প্রসঙ্গ: পার্বত্য চট্টগ্রামের সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জুম্ম জাতির মননশীলতা।

(১) ভারতীয় উপমহাদেশের একটি আদি জনগোষ্ঠী হচ্ছে চাকমা সম্প্রদায় (সমষ্টিগত পরিচয় জুম্ম জাতি)। বাংলাদেশের এক দশমাংশ অঞ্চল নিয়ে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, যার আয়তন প্রায় ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার। এখানে যুগযুগ ধরে সেই মুঘল আমলের আগ থেকে জুম্ম আদিবাসী পাহাড়িরা বসবাস করে আসছে। ইতিহাস সূত্রে জানা যায় অঞ্চলটি ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা অধিগ্রহণ করেন। এরপরে ১২৪০ সালে ত্রিপুরা রাজা মাণিক্য এলাকাটি দখলে আনেন। ত্রিপুরা রাজার নিদর্শন এখনো কিছু কিছু জায়গায় রয়েছে। পরে আবার এটি আরাকানিরা আয়ত্ত্বে নেয়। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে ১৫৪৬ সালে বার্মার আরাকান রাজা Meng Beng এর সাথে তখনকার চাকমা রাজার একটি যুদ্ধ হয় এতে চাকমা রাজা উত্তর আরাকান রোমা এবং উত্তর আরাকান পর্বত পর্যন্ত দখলে নিয়ে সেখানে রাজ্য গড়ে তোলেন। যার সীমানা পূর্বদিকে কর্ণফুলি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আরাকানীরা Chakma দের Shaks হিসেবে উল্লেখ করতো।

পরবর্তীতে চাকমা রাজা আবার দ্বিতীয় দফায় আরাকানদের সাথে যুদ্ধের সম্মুখীন হন। এই যুদ্ধে খুবই পরাক্রমশালী আরাকান রাজা Meng Rajgri (১৫৯৩-১৬১২) বিশাল সৈন্য নিয়ে চাকমা রাজ্যের উপর আক্রমণ করে চাকমা রাজাকে পরাজিত করেন এবং আরাকান কিং চাকমা রাজ্য দখলের বিষয়টি ১৬০৭ সালে এক চিঠির মাধ্যমে নামকরা পর্তুগিজ বণিক Philip de Brito Nicote কে অবহিত করেন। এমনকি পর্তুগিজদের সম্পাদিত ঐতিহাসিক মানচিত্রেও চাকমাদের (পর্তুগিজরা চাকমাদের Chacomas নামে অভিহিত করেন) চট্টগ্রাম তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে (Chittagong Hill Tracts) আদি অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। (সূত্র: en.m.wikipedia.org)

(২) আরাকানীদের আক্রমণে টিকতে না পেরে চাকমা রাজা ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে নাফ নদী পার হয়ে বান্দরবানের আলীকদম (পূর্বে Alekyangdong) এ রাজধানী শহর স্থাপন করে নতুন রাজ্য গড়ে তোলেন। যেই রাজ্য ব্রিটিশ ভারত সরকার জুম্মজাতি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (Tribal Autonomy) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তা ভারত বিভক্তি অবধি বজায় ছিল।
পরবর্তীতে ১৬১৬ সালে মুঘল গর্ভনর শায়েস্তা খান আরাকানীদের যুদ্ধে পরাজিত করে আরাকান রাজ্য উত্তরে kaladan river পর্যন্ত জয় করে নেয় এবং এলাকার নামকরণ করে ইসলামাবাদ। অবশ্য মুঘলদের শাসন চট্টগ্রামের সমতল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। আর চাকমা রাজ্য গড়ে ওঠে অনেকটা পাহাড়ি অঞ্চলে (Chittagong Hill Tracts )। একপর্যায়ে মোঘল সম্রাট চাকমা রাজ্যের কাছে শ্রাদ্ধ দাবি করে বাণিজ্য চালাতে থাকে। যার কারনে চাকমা রাজা মোঘলদের সাথে কিছু কিছু সময়ে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে।

১৭১৩ সালে চাকমা রাজা Shukdev Roy এর সাথে মোঘল সম্রাটের সম্পর্ক উন্নয়ন হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৭১৭ সালে মুঘলদের সাথে চাকমা রাজার একটা সন্ধিও (treaty) সম্পাদন হয়েছিলো। মোঘলরা রাজা সুখদেব’ কে পুরস্কৃতও করে। এরপরেই রাজা সুখদেব তার নামে “সুখিবলাস” নামক নতুন রাজধানী গড়ে তোলেন যার ঐতিহাসিক স্মৃতি নিদর্শন চট্টগ্রামের রাজানগর, রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এখন অযত্নে বিলীন হতে বসেছে।

(৩) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়ও মোঘলদের সাথে পরবর্তী চাকমা রাজা জালাল খানের Yam ও তুলা শস্যের বিনিময়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সমঝোতার চুক্তি সম্পাদিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে মোঘলরা তাদের অবস্থান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাকমা রাজ্য হিসেবে স্বাধীনতা প্রদান করে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারের সাথেও চাকমা রাজার সন্ধি স্থাপিত হয় এবং তারাও চাকমা রাজ্যের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজেদের আয়ত্বে আনে। পরবর্তীতে ১৭৭৭ হতে ১৭৮৯ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে চাকমা রাজ্যের বেশ কয়েকবার যুদ্ধ বাঁধে। যে যুদ্ধে কিছু সময় ব্রিটিশ কোম্পানি পরাজিত হয়ে চাকমা রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে রাজা জান বক্সস খানের নিকট শপথ নিয়ে রাজ্য পরিত্যাগ করতেও বাধ্য হন। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরাই এই এলাকার নাম দেন Chittagong Hill Tracts যা বাংলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম। (সূত্র: Wikipedia & Banglapedia).

(৪) ব্রিটিশ শাসিত ভারত সরকার প্রশাসনের সুবিধার্থে ১৯০০ সালে Chittagong hill tracts regulation প্রণয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজ্যকে Tribe(জুম্ম) স্বায়ত্তশাসন অঞ্চল হিসেবে গন্য করে যা ভারত বিভক্তির পরও অব্যাহত ছিল, এখনো আছে। কারন ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তির ‘ক’ খন্ডের ১ম দফায় Tribe অধ্যুষিত অঞ্চলের কথা স্বীকার করা হয়েছে। এছাড়া ১৯০০ সালের CHT শাসনবিধিটি আইন হিসেবে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। যা ব্রিটিশ পরবর্তী কোন সরকার আজ পর্যন্ত বাতিল বা অবৈধ উল্লেখ করেনি; এমনকি বাতিলের কোন সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। তাই এখন পর্যন্ত বলতে গেলে ১৯৯৭ সালে সস্পাদিত পার্বত্য চুক্তির সহিত আদিবাসী Tribe জুম্মদের অস্তিত্বেরর অনন্য আরেকটি রক্ষাকবচ হলো ১৯০০ সালের CHT Regulation. উল্লেখ্য কোন সরকার কর্তৃক এই রেগুলেশনকে অবৈধ বা অস্বীকার করা মানে হবে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সরকার তথা পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্বীকার করা।

(৫) প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এ তিনটি জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল গঠিত। যেখানে সেটেলার বাঙ্গালি জনসংখ্যার আনুপাতিক হার কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৯১ সালে সরকারি জরিপে Tribe জুম্মজনগোষ্ঠীর শতকরা হার ছিলো ৫১.৪৩% আর বাঙালির ৪৮.৫৭% । কিন্তু ২০০১ সালে Asian Development Bank রিপোর্ট অনুযায়ী জনসংখ্যা শতকরা হার জুম্ম আদিবাসী ৪৪% আর বাঙালি ৫৬% (Source-www.adb.org)। বর্তমানে সেটেলার বাঙালি হার অারো অনেক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাথে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের একটা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা ১৫,৮৭,০০০ জন এবং রয়েছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ ১৩ টি পাহাড়ি জাতিস্বত্তাদের আদি বসবাস। তাদের প্রত্যেক জাতিদের রয়েছে জাতিগঠনের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, বর্ণমালা, লোকগাথা প্রভূতি এবং এই ১৩ টি জাতিদের পূর্বপুরুষ বা বংশধরদের সবারই চাষাবাদ পদ্ধতি ছিলো জুম। পাহাড়ের পাদদেশে ধানসহ নানানজাতের শস্য তারা রোপন করে একত্রে ফসল বুনে। তাদের রক্তে বহমান রয়েছে জুম চাষাবাদ প্রণালী ব্যবস্থা, যাহা নিতান্ত প্রাকৃতিক। এ ঐতিহ্যগত চাষাবাদ ব্যবস্থার কারনে তারা নিজেদেরকে সম্মিলিতভাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে জুম্ম (Jumma)। এই জুম্ম কোন একক স্বত্তা নয়, এটা একটি সমষ্টি পরিচয় এবং সামগ্রিক জাতিত্ত্ববোধ। অনেক আগে সূদুর ফ্রান্স, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এই Jumma (জুম্ম) নামে সংগঠন গড়ে ওঠেছে। যেমন ফ্রান্সে এই নামে দুটি সংগঠন- La voix des Jummas (English meaning- The voice of the Jummas)l এটি মানবাধিকার সংগঠন) এবং Les amis des Jummas (Freinds of The Jummas, এটি আর্তমানবতার সংগঠন) এবং ফ্রান্সে জুম্মদের অন্য একটি অন্যতম Right base organisation “AJHA”(English meaning ‘Hope’। এই সংগঠগুলোর সাথে জড়িত রয়েছেন ফরাসি অনেক গুণীব্যক্তিত্ব। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের অধিকারের কথা ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক, মিডিয়া, কনফারেন্স ও আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে তুলে ধরেন। তার মধ্যে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী Pierre Marchand (যিনি ১৯৮৭ সালে ৭২ জন অসহায় জুম্ম শিশুদের ফ্রান্স সরকারের সহায়তায় ফ্রান্সে নিয়ে আসেন এবং পাহাড়ে মনোঘর শিশু সদন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার অবদান অনস্বীকার্য), মানবাধিকারকর্মী Dominique Clochon, একাধারে বিশিষ্ট লেখক, সমাজসেবক ও মানবাধিকারকর্মী Paul Nicolas, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, সমাজসেবক Suniti Chakma এবং তার সহধর্মিনী Professor Frédérique অন্যতম। এমনকি ফ্রান্সে’র অনেক অনলাইন মিডিয়াও পাহাড়ের এই জাতিস্বত্ত্বাদের অনেক আগ থেকে Indigenous এর পাশাপাশি Jumma হিসেবে treat করে আসছে। অতএব জুম্ম মননশীলতা বা জুম্ম জাতিত্ত্ববোধ শুধু পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে আজ বহির্বিশ্বেও পরিলক্ষিত। তাই জুম পাহাড়ের সূর্য সন্তান, পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত মহান নেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যেভাবে জুম্ম জনগণের কথা মহান সংসদে তুলে ধরে বাংলাদেশ সংবিধানে স্বীকৃতির জন্য সোচ্চার ছিলেন। তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তিনি যে উদ্দেশ্যে লড়াই সংগ্রাম করে নিজের জীবন জুম্ম জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উৎস্বর্গ করেছেন তা অন্তরে ধারন করে জুম্মদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি জুম্ম জাতির মননশীলতায় হতে পারে জুম পাহাড়ে জুম্ম জনগণের একমাত্র মুক্তির উপায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + = 10