দেশে বেকারত্ব বাড়লেও কাজ পাচ্ছে ভারতীয়রা, জড়িত হচ্ছে পুঁজিপাচারে

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবক-যুবতীর সংখ্যা ২ কোটি। যা মোট শ্রমগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে ৭৪ লাখ কোনো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত নেই। এদের মধ্যে আবার ৭০ শতাংশ প্রান্তিক যুবসমাজ। সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গোলটেবিল সভায় বেকারত্বের এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

গত ডিসেম্বরে ঢাকায় এক গবেষণা সম্মেলনে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জানায়, কমপক্ষে মাধ্যমিক পাস, এমন শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের তিন ভাগের এক ভাগ বেকার। তারা কোনো কাজ করেন না বা পড়াশোনাও করেন না। শিক্ষিতদের মধ্যে সার্বিকভাবে ৪৮ শতাংশ পূর্ণকালীন কাজ করেন। ১৮ শতাংশের মতো খন্ডকালীন কাজে নিয়োজিত। আর ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ পূর্ণ বেকার। সবচেয়ে বেকার স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে। প্রায় ৩৭ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে ৩৪ শতাংশের বেশি বেকার। এসএসসি পাস করা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ২৭ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করাদের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ শতাংশ। এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুরশিদ।

দেশজুড়ে বেকারত্ব এমন ভয়াবহ চেহারা ধারণ করলেও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশিদের কাজে নিয়োগে কোনো বাধা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। বিদেশিকর্মী নিয়োগের ফলে বছরে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গবেষক মনজুর-ই খোদা জানান, বৈধ ও অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশিকর্মী কাজ করেন। যার মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী বৈধ কর্মী রয়েছেন ৯০ হাজার। এদের ন্যূনতম গড় মাসিক বেতন দেড় হাজার মার্কিন ডলার। সে হিসেবে বিদেশি কর্মীদের বার্ষিক আয় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৩০ শতাংশ স্থানীয় ব্যয় বাদে প্রায় ৩ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে বৈধভাবে বিদেশে যায় ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাকি ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। টাকার অঙ্কে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হয় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন বা ১২ হাজার কোটি টাকা।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে যারা কাজ করতে আসেন তাদের ৫০ শতাংশই ভ্রমণ ভিসায় আসেন। এখানে কাজ যোগাড় করে আবার দেশে ফিরে যান। পরে আবার ভ্রমণ ভিসা নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা বেশি। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করছেন। এমনকি সরকারি প্রকল্পে যেসব বিদেশি কাজ করছেন তারাও ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষায় আমরা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছি। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর এটিই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। এত বেকার থাকার পরও বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে কাজ করছে ভারতের কয়েক লাখ মানুষ। তারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে রেখেছে। নিয়োগদাতারা বাংলাদেশের শিক্ষিতদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করছে না। দেশে এত শিক্ষিত বেকার! ভারতের লাখ লাখ জনবল এসে কাজ করছে কীভাবে? এটি তো রীতিমতো ভাবনার বিষয়।’

এ গবেষণায় দেশে বিদেশিকর্মী নিয়োগে অবৈধ অর্থের লেনদেনের বিষয়ও ওঠে আসে। সেখানে বলা হয়, ভিসার সুপারিশপত্র, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা সংগ্রহ, বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন, কাজের অনুমতি, এসবি ও এনএসআই ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধিতে ২৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ লেনদেন হয়। এছাড়া বিদেশি কর্মী নিয়োগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশি এক্সপার্ট না খোঁজা, কর ফাঁকি, একই প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছরের বেশি কাজ করানো, ভিসা নীতি লঙ্ঘন ও বিদেশিকর্মীর বেতন কম দেখানো হয়।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারকে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিদেশিকর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকার নিজে অবৈধভাবে অবস্থানরতদের কিভাবে নিয়োগ দেয়, তার জবাব দিতে হবে। দেশে কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রæতি সরকার দিয়েছে, তা পালনে তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা মানুষ দেখতে চায়।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

23 − = 15