দোষ কার ?

অন্তঃসারশূন্য, ভণ্ড জনগোষ্ঠী কখনাে তার নিজস্বতা নিয়ে, মৰ্য্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে টিঁকে থাকতে পারে না, হারিয়ে যায়। এটা দুনিয়ার অমোঘ নিয়ম। শক্তিমানদের জন্যে প্রবাদ রয়েছে : ‘বীরভােগ্যা বসুন্ধরা’ আর দুর্বলদের জন্য কিন্তু জগৎটা তদ্বির ভােগ্যা। অবিভক্ত ভারতের ভূমিপুত্ররা(অমুসলিম) কিন্তু সংখ্যাগুরুই সােজাসুজি মােকাবিলা এড়িয়ে, তদ্বির করে সব ব্যবস্থা করে নিতে চেয়েছে সেই আদীকাল থেকেই। এই আত্মপ্রবঞ্চক ভূমিপুত্ররা তাই, জীবন থেকে, বাস্তব থেকে, সংগ্রাম থেকে সরে গিয়ে, ধীরে ধীরে অন্তরালে গেছে, ক্রমাগত হেরেই চলেছে। আত্মপ্রবঞ্চক জাতি এই হারানাের নিষ্ঠুর সত্যটাকে স্বীকার না করে, চাপা দিয়েছে কেবল আরাে বড় মিথ্যে দিয়ে। বিভক্ত ভারতের ইতিহাসে পড়ানাে হয় সাতশাে বছর মুসলমান আর দুশাে বছর ইংরেজ ভারতে রাজত্ব করেছে, অথচ কথাবার্তায় কাগজপত্রে আমরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনটাকেই স্বাধীনতা আন্দোলন বলি । মুসলমান আমলটা স্বাধীনই ছিলাম স্বীকার করে নিয়েছি। ইংরেজ যদি তার শাসন সাতশাে বছর কায়েম রাখতে পারত তাহলে আমরা কি বলতাম কে জানে ! দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানীর সঙ্গে লড়ে ইংরেজ বিপর্যস্ত হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নিল এশিয়ায় তারা সাম্রাজ্য রাখবে না। তাই ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো আর আমরা মিথ্যের পাহাড় রচনা করে প্রচার করলাম যে, কুআত্মা গান্ধীর রামধুন গানে আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে গেল ইংরেজ। ইংরেজ পরিত্যক্ত অসহায় সৈনিকদের গায়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের তকমা লাগিয়ে ভারতের এক কোণে ইম্ফলে যে লড়াই হয় তাতেই ভারত ছাড়লাে ব্রিটিশ(নেতাজী অনুরাগীদের বিশ্বাস) ! ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর যারা বিপ্লব-বিপ্লব খেলে, তাদের ধারণা হলো দুটো মরচে পরা মসার পিস্তলের আওয়াজেই ইংরেজ পালিয়ে গেল ! ইংরেজের প্রতিক্রিয়া কিছু হয়ে থাকলে, আতঙ্ক কিছু হয়ে থাকলে, তা হয়েছিল নৌবিদ্রোহের কারণে। নৌ বিদ্রোহই ব্রিটিশের হাড়ে কাপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল। এই সত্যটা ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরতে কোনো ঐতিহাসিকের কলম ওঠেনা ! সাথে যোগ হয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। স্বাধীনতাটা শুধু আমাদের ইচ্ছায় এবং আন্দোলনে হলে আমরা ভারতবর্ষকে কিছুতেই দ্বিখণ্ডিত হতে দিতাম না। ইংরেজ এশিয়ায় সাম্রাজ্য রাখবে না তাই চলে গেল। তারা ঠিক করলাে ভারতকে দুটুকরাে করে দিয়ে যাবে, দিয়ে গেল আর আমরা ঝড়ে পাখী মরাটাকে ফকিরের কেরামতি বলে চালিয়ে দিলাম !

 

উপমহাদেশ বিভক্তির পর, এপার ওপার দুই পারের বাঙালিই গলা ফাঁটায় : বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বাংলা, অখণ্ড বাংলা। শত শত বিপ্লবী দেশের জন্য ফাসীর মঞ্চে প্রাণ দিয়েছে একথা বেশ গর্বের সঙ্গে আমরা গল্প করে থাকি। সত্যি কথাটা শুনলে লজ্জা হবে, উনিশশাে আট থেকে উনিশশাে তেতাল্লিশ এই পঁয়ত্রিশ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনে পুর্ব বাংলা, পশ্চিমবাংলা মিলিয়ে ফাসীর মঞ্চে প্রাণ দানের সংখ্যা মাত্র চল্লিশ ! এই অখণ্ড বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা ছিল বেশী, যে অধিকারে তারা বাংলার দুই তৃতীয়াংশ পাকিস্তান করে নিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই প্রদেশে কিন্তু একজন মুসলমানও ফাসীর মঞ্চে প্রাণ দেয়নি। এই যে চল্লিশ জন এরা সবাই ছিল হিন্দু। সারা অবিভক্ত ভারতের প্রত্যেকটি প্রদেশের চিত্র এক। দেশের জন্য,ফাসীর মঞ্চে আত্মদানের তালিকায় নেই কোন মুসলমানের নাম, এই নিদারুণ সত্যটা আমাদের চমকে দেয় না, মনে প্রশ্ন জাগায় না কারণ, সত্য আমাদের সব সময়তেই অস্বস্তি দেয়। সারা ভারতে একমাত্র ব্যতিক্রম আসফাকউল্লা। মুসলমান হিসাবে ইনিই উত্তরপ্রদেশে ফাসীর মঞ্চে প্রাণ দিয়েছেন। আমরা কিন্তু, হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিপ্লব করার মিথ্যে গল্প আজও করে চলেছি। প্রশ্ন তুলিনি, তুললে সত্যের মুখােমুখি হতে হবে যে ! কাঠ মােল্লাদের হাত থেকে তুরস্ককে বার করে এনে এক উন্নত আধুনিক রাষ্ট্ররূপে তৈরী করতে চেয়েছিলেন কামাল আতাতুর্ক। নজরুল যাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন “কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই”। খলিফাপন্থীরা আন্দোলন শুরু করলাে কামালের বিরুদ্ধে। এই প্রগতি বিরােধী আন্দোলনকে সমর্থন করতে বললো কুলাঙ্গার গান্ধী, এই আশায় যে, এই আন্দোলন সমর্থন করলে যদি মুসলমান সমাজ দয়া করে কংগ্রেসের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করে ! এই একটি ঘটনাই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের ভুমিকাটি আরাে স্পষ্ট করে দেয়। এগুলাে ইতিহাসের সত্য, অস্বীকার করতে পারবেন ?

ভারতে দুধরণের নেতৃত্ব এসেছিল। শিথিল,নড়বড়ে, আত্মসমর্পণে উন্মুখ, মুসলিম তােষণকারী কুলাঙ্গার গান্ধী, অন্যদিকে বলিষ্ঠ বাস্তববাদী, ত্যাগদীপ্ত, সাভারকার। আমরা ভণ্ডামি ভালবাসি, তাই গান্ধীকে বেছে নিলাম, অহিংসা বেছে নিলাম। যে সকল নৃপুংসক উপমহাদেশবাসী মনে করে যে অহিংসার মধ্যে দিয়ে বিনা রক্তপাতে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, তাদেরকে মনে করিয়ে দিই, লিওনার্ড মােশলে তার “লাস্ট ডেজ অফ ব্রিটিশ রাজ” বইয়ে লিখেছেন, প্রত্যক্ষ সংগ্রামে মুসলমানদের হাতে শুধু পাঞ্জাবেই মারা গেছে ছ’লক্ষ হিন্দু। একটা মহাযুদ্ধেই শুধু এত মানুষ মারা যায়। এর সঙ্গে আছে নােয়াখালির “নরমেধ যজ্ঞ” এবং সুরাবর্দীর পরিচালনায় “গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং”। কুআত্মা গান্ধী পাঞ্জাব এবং কলকাতার ঘটনায় কোন প্রতিবাদ করেনি। নােয়াখালিতে শান্তিসভায় সুরাবর্দীকে সম্বােধিত করেছিল “শহীদ সুরাবর্দী সাহেব” বলে। একেই আমরা মহাত্মা বলি । লক্ষ লক্ষ বছরের একটা প্রাচীন জাতির পিতা বলে চিহ্নিত করেছি। বীর সাভারকার যিনি জীবনে কখনাে আপােষ করেননি অন্যায়ের সঙ্গে, যিনি অখণ্ড ভারতের প্রবক্তা ছিলেন, যিনি গােটা জাতিকে মিলিট্যান্ট করতে চেয়েছিলেন, যাঁর প্রেরণায় সুভাষ বিদেশে গিয়ে সেনা সংগঠিত করে নেতাজী হলেন, অকথ্য অত্যাচার, যন্ত্রণা আর জেল ছিল যাঁর জীবনের সারা অংশ জুড়ে, সেই ত্যাগী সৈনিক ব্যারিষ্টার বিনায়ক দামােদর সাভারকারকে আমরা ভালাে করে চিনিই না ! ফিল্ড মার্শাল ম্যনেকশ কিন্তু তাকে চিনতেন। তাই তিনি লিখেছেনঃ ‘সাভারকার নিজের জন্য কিছু চাননি। ভারত স্বাধীন হােক এটাই তার জীবনের একমাত্র আকাঙ্খ ছিল’।

এরকম একটা অন্তঃসারশূন্য, আত্মপ্রবঞ্চক জনগোষ্ঠী যখন কোনো ভূখণ্ডে নিপীড়িত হয়, বঞ্চিত হয় দিনের পর দিন, তখন সেই দোষ কাদের উপর বর্তাবে, এদের নিজেদের উপর ছাড়া ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 − 15 =