কারও চাপে নয়, পিএইচডির জন্য মালয়েশিয়ায় আজহারী!

বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের মধ্যে মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী অন্যতম। সম্প্রতি কয়েকটি জেলায় এই ইসলামী বক্তার ওয়াজ-মাহফিলে নিষেধাজ্ঞা এবং তার একটি ওয়াজের অনুষ্ঠানে ১২ জন ভারতীয় নাগরিকের ইসলাম ধর্ম গ্রহণকে কেন্দ্র করে তার দেশত্যাগের প্রেক্ষিতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে তাই প্রশ্ন উঠেছে, কে এই মাওলানা আজহারী?

লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া গ্রামে ২৪ জানুয়ারি এক মাহফিলের আয়োজন করে স্থানীয় মসজিদ কমিটি। সেখানে ওয়াজ করেন মিজানুর রহমান আজহারী। সেদিন তার উপস্থিতিতে একটি পরিবারের মোট ১২ জন সদস্য ইসলামে দীক্ষা নেন। এর আগেও মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলে ধর্মান্তকরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিতর্ক তখনই তুঙ্গে ওঠে যখন জানা যায় যে, ওই ১২জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক এবং সরকার তাদের ভারতে ফেরতও পাঠিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, আজহারী তার ওয়াজে বিতর্কিত বক্তব্য দিতে পছন্দ করেন। তার আলোচিত কিছু উক্তির মধ্যে রয়েছে, ক) তারাবির নামাজ ৪ রাকাত আদায় করলে হয়ে যাবে। খ) নারীদের হাত ও মুখমন্ডলের পর্দা করা কোনো জরুরী বিষয় নয়। গ) প্রজেক্টেরের মাধ্যমে নারীদেরকে বয়ান শোনানো জায়েজ। ঘ) রাসুল সা. মক্কী জীবনে টেস্ট ইনিংস খেলেছেন, আর মাদানী জীবনে ছক্কা মেরেছেন। বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়েছেন। ঙ) রাসুল সা. এর বডি ছিল বডি বিল্ডারদের মত সিক্স প্যাক। চ) গান শুনে মুগ্ধ হয়ে শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, সবাই বলেন আলহামদুলিল্লাহ!

ধর্মভীরু জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পরিচিতি পেয়েছেন দেশজুড়ে। সাধারণ ইসলামি বক্তাদের থেকে তার বিজ্ঞানভিত্তিক উপস্থাপনা, ইংরেজিতে পারদর্শিতা ও সামাজিক মাধ্যমের কৌশলী ব্যবহার ভক্তদের নজর কেড়েছে। মিজানুর রহমান আজহারী ১৯৯০ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার ডেমরায় জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি নিবাস কুমিল্লার মুরাদনগরের পরমতলা গ্রামে। বাবা মাদরাসার শিক্ষক। পরিবারে মা-বাবা ও এক ভাই ছাড়াও নিজের স্ত্রী ও দুই কন্যা রয়েছে।

শিক্ষাজীবনে মিজানুর রহমান প্রথমে ডেমরার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসা থেকে ২০০৪ সালে দাখিল দেন। পরীক্ষায় তিনি জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৬ সালে আলিম পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পান। ২০০৭ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত মিশর সরকারের শিক্ষাবৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট করার সুযোগ পান। মূলত মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করায় তার নামের সঙ্গে ‘আজহারী’ লেখা হয়। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব তাফসির অ্যান্ড কুরআনিক সায়েন্স থেকে ২০১২ সালে শতকরা ৮০ ভাগ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন মিজানুর রহমান। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ায় পিএইচডি করছেন। পিএইচডির জন্য বেশিরভাগ সময় মালয়েশিয়ায় থাকলেও এর ফাঁকে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন মাহফিলে বক্তব্য রাখেন। জানা গেছে, সরকারের চাপ নয় বরং পিএইচডির পড়ালেখা সারতেই ফেরত গেছেন তিনি।

তবে সরকারী চাপের শঙ্কাটা এসেছে আজহারীর হঠাৎ রাজনীতির সঙ্গে জড়ানোর ফলে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছিলেন, ‘দেশপ্রেমিকরা আজ দেশে নিরাপদ নয়। দেশের স্বার্থে কথা বলা যেন এদেশে মহা অপরাধ। তাহলে প্রকৃত দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী কারা? বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও, বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলায়, জীবন দিতে হয় বাংলাদেশীদের হাতেই। ওরা কেমন বাংলাদেশী? হৃদয়ের সবটুক ঘৃনা, ক্ষোভ ও নিন্দা সেইসব নরাধমদের প্রতি, যারা কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করছে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। ওদেরকে চিহ্নিত করে, দেশদ্রোহিতার কারণে এমন শাস্তি দেওয়া উচিত, যাতে ভিনদেশের দালালি করতে ওদের অন্তরাত্মা দশবার কেঁপে উঠে। ভারতের আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ ‘আবরার ফাহাদ’ আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চির অ¤øান হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই সাহসী দেশপ্রেমিক ভাইটিকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান বানিয়ে নিক। আমিন।’

আজহারীর ভক্তদের দাবি, এই অবস্থান প্রকাশের পর থেকেই তার ওপর নানা ধরনের চাপ আসতে শুরু করে। গত ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় আজহারীর ওয়াজ নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১৫ জানুয়ারি সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিলেটের ৩ উপজেলার আলেম, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সাথে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আজহারী প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সিলেটে কোনো ওয়াজে অংশ নিতে পারবেন না। জানা গেছে, আজহারীর মাহফিলের বিপক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছেন কওমিপন্থী আলেম-ওলামাদের একটি অংশ। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসা ঘরানার হওয়ায় এই পক্ষের আলেমরা রয়েছেন আজহারীর পক্ষে।
তবে আজহারীর বিষয়টি যে মাওলানাদের দুটি অংশের দ্ব›েদ্বর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটা স্পষ্ট হয় ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে। এদিন সাঈদীর পক্ষ নিয়ে মাহফিল করায় আজহারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন সংসদ সদস্য ও সাংবাদিক নেতা মো.শফিকুর রহমান। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকার ছিলেন। প্রকাশ্য আদালতে তার বিচার হয়েছে, বিচারে তার শাস্তি হয়েছে। এখন কিছু লোক বলছেন ঘরে ঘরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বেরিয়ে আসবে। শুধু তাই না, একজন বলছে, এখন আর তীর ধনুকের যুগ না, এখন একে ফোরটি সেভেনের যুগ। এটি প্রচ্ছন্ন নয়, প্রকাশ্যে হুমকি। এতে মনে হয়, জামায়াত-শিবির-রাজাকার তৎপর হয়ে গেছে। তার বক্তব্যের শেষে সভাপতির চেয়ারে বসা ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে, এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এর কয়েকদিনের মধ্যে মিজানুর রহমান আজহারীকে ‘জামায়াতের প্রোডাক্ট’ বলে মন্তব্য করেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ। ২৮ জানুয়ারি দুপুরে জামালপুর শহরের গৌরীপুর কাচারি এলাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে প্রকাশ্যে জামায়াতের রাজনীতির সুযোগ না থাকায় কৌশলে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে জামায়াতের পক্ষে কথাবার্তা বলছেন এসব বক্তা। তারা কোরআন হাদিসের যেসব ব্যাখ্যা দেন তার অধিকাংশই মিথ্যা এবং আজেবাজে কথা। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত এসব বক্তব্য সরকারের নজরে এসেছে। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। এসব বক্তাকে সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে।’

কথা বলে জানা যায়, সরকারের দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়লেও আজহারীকে দেশত্যাগে বাধ্য করানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বলেই মনে করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। আজহারী সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা মোতাবেকই আজহারীকে তার পড়ালেখার জন্য মালয়েশিয়ায় ফিরতে হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের সমালোচনার ফলে অনেকে তাকে বড় সরকারবিরোধী ভাবতে বসলেও আসলে তিনি রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার কেউ ন্ন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে বা সরকারের লুটপাটের ক্ষেত্রে তাকে সব সময় নিরব থাকতেই দেখা গেছে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 7 = 1