হ্যাকার (পর্ব ১-২)

(১)

রাত ৩.২০, অন্ধকার রুমে বসে ল্যাপটপের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রোদ। ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয় তার চোখের মনি দুটো জ্বলজ্বল করছে। এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছে সে ল্যাপটপের পর্দায়। তার সামনে এখন নতুন শিকার। ফাঁদ পাতা হয়েছে। এখন শুধু সেই ফাঁদে পা দেয়ার অপেক্ষায় দক্ষ শিকারীর মতো বসে আছে সে।
কিছুক্ষণ পর তার ঠোটের কোণে দেখা দিলো এক চিলতে হাসি। এই মেয়েটাও অবশেষে বোকার মতো তার ফাঁদে পা দিয়েছে। মূলত ফেসবুকে সে প্রথম মেয়েটাকে দেখে টার্গেট করে। মেয়েটার About অপশনে গিয়ে দেখে, মেয়েটা তার ই-মেইল আইডি হাইড করতে ভুলে গেছে। ব্যাস, রোদকে আর পায় কে? রোদের মতো দক্ষ হ্যাকারের কাছে ই-মেইল হ্যাক করা বা হাতের কাজ।
রোদ প্রথম দিকে একজন Ethical Hacker ছিলো। হ্যাকিংটা সে শিখেছিলো মানুষের উপকার করার জন্য ও নিজের দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখার জন্য। বিশ্বখ্যাত আন্তঃর্জাতিক হ্যাকার সংগঠন Anonymous এ কাজ করার অভিজ্ঞতা তার আছে। ২০১২ সালে যখন ইসরায়েল গাজা স্ট্রিপে আক্রমণ চালায়, তখন প্রতিবাদ স্বরূপ সে Anonymous এর সাথে মিলে হামলা চালায় ইসরায়েলের সাইবার স্পেসে এবং তার বাংলাদেশী হ্যাকার দলকে নিয়ে একাই দখল করে নেয় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট। ইসরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ হাজার চেষ্টা চালিয়েও এই হ্যাকারদের প্রকৃত পরিচয় জানতে অক্ষম হয়েছে।
এভাবে ভালোই চলছিলো দিনকাল। রোদের বাবা-মা দু’জনই চাকুরীজীবী। তাই তার সারাদিন কাটতো ল্যাপটপের সামনে বসে, বইপড়ে, কবিতা-গল্প লিখে।
একদিন দেখতে দেখতে রোদ বেশ বড় হয়ে গেলো। জীবনের একটা ধাপ পেরিয়ে সে পা দিলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পেলো একটি মুক্ত পরিবেশ, একদল মুক্ত বন্ধু-বান্ধব। প্রথমদিকের সময়গুলো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, ঘুরতে গিয়ে, অবসর সময় শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি নিয়ে আড্ডা দিয়ে তার বেশ ভালোই কাটতে লাগলো।
তিনমাস পর মাইগ্রেশন হয়ে চলে যায় তার সব প্রিয় বন্ধুরা। ডিপার্ট্মেন্টে আসে কিছু নতুন মানুষ। তবে প্রিয় বন্ধুদের চলে যাওয়াটা তাকে বেশ কষ্ট দেয়। তাই কিছুদিন সে সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
তার প্রিয় বন্ধুরা নতুন নতুন ডিপার্টমেন্টে গিয়ে নিজেদের মতো করে সার্কেল গঠন করে নিয়েছে। এখন আর তার সাথে তেমন দেখা হয় না। হলেও খুব একটা কথা হয় না। অন্যদিকে, তার ডিপার্টমেন্টের অন্য বন্ধুরাও নিজেদের মধ্য অসংখ্য সার্কেল তৈরি করে, শতধা বিভক্ত হয়ে নিজেদের মতো জগত তৈরি করে নিয়েছে। এখন সেই জগতে সে একজন অবাঞ্চিত মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই সেই আড্ডাগুলোও ছেড়ে দেয় সে।
অবশ্য রোদকে কেউ পছন্দ না করার অন্যতম একটি কারণ হলো যেখানে সব মানুষ সমাজে প্রচলিত গতানুগতিক চিন্তাধারাতেই ভাবতে অভ্যস্ত, সেখানে সে সব কিছুকে নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে ভালোবাসে। আমাদের সমাজ আর যাই হোক, ভিন্ন চিন্তাকে মেনে নিতে কোনদিনই পারে নি।

তাই সে একা। এভাবে কাটে তার পুরো একটি বছর। সারাদিন সে এদিক সেদিক হেটে বেড়াতো, নিজেকে ভালো রাখার জন্য। কিন্তু মানুষ আর যাই হোক একা বেঁচে থাকতে পারে না। এক পর্যাতে সে একটি চরম সিদ্ধান্ত নেয়।
‘যেহেতু বর্তমান সমাজ আমাকে ত্যাগ করেছে, তাই আমি মানুষকে বাধ্য করবো আমার সাথে কথা বলতে।’
এরপর সে প্রতি সপ্তাহে ফেসবুকে একজন করে টার্গেট করে। তার সম্পর্কে আগে ভালোভাবে জানে। এরপর তার ই-মেইল হ্যাক করে তার ফোন নাম্বার নেয়। এরপর সেখানে এসএমসের মাধ্যমে একটা লিংক পাঠায় লোভনীয় বিভিন্ন অফারের কথা বলে। এই লিংকে ক্লিক করা মাত্রই সেই ফোন পুরোটা তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এবার সে সেই ব্যাক্তিদের নানা ভাবে ব্ল্যাক মেইল করে। দাবী তেমন কিছু না। তার সাথে এক সপ্তাহ নিয়মিত কথা বলতে হবে। এক সপ্তাহ পর তাদের সব কিছু সে ফিরিয়ে দেয়। আর কোনদিন তাদের সাথে যোগাযোগ করে না। যেহেতু সে তার নাম ঠিকানা গোপন রাখে ও চেহারা দেখায় না। তাই সেই ব্যাক্তিদের পক্ষে তাকে খুঁজে বের করা বা তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
যাক, এবার মুল গল্পে আসি। সে মেয়েটির ই-মেইল আইডিটি হ্যাক করতে সক্ষম হয়েছে। এবার সেখান থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে যথারীতি একটি লিংক এসএমএসের মাধ্যমে পাঠায়। মেয়েটিও বোকার মতো সেখানে ক্লিক করে বসে। ব্যাস, রোদ এবার পুরো মোবাইলটির কন্ট্রোল নিয়ে নেয়।

(২)

আলোর কাল সকালেই প্রেজেন্টেশন। সারাদিন আড্ডা পিটিয়ে সে বেশ টায়ার্ড। তার বেশ ঘুম পেয়েছে। ঘুমোনোর আগেই মনে হলো, আজকের তোলা ছবিগুলো ইন্সটাগ্রামে আপলোড দেয়া হয় নি। মোবাইলটা হাতে নেয় সে। গ্যালারিতে ঢুকে দেখে পুরো গ্যালারি ফাঁকা। পুরো ফোনে কোন ফাইল নেই। হতভম্ব হয়ে যায় সে। কিছুক্ষণের ভেতর বিস্ময় কাটিয়ে উঠে সে। ভাবে, হয়তো বা ফোনের সমস্যা। ফোন অন করে অফ করে সে।
আরে আশ্চর্য, এবার তো সে লকই খুলতে পারছে না। কিছুক্ষণের ভেতর একটা অদ্ভুত নাম্বার থেকে ফোন আসে। এমন নাম্বার সে কখনো দেখে নি।
রিসিভ করতেই ওপাস থেকে একটি গলা ভেসে উঠে, “হ্যালো, আলো”
আলো চমকে উঠে। এটা তো তার পরিচিত কারো গলায় স্বর নয়। তবে এটা কে?
সে দ্রুত বলে যায়, “কে আপনি?”
“আমি কে সেটা তোমার না জানলেও চলবে। আমি যা বলছি তা মন দিয়ে শুনে যাও। তোমার ফোন ও ল্যাপটপ এখন আমার নিয়ন্ত্রণে এবং এর সব ডেটা এখন আমার কাছে।“
“মানে! কি বলছেন এসব?”
“বিশ্বাস হচ্ছে না তো? ফোনটার ভেতর কি কিছু পেলে, না এর লক খুলতে পারলে। আচ্ছা, তোমার ল্যাপটপটা একটু খুলে দেখো তো।“
কথাটা বলার সাথে সাথেই দৌড়ে গিয়ে টেবিলে থাকা ল্যাপটপটা ওপেন করে সে। তাজ্জব ব্যাপার। ল্যাপটপে “সিকিউরিটি কি” চাইছে, অথচ আলো কোনদিন সিকিউরিটি কি ব্যাবহার করে না।
এতোক্ষণে তার কাছে সব পরিষ্কার হয়। সে বুঝতে পারে যে, সে হ্যাকিং এর স্বীকার হয়েছে।
ফোনের ওপাশের গলাটা তখন বলে উঠলো, “কি, আমার কথাটা মিললো তো?”

এই শীতের রাতেও আলো দরদর করে ঘামছে। মাথাটা কেমন যেনো খালি হয়ে গেলো। কালই তার ভার্সিটিতে গ্রুপ প্রেজেন্টেশন। গ্রুপ লিডার হিসেবে প্রেজেন্টেশনের স্লাইড ও স্ক্রিপট তার ল্যাপটপে। আজ রাতের মধ্যে গ্রুপমেটদের সবাইকে মেইল করে দেয়ার কথা ছিলো তার। এখন কি করবে সে ভেবেই পায় না।

এক পর্যায়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা কানের কাছে নিয়ে সে বলে, “কি চান আপনি?”
“আমি বেশি কিছু চাই না। তোমার সাথে কথা বলতে চাই।“
এবার বেশ একটু রেগেই ঝাঁঝালো গলায় আলো বললো, “আমি কেনো আপনার সাথে কথা বলতে যাবো।“
“এই খবরদার! একদম আমার সাথে এভাবে কথা বলবে না। তোমার সব থিসিস এখন আমার হাতে। আমি চাইলেই তোমার এতোদিনের কাজগুলোকে নিমিশেই শেষ করে দিতে পারি।“
এবার বেশ একটু শান্তভাবেই আলো বললো, “আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি আপনার সাথে কথা বলবো। কাল আমার প্রেজেন্টেশন দয়া করে আমার ল্যাপটপটা খুলে দিনে আর আমার স্লাইড আর স্ক্রিপটটা দিন। না হয় আমার পাশাপাশি আমার গ্রুপমেটদেরও বেশ ক্ষতি হয়ে যাবে।“
“আচ্ছা ঠিক আছে, দিচ্ছি। তবে কথার যেনো কোন নড়চড় না হয়।“
“আর আমার থিসিসগুলো…”
“উহু, সেটা হচ্ছে না। এগুলোই তো তোমার প্রাণ ভ্রোমরা। এগুলো কি দিয়ে দিলে চলে? এগুলো বরং আমার কাছেই থাক। সাতদিন পর যেদিন তোমায় মুক্তিদিবো, সেদিন না হয় দিয়ে দিবো।”
“সত্যি বলছেন?”
“আমি মিথ্যে বলি না। এক কাজ করুন, ল্যাপটপটা রিস্টার্ট দিন।“
হ্যাকারের কথা মতো তাই করে আলো। এবার ল্যাপটপটা খুলে গেলো। কোন সিকিউরিটি কি চায় নি। ভেতরে কোন ফাইল বা ফোল্ডার না পেলেও সে তার আগামীদিনের প্রেজেন্টেশনের স্ক্রিপ্ট আর স্লাইডগুলো পেয়ে যায়।
কিন্তু মেইলে ঢুকতে গিয়েও ঢুকতে না পেরে সে হ্যাকারকে অনুরোধ করে।
প্রত্তুত্যরে সেই হ্যাকার বলে, “আপনার আগের পাসওয়ার্ডটাই আবার দিয়ে দিয়েছি। লগইন করে আপনার বন্ধুদের পাঠিয়ে দিতে পারেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of