের কারণে যে জোয়ার ভাটা হয়ে থাকে, তা ব্যহত হতো সর্বত্র! স্রোতের গতিপথ উলট পালট হয়ে যেত! শুধু তাই নয়, পৃথিবীর স্বাভাবিক ঘূর্ণনগতিও ব্যহত হয়ে মানব সভ্যতা বিপর্যয়ের মুখে পতিত হতো। সুতরাং মিজানুর রহমান আজহারী নামের যে অশিক্ষিত-মূর্খ-উজবুক ব্যক্তি নীল আর্মস্ট্রং এর রেফারেন্স দিয়ে, যে মিথ্যে গল্পকে সত্যি করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে, তা বিজ্ঞান শিক্ষার সম্পূর্ণভাবে পরিপন্থি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিজ্ঞানকে বারটা বাজানো আপনার এই অজ্ঞ-মূর্খ মোল্লা-মাওলানাদের সামলাতে যদি আজ ব্যর্থ হন, তবে এই দেশের বিজ্ঞান চর্চা একদিন চরমভাবে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।

কেবল এতটুকুতেই শেষ নয়, মূর্খ মিজানুর রহমান আজহারী আরো দাবী করেছে, নীল আর্মস্ট্রং নাকি চাঁদের বুকে আযান শুনেছে!! বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত বিষয় এই যে, নিরবিচ্ছিন্ন মাধ্যম ছাড়া যেমন, বায়ু মাধ্যম ছাড়া শব্দ চলাচল করতে পারে না, তার মানে চাঁদের বুকে আযান-টাযান জাতীয় কোন শব্দ শোনার গল্প সম্পূর্ণভাবে অবান্তর! নীল আর্মস্ট্রং কর্তৃক এ ধরণের কোন বক্তব্য দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। অতএব, মিজানুর রহমান আজহারী নামের মূর্খ লোকটি ধর্মের বয়ানের আড়ালে এভাবে ভুল তথ্য পরিবেশন করে কিশোর-যুবক-শিক্ষার্থীদেরকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করছে। ধর্মভীরু দেশে ধর্মের বয়ানের আড়ালে এভাবে ভুল বক্তব্য একের পর এক উপস্থাপন করে, এরা সমগ্র জাতিকে বিভ্রান্ত করে চলেছে, বিজ্ঞান শিক্ষা বিমুখ করে তুলছে, আর পদার্থ বিজ্ঞানের রীতিমত বারটা তো বাজিয়েই দিয়েছে!

আমাদের বিজ্ঞান ভালবাসার অনুভূতি আজ ভয়াবহভাবে আঘাত প্রাপ্ত এবং আক্রান্ত হয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! এইসব কাঠমোল্লাদের বিরুদ্ধে কী কী শাস্তির ব্যবস্থার করবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

আপনি জাতীয় সংসদের দাঁড়িয়ে জীবনে একটিবারের জন্যে কি বলবেন, ধর্মের নামে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আঘাত করা যাবে না। আপনি কি ব্যবস্থা নিবেন, এই সব কাঠমোল্লা-মাওলানাদের ভুল তথ্য আর অপবিজ্ঞান ছড়ানোর বিপরীতে? আপনি কি পারবেন, মাননীয় বাংলাদেশের শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী?

বিশাল জনসমাগমে মেয়েদেরকে ক্লাশ থ্রি ফোরের বেশী না পড়ানোর ওয়াদা করিয়েছিল এক ব্যক্তি, যার সাথে আপনি হাত মিলিয়েছিলেন একদিন! ঐ অথর্ব বদ বৃদ্ধটির বিরুদ্ধে লোকদেখানো দুটো মৃদু ধমক ছাড়া আপনি আর কোন ব্যবস্থা নেন নি সেদিন! আমরা চেয়ে চেয়ে আপনার অধ:পতনটুকু দেখে আহত হয়েছি বারবার। আজকে তবুও কি আমরা একজন উচ্চ শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা রাখতে পারি?

রাষ্ট্রবিরোধী, বিজ্ঞানবিরোধী, আধুনিক জাতি গঠনের অন্তরায়, ঐসব ধ্বংসাত্মক কাঠমোল্লাদের অজ্ঞতায় ভরা বক্তব্যের বিপরীতে আমরা আজ তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি, কারণ আমাদের শিক্ষানুভূতি আজ দারুণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম আজ ভুল তথ্যের মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ার পথে!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of