যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশে কড়াকড়ি বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার পরিধি ও মেয়াদ আরও বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। দুই বছর আগে লিবিয়া, ইরান, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদানের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এখন আবার নতুন করে সাতটি দেশকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হচ্ছে। আগেরবারে মতো এবারও তালিকাভুক্ত দেশগুলোর অধিকাংশই মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত। মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া দেশগুলো হচ্ছে, নাইজেরিয়া, সুদান, তানজানিয়া, ইরিত্রিয়া, কিরগিজস্তান, মিয়ানমার ও বেলারুস। শিগগিরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এসব দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বা এর কারণ এখনও প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন। তালিকাভুক্ত দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবেন না। তবে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড ও ভিসাপ্রাপ্ত এবং শরণার্থীরা এর আওতায় নাও থাকতে পারেন। এর আগে ছয় মুসলিম দেশের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার নাগরিক আর ভেনিজুয়েলার সরকারি কর্মকর্তাদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। এ দফায় মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও ভেনিজুয়েলার মতো ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। দেশটির সরকারি ও সেনা কর্মকর্তাদের ওপর সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে।

২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ৩০ হাজার শরণার্থীর মধ্যে চার হাজার ৯৩২ জনই মিয়ানমারের। এ থেকে বোঝা যায়, দেশটির নাগরিকরা যক্তরাষ্ট্রের টার্গেট নয়। কিন্তু মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে পূর্ণমাত্রার নিষেধাজ্ঞা। যার অর্থ হলো মুসলিম দেশের নাগরিকরাই ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্ট টার্গেট। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নয়া নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার কথা জানান।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে, তখন প্রেসিডেন্টের এ সংক্রান্ত ক্ষমতা কমাতে কংগ্রেসে বিল আনতে যাচ্ছে বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবির। কিন্তু ট্রাম্প একের পর এক কামান দেগেই যাচ্ছেন। সেই তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা অত্যন্ত ধীরগতির। ট্রাম্প যদিও প্রসূতি মায়েদের যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের ওপর বিধি নিষেধ চাপানোর সব ব্যবস্থাই নিয়েছেন, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা বহুদিন ধরে এর বিরোধিতা করে এলেও এই উদ্যোগ পÐ করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ তারা নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যে বিধান, ২০১৮ সালে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেটি বন্ধের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সে সময় তার এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা। শেষ অবধি হোয়াইট হাউস নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারলেও বিরোধীরা কিছুই করতে পারেনি।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নির্দেশনায় জন্মগত পর্যটন বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জন্মগত পর্যটন বলতে বোঝায়, অন্য দেশের কোনো নাগরিক পর্যটন ভিসায় বিদেশে গিয়ে সেখানে সন্তান জন্ম দিলে ওই সন্তান সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্রেও এ নীতি চালু ছিল। ট্রাম্প এখন তা বন্ধ না করলেও এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন যে, ব্যবস্থাটি কার্যত খোঁড়া হয়ে গেছে।
সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের সাইপান দ্বীপ অনেকের কাছেই পছন্দের। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে ভিসা বাধ্যতামূলক হলেও চীনসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই সাইপানে প্রবেশ করতে পারেন। এছাড়া সাইপানের জনসংখ্যাও মাত্র ৫০ হাজার। সন্তানের জন্মদানে সাইপান পছন্দের হওয়ার কারণেই কিছুদিন আগে সেখানে যাওয়ার আগে এক নারী যাত্রীকে প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে বাধ্য করেছিলো হংকংভিত্তিক একটি এয়ারলাইনস। পরে এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ ওই নারীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলো। তারা জানিয়েছিলো, সাইপান কর্তৃপক্ষের চাপ ছিলো বলেই তারা এটি করেছে। তবে ভবিষ্যতে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পরেই জন্মগত পর্যটন নিয়ে নতুন নির্দেশনার ব্যাপারে ঘোষণা দিলো ট্রাম্প প্রশাসন।

নতুন আদেশের ফলে ভিসা নির্দেশনায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, কীভাবে এটি প্রয়োগ করা হবে এবং এটি পর্যটকদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেসব ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে এই নির্দেশের ফলে বিদেশি কোন অন্তঃসত্ত¡া নারী এখন থেকে আর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে পারবেন না। অন্তঃসত্ত¡া প্রমাণ হলে মার্কিন কর্মকর্তারা আর তাদের ভিসা দেবে না। হোয়াইট হাউস বলছে, আমেরিকান নাগরিকত্বের অখÐতা রক্ষা করতে হলে এটা করতে হবে। বার্থ টুরিজমের কারণে মূল্যবান হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চাপ বেড়ে যায় যা হাসপাতালগুলোর জন্য হুমকি । তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এও বলা হয়, যেসব দেশ মার্কিন ভিসায় ছাড়া পায় তাদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। বিশ্বে ৩৯টি দেশ রয়েছে যারা মার্কিন ভিসায় ছাড় পায়। এর মধ্যে বেশিরভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেখে মনে হবে অভিবাসন ঠেকাতে বদ্ধপরিকর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আসলে সাদা ও ইউরোপীয়দের ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই। প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রবেশ ঠেকানোর জন্যই কাজ করছে তারা। বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তারই প্রমাণ মিলছে। মার্কিন এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বার্থ টুরিজমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৩ হাজার শিশুর জন্ম দেয়া হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী এরা সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। যদিও এই বার্থ টুরিজমের সুবিধাটি মুসলিমরা তেমন একটা নিতে পারে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ভিসানীতির সব নেতিবাচক ধারাগুলোর কোপ মুসলিমদের কাঁধেই চাপে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of