মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের মনস্তাত্ত্বিক হামলা অব্যাহত

ইরানের জেনারেল কাশেম সোলেইমানিকে হত্যার পর দেশটির শাসকরা জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে না হঠানো পর্যন্ত তারা থামবে না। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সোলেইমানি নিহত হওয়ার জবাবে ইরান মার্কিন সৈন্যদের দুটি ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং যুদ্ধ চায় না বলে জানিয়ে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের পূর্ব হুমকি অনুযায়ী মার্কিন সৈন্যদের ওপর হামলা জারি আছে। হামলা হয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উত্তরে অবস্থিত আল বালাদ ও তাজি সামরিক ঘাঁটিতে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতি সীমিত বা নেই বললেই চলে। তবে এর মনস্তাত্তি¡ক প্রভাব ভয়াবহ, এটা চলতে থাকলে সৈন্যরা মনোবল হারাবে।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উত্তরে ‘তাজি’ সামরিক ঘাঁটিতে কয়েকটি রকেট হামলা করা হয় ১৪ জানুয়ারি। ওই এই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে ইরাকের সামরিক বাহিনী। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাইলস ক্যাগিন্স থ্রি এক টুইট পোস্টে বলেন, তাজি ঘাঁটিতে চালানো হামলায় জোট বাহিনীর কোনো সেনা হতাহত হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তাজি ঘাঁটিটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। সাদ্দাম আমলে গোপন অস্ত্রসম্ভারের ঘাঁটি ছিল এটি। এর অবস্থান সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলে। যে কারণে ঘাঁটির খুব নিকটে ইরানের মিত্ররা জোরদার অবস্থান নিতে পারে না।

ইরাকি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির বার্তা সংস্থা আইএনএ বলেছে, ইরাকের সালাউদ্দিন প্রদেশের দক্ষিণে মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রিত ‘বালাদ’ বিমান ঘাঁটিতে এ পর্যন্ত দুই দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ১২ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় হালমা হলে ইরাকের নিউজ টেলিভিশন চ্যানেল ‘আল ফোরাত’ জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কী ধরণের ক্ষতি হয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাগদাদ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে আল-বালাদ বিমানঘাঁটিতে ছোট ধরনের ৮টি কাতিউশা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এর কয়েকটি আঘাত হেনেছে বিমানঘাঁটির একটি রেস্তোরাঁয়। অন্যগুলো আঘাত হানে উড়োজাহাজের রানওয়ে ও বিমানঘাঁটির ফটকে। হামলায় ইরাকের দুই কর্মকর্তা ও দুই পাইলট আহত হয়েছেন। গত কয়েক দিনে এ নিয়ে দ্বিতীয় বার বালাদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলো।

এর আগে ৯ জানুয়ারি তারিখেও সেখানে হামলা হয়। সেদিনও ওই বিমান ঘাঁটিতে কয়েকটি কাতিউশা রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছিল। বালাদ ঘাঁটিটি হচ্ছে ইরাকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটি। এটি ইরাকের এফ-১৬ বিমানের প্রধান ঘাঁটি । বিমান সক্ষমতা বাড়াতে এসব বিমান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। মার্কিন ঠিকাদারসহ দেশটির বিমান বাহিনীর একটি দল এই ঘাঁটিতে অবস্থান করছে। যদিও গত দুই সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে বড় একটি সংখ্যক অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন উপদেষ্টা এবং স্যালিপোর্ট ও লকহিড মার্টিনের কর্মীদের ৯০ শতাংশ তাজি ও ইরবিল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মীরা বিমান ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সেখানে ১৫ জনের বেশি মার্কিন সেনা ও একটি বিমানের বাইরে কিছু নেই। বাকিরা চলে গেছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে এসব হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে এক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় এর বিচার চেয়েছে ওয়াশিংটন। ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও টুইটারে বলেছেন, ইরাকি বিমানঘাঁটিতে আবার হামলার খবরে আমরা ক্ষুব্ধ। ইরাকি সরকারের অনুগত নয়, এমন গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে অব্যাহতভাবে ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা শেষ হওয়া উচিত। এই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে ইরাকের সরকারের প্রতি আহবান জানাই।’

ইরাকের সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, গত ৩ জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন সেনাদের হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা বেড়ে গেছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করছে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহতের পর ‘চরম প্রতিশোধ’ নিতে মঙ্গলবার রাতে ইরাকে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ হুঁশিয়ারির মধ্যেই ইরাকে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ছোটখাটো হামলা চলছেই।

সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এসব হামলা আসলে মনস্তাত্তি¡ক। মধ্যপ্রাচ্য ও ইরাকের ঘাঁটিগুলোতে থাকা মার্কিন সেনাদের সারাক্ষণ ক্ষেপণাস্ত্র হানার দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখতেই তারা ছোট ছোট রকেট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় এমন একটি বোমা জীবন কেড়ে নিতে পারে, দীর্ঘ সময় এমন ভাবনা চলতে থাকলে সৈন্যদের তা দুর্বল করে ফেলবে। তাছাড়া এসব হামলা ইরানপন্থীদের আরও উদ্বুদ্ধ করছে, তাদের মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরান তাই কৌশল হিসেবে তাদের মিলিশিয়া গ্রæপগুলোকে দিয়ে এসব হামলা পরিচালনা করে চলেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − 86 =